বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০৪ অপরাহ্ন

২১ ফেব্রুয়ারি : শহীদ দিবস এবং হারিয়ে যাওয়া প্রভাত ফেরির রাজনীতি – অপু সারোয়ার

অপু সারোয়ার
শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

২১ ফেব্রুয়ারী এক সময় শহীদ দিবস হিসাবে পরিচিত ছিল এবং সেই ভাবেই উদযাপিত হয়ে আসছিল। ভাষা আন্দোলন ছিল সকল ভাষার সমান অধিকার ও বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি। ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের এক ভাষা নীতির বিরুদ্ধে। উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া বাংলা – পাঞ্জাবি – সিন্ধি সকল ভাষার বিকাশের জন্য সমান ক্ষতিকারক ছিল । শহীদ দিবস শুধু মাত্র শোকের মাস নয়। ২১ ফেব্রুয়ারি অর্জনের মাস। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তা বাদের বিকাশের ভিত্তি। ধর্ম নিরপেক্ষ জাতীয়তাবোধ তৈরিতে ভাষা আন্দোলন ছিল একটি প্রেরণাদায়ী শক্তি। বর্তমানে ভাষা শহীদ এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের চৌহদ্দিতে ‘ শহীদ দিবস ‘ যে ভাষা শহীদ কিংবা আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস বলা ইতিহাসকে সামান্য হলেও দুমড়ানো। ভাষার অধিকারকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিপীড়ণের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে খুনকে স্মরণ করতে শহীদ দিবসের সূচনা হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন কোন ভাবেই মাতৃভাষার আন্দোলন ছিল না। ছিল সরকারি ভাষা হিসাবে অন্য ভাষার সাথে বাংলাকে ব্যাবহারের দাবি।
শহীদ দিবস উদযাপনের সাথে যুক্ত ছিল প্রভাত ফেরি অনুষ্ঠানের। সাধারণ মানুষ , স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, সরকারি কর্মচারীরা খুব সকালে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যেত। ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল প্রথম শহীদ দিবস। গাজীউল হক ভাষা আন্দোলনে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এই দিন সম্পকে গাজীউল হক বক্তব্য ” ২১ ফেব্রুয়ারী মিছিল শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন থেকে। ভোর বেলাতেই জনাব আতাউর রহমান খান , শেখ মুজিবর রহমান প্রমুখ নেতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে জমায়েত হয়েছিল। মিছিল শুরু হলো। মিছিলের সামনে জনাব আতাউর রহমান খান , জনাব শেখ মুজিবর রহমান, ইমাদুল্লাহ ( অলি আহাদ গ্রেফতার হবার পর থেকে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ) । কালো পতাকাটি কখনো আমি [ গাজীউল হক ] , কখনোবা আব্দুল ওয়াদুদ পাটোয়ারী বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। সকল স্তরের জনগণ ছিল আমাদের সঙ্গে। ( পৃষ্টা ৭৮, একুশের দলিল লেখক এম আর আখতার মুকুল। সাগর পাবলিশার্স। প্রকাশ কাল ১৯৯০।
কাল ক্রমে প্রভাত ফেরি অনুষ্টানের অবসান ঘটানো হয়েছে। ঠিক কবে থেকে এই প্রভাত ফেরির অবসান হয়েছে সে সম্পর্কে কোন নিদৃস্ট তথ্য নেই। এই পরিবর্তন ১৯৮০ দশকে হয়েছে। প্রভাত ফেরির আবাসনের পর , থেকে একুশের প্রথম প্রহর থেকেই হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের শ্রদ্ধা জানানোর পরই সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এরপরই শহীদ মিনার অভিমুখে নামে জনতার ঢল। স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ সুরে সুর মিলিয়ে কণ্ঠে তোলেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের সময় কোন মুসলিম দেশ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন করেনি। প্রতিটি মুসলিম দেশে তৎকালীন সময়ে এবং বর্তমানে জাতিগত ও ধমীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় চরম ভাবে নিপীড়িত। ইরান-ইরাক- তুরস্ক- সিরিয়ায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের পাশাপাশি কার্দিস জনগোষ্ঠীকে স্বায়ত্ব শাসন / স্বাধীনতার সংগ্রামকে চরমভাবে দমন করে আসছে। সাম্প্রতিক দশক গুলোতে সুদান থেকে দক্ষিণ সুদান এবং ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়া রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন মুসলিম দেশে ‘ বিচ্ছিন্নতা বাদী ‘ আন্দোলন সক্রিয়। পাকিস্তানে বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার আগুন ১৯৬০ এর দশক থেকেই জ্বলছে। বাংলাদেশের অভ্যূদ্বয় ইসলাম ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে পরাজিত করার মধ্যদিয়ে। একটি ধর্মনিরেপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে , সকল ধর্মকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা থেকে মুক্ত দেশ গড়ার রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।
শেখ মুজিবর রহমান সাংবিধানিক ভাবে বাংলাদেশকে ধর্ম নিরেপেক্ষ ঘোষণা করেছিল। তবে একই সাথে রাষ্ট্রকে ইসলামীকরণের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ইসলামী সম্মেলন সংস্থায় যোগ দেওয়া , ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন , বিশ্ব ইজতেমার জন্য জায়গা দেওয়া সর্বোপরি মাদ্রাসা শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান আমল থেকে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে জিয়ে রাখেন। শেখ মুজিব পরবর্তী সরকার গুলো নিজেদের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে উৎসাহিত ও পৃষ্টপোষকতা করে। এই পৃষ্টপোষকতা রাষ্ট্র সমাজ জীবনে ধর্মীয় মতবাদকে সবগ্রাসী রূপে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে। এই ধর্মীয় রাজনীতি শহীদ দিবস, সহ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিকে আঘাত করে চলছে। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারির আগে পরে শহীদ মিনার ভাঙা, শহীদ মিনারকে অবমাননা করার বিভিন্ন ঘটনা গোটা থাকে।
শুরু থেকেই ভাষা আন্দোলন , বাংলা ভাষা ধর্মীয় আক্রমণ ও বিষেদাগারের শিকার। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন হারাম শিরক , ইত্যাদি আলোচনা মাথাচাড়া দেয়। ইসলাম ধর্ম মতে শিরক হচ্ছে আল্লাহর সাথে যদি অন্য কাউকে শরিক বা অংশীদারিত্ব করা । শহীদ মিনারে বা স্মৃতিসৌধে যখন মানুষ ফুল দিতে যায় তখন সেটা করা হয় শহীদদের প্রতি , তাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। শহীদ দিবসে কেউ পূজা করার জন্য যায়না। তাই ‘ শিরক ‘ আলোচনা অতি অমূলক।
দেশের শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত নির্বিশেষে ধর্মীয় জ্ঞানের প্রধানতম উৎস হচ্ছে ইসলামী জলসা। এক সময়ে ইসলামী জলসা বলার প্রচলন ছিল ।সেটা বদলিয়ে এখন আরবিকরণ করে ইসলামি জলসার পরিবর্তে ওয়াজ মাহফিল বলার মধ্য দিয়ে ভাব গাম্ভীর্য্য আরোপ করা হয়। ১৯৭০ দশকে ওয়াজ মাহফিল সীমাবদ্ধ ছিল শীতকালে বড় মাঠে মাইক টাঙিয়ে বক্তিতার মধ্যে। ১৯৮০ দশকে এর সাথে যুক্ত হয় ক্যাসেট প্লেয়ারতে ওয়াজের বিস্তার । গত তিন দশকে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম / ইউটিউব যোগ হয়েছে ওয়াজ প্রসারের রাজনীতিতে। এই সব ওয়াজের সুযোগ পেলেই বাংলা ভাষা , বাংলাদেশের স্বাধীনতা , শহীদ দিবস ইত্যাদি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে জনগণের মনন তৈরী করে আসছে।
২১ ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরির মাধ্যমে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন একুশের মহিমাকে আলাদা এক উজ্জ্বলতা দিয়েছিল। কাক ডাকা ভোরে ছাত্র, শিক্ষক, সহ সর্বস্তরের মানুষ শহীদ মিনারে যেত। কণ্ঠে থাকত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র গানের সুর। এই পরিবেশ একুশকে অন্য যে কোনও জাতীয় দিবস থেকে আলাদা করেছিল। প্রভাত ফেরির অংশ গ্রহণ ছিল পারিবারিক পরিমণ্ডলে অংশ গ্রহন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসক নিরাপত্তার কারণে একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে শহীদ মিনারে পুস্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করেন। রাজনৈতিক দল ও সংস্কৃতিকর্মীরা বিনা প্রশ্নে মেনে নেন। ফলশ্রুতিতে একুশের চেতনায় জড়িত প্রভাত ফেরি নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে যায়।
বিদেশী সংস্কিতির প্রভাবে ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরির পরিবর্তন হয়েছে এমন অভিযোগ খুব বেশি শক্ত ভিতর উপরে দাঁড়িয়ে নেই। ২৬এ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসম্বরের মত গুরুত্ব পূর্ন দিন গুলো এখনো দিনের আলোতেই উদযাপিত হয়। এই দিন গুলোর উদযাপনে কোন বিদেশী সংস্কিতির প্রভাব পড়লো না ? খুব জোরেসোরে বলা হয় প্রভাত ফেরির অবসানের জন্য জেনারেল এরশাদের নিরাপত্তা অজুহাত দায়ী। ১৯৮২ সালের মার্চে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে এরশাদের শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ছাত্র বিক্ষোভে বেশ কয়েক ছাত্রকে খুন করে সামরিক বাহিনী। এই হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মাথায় ছিল ২১ ফেব্রয়ারি। ১৪ ফেব্রুয়ারির হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্র সমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জেনারেল এরশাদের উপস্থিতি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আবার আগের রাষ্ট্র প্রধানদের মত শহীদ মিনারে উপস্থিত না হওয়াকে সাধারণ মানুষ জেনারেল এরশাদের পিছু হটা হিসাবে দেখতে। উৎপাদন বিচ্ছিন্ন সেনাবাহিনী কোন রকম ভুল স্বীকার কিংবা পরাজয়কে বরদাস্ত করার মানসিকতায় গড়ে উঠেনি। এই প্রক্রিয়া প্রভাত ফেরি উদযাপনকে পাস্ কাটিয়ে মধ্যরাতে এরশাদ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য শহীদ মিনারে হাজির হন। সেই থেকে পরবর্তী শাসক শ্রেণী এরশাদ প্রবর্তিত মধ্য রাতের সাঁজোয়া যানের আরোহী হয়ে শহীদ মিনারে আসছেন। ইউরোপ- আমেরিকায় প্রধানতঃ নতুন বছরের শুরুর অনুষ্ঠান রাত ১২টার শুরু হয়। অথবা যে কোন অনুষ্ঠানে আতশবাজি হয়ে থাকে সেই সব অনুষ্ঠান মধ্য রাত বা দিনের আলো নিভে গেলে করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্মরণীয় দিন গুলো কাক ডাকা ভোরেই আয়োজিত হয়ে থাকে। যেমন নিউজিল্যান্ড – অস্ট্রেলিয়ার ANZC Day সকালে অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠান গুলো Dawn Service হিসেবে পরিচিত। ইউরোপ জুড়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিজয় অনুষ্ঠান দিনের আলোতেই হয়ে থাকে।
নাগরিক জীবনে বিদেশী সংস্কিতির প্রভাবে ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরির পরিবর্তন হয়েছে এমন অভিযোগ খুব বেশি শক্ত ভিতর উপরে দাঁড়িয়ে নেই। ২৬এ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসম্বরের মত গুরুত্ব পূর্ন দিন গুলো এখনো দিনের আলোতেই উদযাপিত হয়। এই দিন গুলোর উদযাপনে কোন বিদেশী সংস্কিতির প্রভাব পড়লো না ? খুব জোরেসোরে বলা হয় , প্রভাত ফেরির অবসানের জন্য জেনারেল এরশাদের নিরাপত্তা অজুহাত দায়ী। ১৯৮২ সালের মার্চে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে এরশাদের শিক্ষানীতির প্রতিবাদে ছাত্র বিক্ষোভে বেশ কয়েক ছাত্রকে খুন করে সামরিক বাহিনী। এই হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মাথায় ছিল ২১ ফেব্রয়ারি। ১৪ ফেব্রুয়ারির হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্র সমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জেনারেল এরশাদের উপস্থিতি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। আবার আগের রাষ্ট্র প্রধানদের মত শহীদ মিনারে উপস্থিত না হওয়াকে সাধারণ মানুষ জেনারেল এরশাদের পিছু হটা হিসাবে দেখতে। উৎপাদন বিচ্ছিন্ন সেনাবাহিনী কোন রকম ভুল স্বীকার কিংবা পরাজয়কে বরদাস্ত করার মানসিকতায় গড়ে উঠেনি। এই প্রক্রিয়া প্রভাত ফেরি উদযাপনকে পাস্ কাটিয়ে মধ্যরাতে এরশাদ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য শহীদ মিনারে হাজির হন। সেই থেকে পরবর্তী শাসক শ্রেণী এরশাদ প্রবর্তিত মধ্য রাতের সাঁজোয়া যানের আরোহী হয়ে শহীদ মিনারে আসছেন।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!