বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

সিনিয়র সচিব পদ: বিতর্ক, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কাঠামো

লেখক
বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

সিনিয়র সচিব পদ: বিতর্ক, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কাঠামো

সরকারের সিনিয়র সচিব পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। অভিযোগ রয়েছে, এই পদটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে অনুগত আমলাদের পুরস্কৃত করার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়। সম্প্রতি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে সিনিয়র সচিব পদটি বিলোপের সুপারিশ করা হলেও, পদোন্নতির এই ধারা থেমে নেই। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একের পর এক সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, যা চলমান রয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদোন্নতির ধারা অব্যাহত থাকলে, বর্তমান সরকারের আমলে সিনিয়র সচিব পদে নিয়োজিত কর্মকর্তার সংখ্যা অতীত সরকারের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। গত বছরের ১৮ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব ছাড়া সরকারের সিনিয়র সচিব পদে নিয়োজিত ছিলেন মোট ১৯ জন। তাদের প্রায় সবাই তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

নতুন পদোন্নতি: শফিকুল আলম ও মনির হায়দার

এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব হিসেবে গত বছরের ১৩ আগস্ট নিয়োগ পান বার্তা সংস্থা এএফপির বাংলাদেশের সাবেক ব্যুরো প্রধান শফিকুল আলম। সে সময় তাকে সরকারের সচিব পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়। মাত্র ছয় মাস পর, ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তাকে পদোন্নতি দিয়ে সিনিয়র সচিব পদে উন্নীত করা হয়। একই সময়ে, ৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য গঠন) পদে সাংবাদিক মনির হায়দারও সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। এর ফলে, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় নিয়োজিত কর্মকর্তার সংখ্যা অন্তত ১৬-তে পৌঁছেছে। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিবের পদ এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়।

সিনিয়র সচিব পদ: প্রশাসনিক কাঠামো ও ইতিহাস

প্রকৃতপক্ষে, জনপ্রশাসনের মৌলিক কাঠামোতে সিনিয়র সচিবের কোনো পদ ছিল না। ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই পদ সৃষ্টির মাধ্যমে শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে নতুন একটি স্তর যুক্ত করা হয়। মূলত, অনুগত আমলাদের পুরস্কৃত ও দলবদ্ধ করার জন্য সিনিয়র সচিব পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল, এবং প্রয়াত এইচটি ইমাম ছিলেন এর মূল পরিকল্পক।

বর্তমানে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোয় শীর্ষ পর্যায়ের পাঁচটি পদ রয়েছে—সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব ও সহকারী সচিব। এর সঙ্গে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সিনিয়র সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিবের পদ যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সিনিয়র সচিব সচিবের উপরে এবং সিনিয়র সহকারী সচিব উপসচিব ও সহকারী সচিবের মাঝামাঝি অবস্থান করছে।

রাষ্ট্রাচারের ধারণা ও সিনিয়র সচিবের অবস্থান

সরকারের রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী, বেসামরিক আমলাদের মধ্যে সবার ওপরে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব, এরপর অন্যান্য বিভাগের সচিবরা রয়েছেন। তবে, সিনিয়র সচিবের অবস্থান কোথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, যা এ পদ নিয়ে বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করে।

এদিকে, সিনিয়র সচিব পদ নিয়ে চলমান বিতর্ক ও পদোন্নতির ধারাটি জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এভাবে পদোন্নতির পরিমাণ বাড়তে থাকলে, সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে সরকারের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!