‘ খোলা জানালা ‘ – মানুষ যখন কেবলমাত্র একটি বইয়ের ভিতরেই জীবনকে বন্দি রাখে তখন জ্ঞান’ও বন্দি হয়ে যায়। জ্ঞান প্রসারিত হবার জন্য নানান ধরণের বই পড়তে হয় যে। ধর্মের বৃত্তে কট্টর সম্প্রদায়ের প্রসার কখন ঘটে? যদি লক্ষ্য করে দেখেন সেই গোষ্ঠী কেবলমাত্র ধর্মের বইয়েই বন্দি থাকে। হোক সেটা ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম বা যে কোন ধর্ম। সমগ্র বিশ্বেই কট্টররা ধর্ম বিদ্যার বাহিরে আসতে চায় না বা সেই সব ধর্মের পরিচালকরা বা কাণ্ডারীরা সেই পথ রুদ্ধ করে রাখতে চায়। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখবেন, ধর্মের কট্টর কাণ্ডারীরা কখনোই চায় না শতভাবে জ্ঞানের প্রসার হোক। শতভাবে জ্ঞানের প্রসার হলেই সেই সব কাণ্ডারীদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় যে। প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া মানেই বিপদ আসিন।
এমনকি রাজনৈতিক দর্শনের মধ্য যে সকল দর্শন মোটাদাগে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠীত হয়ে আছে, সেখানেও কট্টরবাদীদের বেশ সমাহার দেখা মেলে। যদিও সেই সকল দর্শনে জ্ঞানের সমাহার সবকিছু থেকে নিতে বাধা নেই তবে সেই একই দর্শনে বন্দি থেকে সব কিছুকে এগিয়ে নেবার প্রবনতাও মূলত কট্টরবাদের অংশ। আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন চর্চায় যে কট্টরবাদের সমাহার দেখা যায়, সেটাই মূলত আধুনিক মৌলবাদ। চর্চায় গোঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস বা একান্ত রক্ষণশীলতা যেমন আমাদের সমাজে ধর্মের দ্বারা বেশ প্রসারিত হচ্ছে, পাশাপাশি একই রকম চর্চায় আধুনিক রাজনৈতিক চর্চায়’ও একপ্রকার গোঁড়ামি ও রক্ষণশীলতার অভাব নেই বা বলা যায় পরিমানে প্রচুর। উদহারণের প্রয়োজন হবে না তবুও বুঝার সুবিধার্থেই যে কোন রাজনৈতিক দলের দর্শন ভেবে দেখতে পারেন এবং সেই সকল রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চা ভাবতে পারেন। আমরাই সঠিক, অন্যরা সব ভুল এই চর্চাটাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য চলছে এবং সেই সূত্রে বলাই বাহুল্য যে আধুনিক মৌলবাদও বেশ প্রসারিত হচ্ছে।
আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনেও কট্টরবাদের যে চর্চা হয় ওটাই মূলত আধুনিক কট্টরপন্থী। সমাজতান্ত্রিক দর্শনে যা যা বলা আছে সেটাই একমাত্র সহি এবং সেইটাই যখন একমাত্র পালনিয় আবশ্যক হয়ে উঠে, সেটাই সমাজতন্ত্রের আধুনিক কট্টরপন্থী। আবার গণতান্ত্রিকতার ক্ষেত্রেও একই বা ভিন্ন কোন মতবাদের ক্ষেত্রে। কর্তৃত্ব ও কর্তৃত্ববাদ কখনোই এক বিষয় নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্তৃত্বের প্রয়োজন রয়েছে কেননা যে কোন রাষ্ট্র নানান ধর্ম- বর্ণ- ভাষা ইত্যাদি ইত্যাদির সংমিশ্রনে গড়ে উঠে। সেখানে একত্রিকরণ কখনোই সম্ভব হয় না বলেই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা থাকে তবে কোন অবস্থাতেই সেটা কর্তৃত্ববাদের অংশ হয়ে উঠলেই রাষ্ট্রের জন্য সর্বোচ্চ বিপদ হয়ে উঠে। যে কোন দর্শন দ্বারাই, হোক সেটা ধর্মীয় দর্শন বা আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন, যখন একনিষ্ঠভাবে প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়, সেটাই মূলত কর্তৃত্ববাদ। কর্তৃত্ববাদ কখনোই কোন রাষ্ট্রের জন্যই কাম্য হতে পারে না এবং মঙ্গল বয়ে আনে না।
নষ্ট সমাজে ‘ক্ষমতা’ উপকার যতটা করে ক্ষতি করে সর্বদাই তারচেয়েও ঢের বেশি। আধুনিক সমাজে রাষ্ট্রই সবচেয়ে ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান। সব নদী যেমন সাগরে গিয়ে একত্রিত হয়ে সাগরকে ভয়ানক রূপ দেয়। একটি নষ্ট সমাজে সব ক্ষমতা রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভয়ানক হয়ে উঠে। তেমন একটি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানে যে যত বড় চাকর সে তত বেশি ক্ষমতার মালিক বনে যায়। একটু ভাল করে আমাদের রাষ্ট্রের দিকে নজর দিলেই সেটা পরিষ্কার হয়ে দর্পণে ধরা দেবে। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও বেশ আধুনিক মৌলবাদের প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাবটি অনাকাঙ্খিত হলেও যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশের পর থেকেই শুরু হয়েছিল। হ্যা, এটা সত্য যে একটি ধ্বংসস্তুপের যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রের সরকারের কর্তৃত্ব প্রয়োজন ছিল বটে তবে দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, যে রাজনৈতিক দলটি এই স্বাধীন দেশ হবার যুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদান করেছিল, সেই দলটিই জনমানুষের চাওয়া- পাওয়ার আকাঙ্খাকে পাশ কাটিয়ে, রাষ্ট্রের সরকারের কর্তৃত্বকে কর্তৃত্ববাদে রূপান্তরিত করেই রাষ্ট্রটি পরিচালনা করা হয়েছিল। ফলাফল সেই যে গোড়ায় গলদ বাঁধানো হয়েছিল এবং সেটার যে আলাদা আকর্ষণ ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কেননা ক্ষমতা চর্চার স্বাদ আলাদা যে, সেই আকর্ষণেই আজও আকর্ষিত হয়েই রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
এই যে যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশ, যে দেশটির পিছনে এত এত করুন কাহিনীর সাথে এত রক্তের দাগ। শুধুমাত্র কর্তৃত্ব থেকে কর্তৃত্ববাদের কারণেই এই রাষ্ট্রটি জন্মের পর থেকে ধকল বয়ে চলছে। যে ধকল মূলত অবশেষে জনগণকে বহন করতে হয়। এই সকল ধকল আমাদের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক দল ও আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে এবং জনগণ মূলত ভুক্তভোগী। এর শেষ যতদিন পর্যন্ত না হচ্ছে ততদিন এই রাষ্ট্রটিকে আরও ধকল বয়ে চলতে হবে। পরিশেষে বলাই বাহুল্য যে, বারবার অভ্যুত্থান হোক বা বিপ্লব হোক বা যত রক্ত জনগণ প্রদান করুক, রাষ্ট্রের আসল পরিবর্তন হবার নয়। পরিবর্তনটা তখনই আসবে, মূলত রাষ্ট্রের পরিচালনার দায়িত্ব থাকাদের গভীরভাবে ভাবতেই হবে উনারা কি চান? জনগণ বারবার যে অভ্যুত্থান বা আন্দোলন করে যে রক্ত দিয়েছে আজ অবধি, সেটা কিন্ত জনগণ পরিবর্তনের প্রয়োজনেই অভ্যুত্থান করেছে। সেটাও এক বা দুই বারবার নয, বহুবার। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণ ঘুরেফিরে পেয়েছে কর্তৃত্ববাদ এবং সেটা রাষ্ট্র দ্বারাই। সুতরাং ধর্মীয় মৌলবাদ যতটা না এই রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন আজ অবধি করতে পেরেছে, আধুনিক কট্টরবাদ বা আধুনিক মৌলবাদ কিন্ত তার চেয়েও অনেক অনেক বেশিই ক্ষতিসাধন করেছে এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেটা আজও বহাল তবিয়তেই চলছে।
বুলবুল তালুকদার
সমসমাজ সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য।
অষ্ট্রিয়া- লিঞ্জ
মতামত লেখকের নিজেস্ব। সম্পাদকীয় মতামতের প্রতিফলন নয়।