বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০০ পূর্বাহ্ন

ইতিহাসের দখলদারিত্ব: ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও মুক্তির সন্ধান – সুমিত রায়

সমিত রায়
শুক্রবার, ১৪ মার্চ, ২০২৫

মাহফুজের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে জামায়াত আবারও স্পষ্ট করলো যে, একাত্তরে তাদের ভূমিকা নিয়ে এখনো তাদের মনে কোনো অনুশোচনা জন্ম নেয়নি। নাহিদ সেদিন বলেছিলেন, ২০২৪ সালে এসে নাকি জামায়াতের কাফফারা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু সেটি আদৌ হয়েছে কি? যে দল এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের মুখোমুখি হতে সাহস করে না, যে দল নিজেদের ভুলকে ভুল হিসেবে স্বীকার করতেও প্রস্তুত নয়, তাদের কাফফারাও হতে পারেনা।
ইতিহাস ও রাজনীতির সম্পর্কটা হলো ক্ষমতা ও বয়ানের দ্বন্দ্বে পূর্ণ। ফুকো দেখিয়েছেন, ইতিহাস কখনো নিরপেক্ষ নয়; বরং ক্ষমতার বলয়ে বয়ান নিয়ন্ত্রিত হয়। জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ উভয়েই তাদের নিজেদের ইতিহাসের বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক শক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে, অন্যদিকে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধকালীন নিজেদের ভূমিকার যে কোনো দায় অস্বীকার করে। এটাই ফুকোর “Power-Knowledge” ফ্রেমওয়ার্কের একটি উদাহরণ, যেখানে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সত্য (regime of truth) তৈরি করে এবং সেটাকেই ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আর আলথুসের বলেছিলেন, রাষ্ট্রের আদর্শিক যন্ত্র (Ideological State Apparatus) যেমন শিক্ষা, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইতিহাসের ব্যাখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত উভয়েই এই আদর্শিক যন্ত্র ব্যবহার করে তাদের নিজস্ব বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আওয়ামী লীগ যেভাবে পাঠ্যপুস্তক ও রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র অভিভাবক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে, জামায়াতও তেমনভাবে নিজেদের ভূমিকা ধামাচাপা দিতে ইসলামী চেতনার বয়ান তৈরি করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম অংশ হচ্ছে অস্বীকার বা ডিনায়ালের রাজনীতি। স্ট্যানলি কোহেন (Stanley Cohen) তার “States of Denial” বইতে দেখিয়েছেন, অপরাধমূলক ইতিহাসের দায় অস্বীকার করার বিভিন্ন রূপ আছে। জামায়াতে ইসলামির ডিনায়াল কৌশল দিয়ে সেগুলোর ভাল উদাহরণ টানা যায় –
১. লিটারাল ডিনায়াল (Literal Denial): জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থকরা মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের নেতাদের ভূমিকা সরাসরি অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। তারা বলে, “আমরা গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।” গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামীসহ অন্যান্য নেতারা সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতা করলেও, জামায়াতের বর্তমান প্রজন্ম এ সত্য অস্বীকার করে। ১৯৭১ সালে দৈনিক সংগ্রাম-এর রিপোর্টগুলো তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করলেও, দলটি সেই তথ্যকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করে।
২. ইন্টারপ্রেটিভ ডিনায়াল (Interpretative Denial): এই কৌশলে সত্যের বিকল্প ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়। জামায়াত বলে, “মুক্তিযুদ্ধ ছিল ভারতীয় ষড়যন্ত্র” বা “তৎকালীন পরিস্থিতি আমাদের এমন ভূমিকা নিতে বাধ্য করেছিল।” এক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধকে রাজনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে দেখিয়ে নৈতিক দায় এড়ানোর চেষ্টা চলে। এর আরেকটি রূপ হলো “র’ (RAW) বা ভারতের পরিকল্পিত খেলা”—যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান-বিরোধী ষড়যন্ত্র বলে চালানো হয়।
৩. ইম্প্লিকেটরি ডিনায়াল (Implicatory Denial): এই কৌশলে দায় স্বীকার না করে সেটার গুরুত্ব হ্রাস করা হয়। জামায়াত বলে, “সবাই তখন পাকিস্তানপন্থী ছিল” বা “তৎকালীন সময়ে বিভ্রান্তি ছিল”। তারা দাবি করে, “তৎকালীন অনেকেই পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, তাহলে শুধু জামায়াতকে দায়ী করা কেন?” এটি মূলত দোষ স্বীকার না করেই নিজেদের ভূমিকাকে অনুকূল ব্যাখ্যা দেওয়ার একটি কৌশল।
এই টাইপের ডিনায়ালের রাজনীতি খেলেছে আওয়ামী লীগও, বাকশাল, ২০১৪, ২০১৮ এর নির্বাচন নিয়ে তাদের ডিনায়াল দেখা যেত। যেমন লিটারাল ডিনায়াল হিসেবে তারা বলতো, “আমরা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি করিনি।” ইন্টারপ্রেটিভ ডিনায়াল হিসেবে “একদলীয় শাসন কায়েমের চেষ্টা করা হয়নি, বরং গণতন্ত্রকে রক্ষা করা হয়েছে।” আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময়ে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উপস্থাপন করে, কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার অনেক বিতর্কিত বিষয় বারবার এড়িয়ে গেছে। ইম্প্লিকেটরি ডিনায়াল হিসেবে তারা বলেছে “বিএনপি-জামায়াত জোট গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, তাই ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই।” “অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, তাই রাজনৈতিক অনিয়ম বা নিপীড়ন গৌণ বিষয়।” ইত্যাদি।
ডিনায়ালের এই রাজনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কাজনক। আওয়ামী লীগ ও জামায়াত উভয়েই তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইতিহাসকে পুনর্লিখন করতে চাইবে। একদল বলবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত রক্ষক তারা, আরেকদল বলবে মুক্তিযুদ্ধ ছিল ষড়যন্ত্র। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানা ও বোঝার পথ সংকীর্ণ হবে, কারণ ইতিহাস রাজনৈতিক দলগুলোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। দলীয় ইতিহাসের বাইরের বয়ানকে গুরুত্ব না দিলে বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এই কারণেই, ইতিহাসকে দলীয় প্রচারের বাইরে এনে একাডেমিক ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, যাতে ডিনায়াল থিওরি আর ক্ষমতার রাজনীতি ইতিহাসকে বিকৃত করতে না পারে।
কার্ল শ্মিটের এর মতে, রাজনীতি হচ্ছে “বন্ধু ও শত্রুর বিভাজন” (Politics as a Distinction Between Friend and Enemy)। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া একটি ন্যায়বিচারমূলক (justice-based) পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সেটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠায়, এটি শত্রু নির্মাণের হাতিয়ার হয়ে গেছে। এটা জামায়াতের অবস্থান না বদলানোকে আরও উৎসাহিত করেছে; তাদের সমর্থকদের মধ্যে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রবণতা বাড়িয়েছে। অবশ্য জামায়াতের সদস্যদের কালেক্টিভিস্ট মনস্তত্ত্ব এক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। গতকাল আমি “হোমোসোসাইটালিটি বনাম হোমোইরোটিসিজম, জামায়াতের সাংগঠনিক সংস্কৃতি, পার্সোনাল স্পেস ও দলীয় আনুগত্য” শীর্ষক একটি আর্টিকেল লিখি। সেখানে দেখাই, জামায়াতের সদস্যদের কালেক্টিভিস্ট আচরণ বেশি হওয়ায় এদের মধ্যে একদিকে যেমন কনফর্মিটি ও দলীয় আনুগত্য বেশি, তেমনি ইন্ডিভিজুয়ালিজম কম্প্রোমাইজড হওয়ায় দলে সৃজনশীলতার সুযোগ কম। একই কারণে এদের মধ্যে নতুন আইডিয়া আসা, দলে কোন রকম পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও কম। তাই এরা যে ডিনায়ালের রাজনীতি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকার দায় স্বীকার করবে ও ক্ষমা চাইবে এর সুযোগ অনেক কম।
তাহলে মুক্তি কি আওয়ামী-জামাতি বয়ানের বাইরে? সহুল আহমেদ মুন্না যে বলেছেন, “বাংলাদেশের মুক্তি আসলে আওয়ামী-জামাতি বয়ানের বাইরে” – এটা আসলে রাষ্ট্রচিন্তার এক ধরনের পোস্ট-আইডিওলজিক্যাল (post-ideological) দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে দুইটি থিওরি প্রাসঙ্গিক। জ্যাক র‌্যানসিয়ের তার রাজনীতির বহুস্বরতা (Plurality in Politics) ধারণাটি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য একক বয়ানের বাইরে বহুস্বরতার প্রয়োজন। বাংলাদেশে যদি মুক্তি আসে, তাহলে সেটা আওয়ামী লীগ বা জামায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জনগণের বিভিন্ন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে ঘটবে। আর আর্নেস্টো লাকলাউ ও শঁতাল মউফের তাদের ‘হেজেমোনিক কন্টেস্টেশন’ ধারণার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দলই চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; সবসময় নতুন রাজনৈতিক শক্তি জন্ম নেয়। বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ বনাম জামায়াতের দ্বৈতবিরোধের বাইরে একটি নতুন রাজনীতির আবির্ভাব হতে পারে, যদি জনগণ বিকল্প বয়ান তৈরি করতে পারে। সব মিলে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং এর রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে এক ধরনের ক্ষমতার খেলা চলতে থাকে। জামায়াত তাদের দায় এড়াতে চায়, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে একমাত্রিক বয়ানে বন্দি রাখতে চায়। কিন্তু মুক্তি আসবে তখনই, যখন এই ক্ষমতার দ্বৈরথের বাইরে নতুন রাজনৈতিক ভাষা ও পর্যালোচনার সংস্কৃতি তৈরি হবে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!