বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০৩ অপরাহ্ন

চাকুরীতে কোটা কেন ? লেখক : আনোয়ার ফকির

ফকির আনোয়ার
রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫

পটভূমি : ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সরকারি চাকরিতে প্রথম কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন সময়ে এই কোটার পরিধি বেড়েছে, নতুন নতুন কোটা যুক্ত করা হয়েছে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। মেধার চেয়ে কোটার নিয়োগ বেশি হয়ে যাওয়ায় এ নিয়ে ছিল বিতর্ক। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভা ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই সরকার জানায়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে (৯ম থেকে ১৩তম) নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে কোনো কোটা বহাল নেই, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে (১৪তম থেকে ২০তম পর্যন্ত) কোটা বহাল রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কোটার প্রার্থী না পাওয়া গেলে সাধারণ প্রার্থীর মেধা তালিকা থেকে তা পূরণ করতে হবে। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি কোটার বিষয়ে আগের জারি করা পরিপত্র স্পষ্ট করার পাশাপাশি মন্ত্রিসভার বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সরকারি চাকরিতে অষ্টম বা তার ওপরের পদেও সরাসরি নিয়োগে কোটা বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের দাবিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পক্ষে অহিদুল ইসলাম তুষার উচ্চ আদালতে ২০২১ সালে রিট মামলা করেন। এ মামলার শুনানি শেষে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াত সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৫ জুন ২০২৪ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য কোটা বাতিল করে জারি করা ২০১৮ সালের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন। এই রায়ের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা হয়। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়। এই প্রতিবাদ বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনের ফলস্রুতিতে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।

হাসিনা সরকারের পতনের পর এখনো বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন চাকুরীতে কোটা রয়েছে। কোটার পরিবর্তন শুধু বিসিএসের চাকুরীতে হয়েছে। এখনো সরকারি চাকুরি সহ বিভিন্ন জায়গায় কোটা পদ্ধতি রয়েছে। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষে ভর্তিতে কোটা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে। পোষ্য কোটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আন্দোলনকারীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ায় অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়—এই আট বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ ধরনের কোটার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকি সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পোষ্য কোটা রয়েছে। সাতটির মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি পোষ্য কোটা আন্দোলনের মুখে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এখন পোষ্য কোটা ফেরাতে আন্দোলন করছেন কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।

চাকুরী ক্ষেত্রে কোটার প্রয়োজন আছে কি? আমাদের দেশে যে দলেই সরকার গঠন করে তারাই নিজেদের ফায়দা লুটবার জন্য কিছু কিছু আইন তৈরি করে, এতে শাসক শ্রেণীর মানুষের সুবিধা হয় আর সিংহভাগ মানুষের দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তার মধ্যে কোটা আইন হচ্ছে একটা। কোটা আইন আমাদের দেশ থেকে একেবারেই মুছে ফেলা দরকার। কোটার কোনো প্রয়োজন নেই, তা নিম্নে বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো।

১/  মুক্তিযোদ্ধা কোটাঃ:  মুক্তিযোদ্ধরা হচ্ছেন আমাদের দেশের সুর্য্য সন্তান বা গর্বিত সন্তান, তাঁরা ১৯৭১ সনে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, এখন অনেকেই নেই এবং যাঁরা বেচেঁ আছেন তারা বার্ধক্ষ্য তাই রাষ্ট্রিয় ভাবে তাহাদিগকে ভাতা প্রধান করা দরকার। যেনো ভালোভাবে জীবন চালাতে পারেন। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা ও অনেক দামের আবাসনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।এটা তাঁরা প্রাপ্য । তারা যুদ্ধ করেছেন বৈষম্য দূর করার জন্য, কিন্তু বৈষম্য সৃষ্টির করার জন্য নয়। তাই চাকুরী ক্ষেত্রে কোটার প্রয়োজন নেই। দেশের মঙ্গলের জন্য কোটা নয় মেধা প্রয়োজন।

২/ প্রতিবন্ধি কোটাঃ প্রতিবন্ধিরা হচ্ছেন অসহায় কেহ বুদ্ধি প্রতিবন্ধি কেহ দৃষ্টি প্রতিবন্ধি কেহ কানে কম শোনেন কেহ বোবা, কারো হাত নেই কারো পা নেই। তারা হচ্ছেন প্রকৃত প্রতিবন্ধি, তাদেরকে রাষ্ট্র ভাতা, আবাসন, কাজের লোক সহ প্রধান করবে, আর তারা বসে বসে খাবে। তাদের জন্য কোনো কোটা প্রয়োজন নেই। আর যাঁদের শারীরিক যোগ্যতা আছে এমনকি উচ্চ শিক্ষিত তারা প্রতিবন্ধি নয়। রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য কোটা নয় মেধাবী চাই ।

৩/ নারী কোটাঃ নারীরা একসময় পিছিয়ে ছিলো, কারণ তাদেরকে পারিবারিক ভাবে সামাজিক ভাবে, রাষ্ট্রিয় ভাবে,ধর্মীও ভাবে বিভিন্নভাবে আটকিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর তাদেরকে আগানোর জন্য শুরু হলো, শিক্ষাক্ষেত্রে উপবৃত্তি, বই, খাতা,কলম ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর চাকুরী ক্ষেত্রে দেওয়া হলো ৬০% নারী কোটা, আর যোগ্যতাও ছিলো অনেক শীতল। এখন নারীরা আর সমাজে পিছিয়ে নেই, যেমন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ডিসি,এসপি পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আছে। এমনকি অধিকারও সমান। তাই নারীদেরকে কোটা দিয়ে খাটো করার দরকার নেই। সুন্দর রাষ্ট্র গঠন করতে কোটা নয় মেধা দরকার।

৪/ পোষ্য কোটাঃ একজন চাকুরীজীবি তাঁর স্ত্রী পুত্র কন্যা সহ তাদের জীবন একটা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চলে। সুখ সাচ্ছন্দ্যও একেবারে কম নয়। একজন দিনমজুর, কৃষক, শ্রমীক তাদেরচেয়ে শতগুণ ভালো ভাবে চলে একজন চাকুরীজীবি এটা নিঃসন্দেহে। তারপর চাকুরী শেষে এককালীন বেতনের ২০০গুন পায়, এতে করে অনেক টাকা হয়। এবং মৃত্যুপুর্বমুহুর্ত পর্য্যন্ত মুল বেতনের অর্ধেক পেয়ে থাকেন। এমতো অবস্থায় একজন দিনমজুরী করে ডালভাত খেয়ে মেধাবী হয়েও চাকরি নেই আর একজন মাংস পোলাও খেয়েও বিনে মেধায় কোটাভিত্তিক চাকরি তা হতে পারে না, সেটা রাষ্ট্রের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনবে। তাই কোটা নয় মেধা দরকার

৫/ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কোটাঃ প্রচলিত ভাবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে উপজাতি বলা হয়। উপজাতি শব্দ ব্যাবহার কতটুকু সমীচীন তা আলোচনার দাবি রাখে। আমরা সবাই একই দেশের বাসিন্দা, সবাই বাঙালী বা বাংলাদেশী। কোনো জাতি বা গোষ্ঠীকে আলাদাভাবে দেখলে তাদেরকে খাটো করা হয়। আমরা সবাই সমানভাবে চলবো,হাতে হাত রেখে কাঁদে কাঁদ রেখে তাতেই হবে সমতা। আর রাষ্ট্রের কাজ হবে তাদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাউপকরণ,স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি সকল সুযোগ সুবিধা দেওয়া। অবকাঠামোগত সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে পড়ার অবসান ঘটানো সম্ভব।

প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সকল পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক মেধা ভিত্তিতে নিয়োগ প্রয়োজন। কোটা ব্যাবস্থার মাধ্যমে সমাজে সুবিধাভোগী তৈরী হয়ে থাকে। কোটা ব্যাবস্থা বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতার ধারক নয়। কোটা পদ্ধতিতে নির্বাচিত কিছু ব্যক্তি নির্দিষ্ট চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ধারণ নাও করতে পারে। এটি কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এবং সরকারি সেবা মান হ্রাস করে। কোটা পদ্ধতি সমাজের কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে যারা মনে করে যে তাদের যোগ্যতার চেয়ে কম সুযোগ পাচ্ছে। এটি সামাজিক বিভেদ এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে। কোটা পদ্ধতি বাস্তবায়ন এবং পরিচালনা জটিল । নির্বাচন প্রক্রিয়া অন্যায্য এবং পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মতামত লেখকের নিজেস্ব।

লেখক : আনোয়ার ফকির । নেত্রকোনা।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!