বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০৫ অপরাহ্ন

মেঘনা আলম : দরজা ভেঙে গুম, তারপর কারাগার !

অপু সারোয়ার
শনিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৫

মেঘনা আলম নামে একজন মডেলের ঘরের দরজা ভেঙে পুলিশ ‘ গ্রেফতার ‘ করেছে বুধবার ৯ এপ্রিল । পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন কোন রকম গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা বৈধ কারণ ছাড়াই ঘরের দরজা ভেঙে মেঘনা আলমকে গ্রেফতার ও তার কম্পিউটার ও ফোন জব্দ করে। জোড় করে ঘরে ঢোকার প্রচেষ্টার সময় মেঘনা আলম ফেইস বুকে লাইভে পুলিশের সাথে কথোপকোথন , ৯৯৯ সাহায্যের জন্য ফোন , আইনজীবীর সাথে কথা বলার উদ্যোগ সব কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত হয়। ১২ মিনিটের বেশি সময় ধরে চলা লাইভটি এরপর বন্ধ হয়ে যায় । মেঘনা ফেসবুক লাইভে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। যদিও পরে ওই লাইভ মুছে দেওয়া হয় ফেসবুকের পাতা থেকে। মেঘনা আলমকে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই আইনত শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন পীড়নের জন্য ব্যাবহৃত হয়ে আসছে।
মেঘনা আলম বুধবার রাত্রে ‘ গ্রেফতার ‘ হন। বৃহস্পতিবার রাত ১০টা নাগাদ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত মেঘনা আলমকে ৩০ দিন কারাগারে আটকে রাখার নির্দেশ। গ্রেফতার ও আদালতের নির্দেশের মধ্যবর্তী কালীন সময়ে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলো মেঘনা আলম সম্পর্কে নিদৃষ্ট তথ্য প্রকাশ না করায় অপহরণের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধমের প্রচার বা যে কোন কারণেই হোক ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মেঘনা আলমের গ্রেফতার প্রসঙ্গে বক্তব্য দেয়। পুলিশের ভাষ্য পাওয়ার পর প্রতিষ্টিত গণমাধম্য গুলো বিনা প্রশ্নে সরকারি বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার সেবায় নিয়োজিত। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে মিথ্যাচার ছড়ানোর মাধ্যমে আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক অবনতির অপচেষ্টা করার অভিযোগে গ্রেফতারের কথা বলছে পুলিশ। ডিএমপির পাঠানো বার্তায় আরও বলা হয়, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে মেঘনা আলমকে সব আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ‘ নিরাপত্তা ‘ হেফাজতে রাখা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, মেঘনা আলমকে অপহরণ করার অভিযোগ সঠিক নয়।
মেঘনা আলমের গ্রেফতারের প্রকৃত পটভূমি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাবে আলোচিত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ইসা বিন ইউসুফ বিন ইসা আলদুহাইলানের সঙ্গে মেঘনা আলমের বিয়ের পূর্ব প্রস্তুতি চলছিল। সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতের আগের স্ত্রী ও সন্তানদের কথা জেনে মেঘনা সম্পর্ক থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে পৌঁছায়। এরই জেরে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে। আর এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে রাষ্ট্রদূত স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ডিবি পুলিশকে ব্যবহার করে মেঘনাকে তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন—এমনটাই অভিযোগ উঠছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে “নিরাপত্তা হেফাজতে” রাখা হয়েছে।
মেঘনা আলম যদি লাইভে না আসতেন তবে বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার পেত না। রাষ্ট্রের পক্ষ এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাঁড় করাতে পারেনি। যা কিছু অভিযোগ নামা তা পুলিশের সংবাদ বিজপ্তিতেই। মেঘনা আলম যদি দোষী হন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার হোক। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তি-প্রতিশোধ কিংবা আন্তর্জাতিক প্রভাব রক্ষা করার জন্য একজন নাগরিককে বলির পাঠা বানানো খেলা বন্ধ হোক। বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহার করে মডেল মেঘনা আলমকে আটকের পর কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতিতে বলা হয় ,১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে অভিযোগ ও বিচারিক তত্ত্বাবধান ছাড়াই নির্বিচার আটকের জন্য ব্যবহার করা হয়ে আসছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মান ও প্রয়োগ গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
একজন নারী, একজন নাগরিক, একজন শিল্পীকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে গিয়ে কারাগারে পাঠানো আমাদের আইনি কাঠামোর নতুন বাস্তবতা। সৌদি কূটনীতিকের দ্বিতীয় স্ত্রী হতে রাজী না হওয়ায় একজন নারীকে রাতে দরজা ভেঙে আটক করে ২৪ ঘণ্টা গুম করে রাখা হয়। তারপর বিশেষ ক্ষমতা আইনে কারাগারে প্রেরণ। মেঘনা আলমের ঘটনাটি কেবল একজন মডেলের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে থাকা সংকট, নাগরিক অধিকারের অবমাননা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
যেভাবে দরজা ভেঙে, পরিচয় গোপন করে, প্রথমে জন্ম সনদ দেখার অজুহাত , সময় পরে মাদক রাখার মিথ্যা অভিযোগে মেঘনা আলমকে আটক করা হয়েছে। গ্রেফতারের এই লুকোচুরি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ভয়াবহ বিষয় হলো—বিভিন্ন বাহিনীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য: মেঘনা আলমকে নিয়ে যাবার পর থানা পুলিশ বলেছে তারা কিছু জানে না, ডিবি বলছে তারা কিছু করেনি, কয়েক ঘণ্টা পরে আবার ডিবি-ই তাকে আটকের কথা স্বীকার করেছে। মেঘনা আলমকে গ্রেফতার হচ্ছে নাগরিক অধিকার হরণের নাটক । এ ধরণের নাটক বিতর্কিত বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভয়ানক অভাবকে স্পষ্ট করে।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন একটি অন্যায় এবং জনকল্যাণবিরোধী আইন হিসেবে বহু বছর ধরেই সমালোচিত। আইন রাষ্ট্রকে এক অসাধারণ ক্ষমতা দেয়, যার মাধ্যমে কোনো নাগরিককে সুস্পষ্ট ফৌজদারি অভিযোগ গঠন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই দীর্ঘ দিন আটক রাখা যায়। এই আইন একটি নিবর্তনমূলক আটক আইন। রাষ্ট্র ধারণা করে যে একজন ব্যাক্তি ভবিষ্যতে কোনো অপরাধ করতে পারে। সেই ভিত্তিতেই গ্রেফতার ও বিনাবিচারে আটক রাখা। আইনের শাসন ভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এমন অনুমান-নির্ভর আটক ব্যবস্থা গুরুতর অন্যায় ও উদ্বেগের । মেঘনা আলমের আটকের ক্ষেত্রে ঠিক কোন তথ্যের ভিত্তিতে ইউনুস প্রশাসন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে তিনি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি, তা জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাই আইনটির চরিত্র এবং এর প্রয়োগ নিয়ে মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ছবি : মেঘনা আলমের ফেইসবুক।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!