বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০৫ অপরাহ্ন

নিউ ইয়র্ক টাইমসে NYT এর প্রতিবেদন এবং সরকারি শোরগোল

সমসমাজ ডেস্ক
মঙ্গলবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৫

এক
বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের উত্থানের আশঙ্কা তুলে ধরে প্রতিবেদন করেছে মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস।
এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১ এপ্রিল প্রকাশিত “As Bangladesh Reinvents Itself, Islamist Hard-Liners See an Opening” শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, ইসলামী দলগুলোর সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং সরকারী নীতির দুর্বলতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশকে ইসলামী মৌলবাদের উত্থানের একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে প্রধানত চারটি তুলে ধরা হয়:
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে হেনস্তা
  • তারাগঞ্জে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধের ঘটনা
  • হিজবুত তাহরীরের প্রকাশ্য সমাবেশ এবং
  • পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে হামলা।
বাংলাদেশের ইসলামিক উগ্রপন্থীদের উথান নিয়ে NYT- প্রায় দুই দশক আগে ২০০৫ সালের ২৩ জুনে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনের স্মরণ করিয়ে দেয়, যার শিরোনাম ছিল “The Next Islamist Revolution?”। সেই সময়ে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে ব্যাপক সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টকে বিএনপি-জামাত সরকার অস্বীকার করেছিল। জেএমবি রাজশাহী বিভাগে বেআইনি খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানা অপরাধ করলেও তৎকালীন জামাত নেতা মতিউর রহমান নিজামী বাংলা ভাইকে “মিডিয়ার সৃষ্টি” বলে দাবি করেছিলেন। বিএনপির প্রেসনোটের ভিত্তিতে সকল গণমাধ্যম ‘ সর্বহারা ‘ আতংক ছড়িয়ে জনমানসে বামপন্থী বিরোধী বয়ান তৈরী করতে সফল হয়েছিল। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। সকাল সাড়ে বেলা ১১-১১:৩০ এর মধ্যে মধ্যে দেশের ৬৩ জেলার প্রেসক্লাব, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ঢাকার ৩৪টি সহ সাড়ে ৪শ’ স্থানে প্রায় ৫শ’ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা।
১৯৯৯ সালের মার্চে যশোরের উদীচীর একটি অনুষ্ঠানে বোমা হামলা ও ২০০০ সালে গোপালগঞ্জে বোমা পুতে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টার ঘটনা পর ইসলামিক জঙ্গিবাদীদের নাম উঠে আসে । কিন্তু তখনো বাংলাদেশের সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গণমাধ্যমে জঙ্গি তৎপরতাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখনি । এরপর ২০০১ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে বোমা হামলা। একই বছর রমনায় বাংলা নববর্ষে বটমূলে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর বোমা হামলা এবং ২০০৪ সালেই তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ২১ অগাস্টের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সাথে ইসলামিক জঙ্গিবাদীদের ভূমিকার কথা বহুল ভাবে আলোচিত।
২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। সরকারের কোন কোন মহলের পৃষ্ঠপোষকতা ও জজ মিয়া মিথ্যা জবানবন্দির ঘটনা ঘটেছিল। এই জাতীয় ঘটনা গুলোর বিচার হীনতা দেশে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তিকে সংহত করেছে। এই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা হয়েছিল।
দুই
এই প্রতিবেদন প্রকাশের সাথে সাথে বাংলাদেশ সরকার এই প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারি প্রতিবাদে নতুন কিছু নেই। টাইমস এর প্রতিবেদনে যে বিষয় গুলো এসেছে সেই বিষয়গুলোকে তথ্য প্রমান ও যুক্তি সহকারে নাকচ করতে পারেনি সরকারি প্রতিবাদ। সরকারি প্রতিবাদ অনেকটা ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ ধাঁচের অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতরনিকা। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য হচ্ছে ‘ পরাজিত শক্তি নিউ ইয়র্ক টিমেসে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রিপোর্ট করিয়েছে ” । রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য সরকারি বয়ানের চেয়ে ‘ বেশি সরকারি ‘ হয়ত পড়েছে। সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বক্তব্য ‘ আমরা চেষ্টা করব বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উগ্রপন্থা যেন মাথাচাড়া দিতে না পারে। নির্বাচনের মাধ্যমে যেন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ভূমিকা রাখতে পারি।’যদি আলোচনা-সতর্কতায় কাজ না হয়, যদি দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হয়, সরকার অবশ্যই হার্ডলাইনে যাবে বলেও জানান তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন ” নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, কোন পত্রিকা কি বলে- তা নিয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। তবে দেশে জঙ্গি বাদ নিয়ে তিনি কোনও উদ্বেগ দেখছি না। ২০০৫ সালের জেএমবি হামলাকে যে ভাবে বিএনপি – জামায়েত অস্বীকার করেছিল , সেই একই কায়দায় ১ এপ্রিল ২০২৫ এর প্রতিবেদনকে ইউনুস সরকার – বিএনপি ও ধমীয় গোষ্ঠী নাকচ করে দিচ্ছে।
দেশে হলি আর্টিজান, ব্যাংক, বিচারালয়, সিনেমাহল, সংস্কৃতি অনুষ্ঠান, উদীচী, ছায়ানট, সিপিবি ও ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা ও গ্রেনেড হামলার মতো গুরুতর ঘটনাগুলো ঘটেছে। এসব ঘটনাকে মিথ্যা প্রচারণা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে ইসলামী ভাবধারার জঙ্গি সংগঠন রয়েছে ১৩৫টিরও বেশি। বিএনপি-জামাত সরকারের আমলেও জেএমবির উত্থানকে অস্বীকার করা হয়েছিল, তবে সত্য মুছে যায়নি।
তিন
NYT-এর প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে “সেকুলার” নেতা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে শেখ হাসিনার আমলে নারীদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এবং তিনি কঠোরভাবে ইসলামী উগ্রপন্থা দমনে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে একইসাথে তার সরকারের আমলে মসজিদ নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনা কোন ভাবেই ধর্ম নিরেপেক্ষ ছিলেন না। কিংবা আওয়ামীলীগ ধর্ম নিরেপেক্ষ দল নয়। আওয়ামীলীগ যেমন দলগত ভাবে ধর্মীয় মৌলবাদকে তোষণ করে আসছে। তেমনি ব্যাক্তিগত ভাবে আওয়ামীলীগ নেতারা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে আসছে। শেখ হাসিনার শাসনামলের বড় সময় জুড়ে হেফাজত ইসলামী পৃষ্টপোষকতা পেয়েছে। এই হেফাজতিরাই হাসিনা পতনের ঊল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেদনে বর্তমান সংস্কার কমিশন ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে বহুত্ববাদের প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় শক্তিগুলোর পুনর্বাসনের ইঙ্গিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চার
NYT এর প্রতিবেদনটি নাতি দীর্ঘ। খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনা নেই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত শব্দ ও বর্গীকরণ পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। প্রতিবেদনে ‘এক্সট্রিমিস্ট’ বা কট্টরপন্থী, ‘মডারেট’ বা মধ্যপন্থী, শব্দ গুলো ব্যাবহৃত হয়েছে। কিন্তু এই শব্দগুলোর কোনো বস্তুনিষ্ঠ সংজ্ঞা প্রতিবেদনে অনুপস্থিত। তবে বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ৮৫টির বেশি মাজার ভাঙা হয়েছে, অভিনেত্রীরা সো-রুম উদ্বোধন করতে পারেনি, নাটক বন্ধ করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের শতশত ভাস্কর্য, স্থাপত্য ও মুরাল ভাঙা হয়েছে, শিল্প-সাহিত্যের উপর আঘাত এসেছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়েছে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!