বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:০৩ অপরাহ্ন

ইতিহাসের ছায়া: বামিয়ান থেকে মাদারীপুর স্মৃতির নির্মূল বনাম ঈমানের দম্ভ – অপু সারোয়ার

অপু সারোয়ার
রবিবার, ১১ মে, ২০২৫

একটি বটগাছ। বয়স এক শতকেরও বেশি। কুমার নদীর তীরে শতাব্দীর সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল নীরবে, নিঃশব্দে। কতো ঝড়-বাদল, রোদ-বৃষ্টি তার ডালপালা ছুঁয়ে গেছে; কত শত পাখির কলকাকলিতে মুখর ছিল তার শাখা-প্রশাখা। মাদারীপুরের আলমমীরের কান্দির সেই গাছটি সম্প্রতি কেটে ফেলা হয়েছে—ইসলাম ধর্মীয় ‘শিরক’-এর অভিযোগে। গাছটির অপরাধ—লোকজন তার নিচে মোমবাতি জ্বালাতো, মানত করতো, কখনো মাথা নোয়াতো। ধর্মীয় ‘বিশুদ্ধতা’র দাবিতে একদল মানুষ এই প্রাচীন বৃক্ষকে ‘পাপের উৎস’ ঘোষণা করে নির্মূল করে দিলো। কাটা পড়লো একটি গাছ। একটি স্মৃতি, সমাজের সহনশীলতা, আর নিঃশব্দে বেঁচে থাকা সংস্কৃতিরও মৃত্যু ঘটলো ধর্মীয় করাতের নিচে। এর আগে বটগাছের নিচে বৈশাখী মেলা ও বাউলগানের আয়োজন ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বাধায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ।’ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় সনাতন- হিন্দু ধর্মের অনেকে পূজা দিতেন। এই পূজা দেওয়া কোন স্থায়ী কোন বিষয় ছিল না। এবারই এই গাছকে কেন্দ্র করে কোন মন্দির বা উপাসনালয় গড়ে উঠেনি। এই গাছ কাটার মধ্যে দিয়ে অন্য ধর্মের লোকেরা কি করতে পারবে বা পারবে না সে সম্পর্কে একটি সীমারেখা বেঁধে দেওয়া হলো। বট গাছটি কেটে ফেলার বৈধতা দিয়েছে এবং ক্ষমতা প্রদর্শন ও সংহত করেছে স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা। অন্য ধর্মের মানুষ কী বিশ্বাস করবে, কীভাবে আচরণ করবে—সেসবকিছু এই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

জানা যায় , শতবর্ষী গাছটি নিয়ে এলাকায় বেশ কৌতূহল আছে এবং অনেকেই নিজেদের অনেক ধরনের বিশ্বাস নিয়ে নানা আচারও পালন করতো। ” গাছ কাটা ব্যক্তিদের একজন আলমমীরের কান্দি এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘বটগাছের গোড়ায় অনেকে শিরনি, মিষ্টি দেয়। লাল কাপড় বেঁধে রাখে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। এসব শিরক। এই বটগাছকে অনেকে আল্লাহ, দেবতা বা সৃষ্টিকর্তা মনে করেন। গাছের মালিকের সঙ্গে আলাপ করেছি। গাছটি যেহেতু গুনাহের কাজ করতেছে, তাই মালিকের মতামত চাইলে তিনি গাছটি কাটতে বলেন। পরে আলেম-ওলামা ও মুসল্লিরা মিলে গাছটি কাটার উদ্যোগ নিই। গাছ কাটতে চার হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গাছটির কাঠ বিক্রি করে দেড় হাজার টাকা স্থানীয় মসজিদে জমা রাখা হবে।’”

এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং, এটি বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় জনতুষ্টিবাদের এক করুণ উদাহরণ। ধর্মের নামে একদল জনতাকে খুশি রাখতে গিয়ে যারা সমাজের মৌল কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে। ধর্মীয় উম্মাদনার কাছে একশ বছরের প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্য একেবারেই নগণ্য। এই ধ্বংসযজ্ঞ ধর্মীয় উম্মাদনার পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত একপ্রকার ‘ফ্যাসিবাদী পারফরমেন্স’ . ঈমান রক্ষার নামে ছিন্ন করা হচ্ছে পরিবেশ, শিল্প, ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিকড়।

একটি পূর্ণবয়স্ক বটগাছ প্রতি বছর গড়ে ৩০ টন অক্সিজেন নিঃসরণ করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বছরে অক্সিজেনের চাহিদা প্রায় ২৮৬ কেজি। এই হিসেবে, একটি শতবর্ষী বটগাছ প্রায় ১০০ জন মানুষের বার্ষিক শ্বাসপ্রশ্বাসের চাহিদা পূরণ করতে পারে। একইসাথে, একটি পরিপক্ব গাছ বছরে প্রায় ২.৫ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বায়ুমণ্ডলকে বিশুদ্ধ রাখে। এ ধরনের একটি গাছ তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় শত বছর। কিন্তু একদল মানুষের ধর্মীয় ধারালো করাত এই গাছকে নিধন করতে সময় নেয় মাত্র কয়েক ঘণ্টা। শিরকের অজুহাতে গাছ কাটা আত্মঘাতী অন্ধতা। পরিবেশ বিনাশ , এটি একটি আত্মবিনাশী সমাজবোধেরও প্রতিচ্ছবি।

এই ‘ধর্মরক্ষার’ নামে ধ্বংস আমাদের মনে করিয়ে দেয় আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকার ইতিহাস। ষষ্ঠ শতকে খোদাই করা বিশালাকার বুদ্ধমূর্তিগুলো—একটি ৫৫ মিটার, আরেকটি ৩৫ মিটার উচ্চতার—চৌদ্দশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে ছিল একদা বৌদ্ধ সভ্যতার স্মারক হিসেবে। এই শিল্পকর্মগুলোর কোনো হিংসা ছিল না, কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধিও না। অথচ ২০০১ সালে তালিবান সরকার এগুলোকে ‘শিরকের প্রতীক’ হিসেবে চিহ্নিত করে ডিনামাইটে উড়িয়ে দেয়। শুধু তালিবানই নয়—ইতিহাসে দেখা যায়, মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব, পারস্যের নাদের শাহ কিংবা আফগান রাজা আব্দুর রহমান খানও এই শিল্পকর্মগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছিলেন। তালিবান “ঈমানী দায়িত্ব” পালনের নামে ২৫ দিন ধরে বোমাবর্ষণ করে বুদ্ধমূর্তিগুলোকে ধূলিসাৎ করে। তালাবনীয় ধর্মান্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার যেন বর্তমান বাংলাদেশে রক্তমাংসের রূপ নিচ্ছে। শুধু পার্থক্য এই যে, তালিবান পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা প্রাণহীন মূর্তি ধ্বংস করেছিলো। আর এখানে একটি জীবন্ত বৃক্ষ—একটি প্রকৃত জীবিত অস্তিত্ব—শিরকের নামে প্রাণ হারাল।

ধর্মান্ধতা যখন নৈতিকতার একমাত্র মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তখন সমাজ তার প্রতীকী চেতনার জায়গাগুলো হারিয়ে ফেলে। বটগাছ কিংবা বুদ্ধমূর্তি—উভয়ই একপ্রকার সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ঐতিহ্য বহন করে। একটি দাঁড়ায় পরিবেশ ও গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে, অন্যটি শিল্প ও ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে। যখন এইসব প্রতীক শত্রুতে পরিণত হয়, তখন সমাজ তার অতীত ও ভবিষ্যৎ—দুটোই একসাথে খোয়াতে শুরু করেছে।
বামিয়ানের বুদ্ধ ভাস্কর্যকে যেমন ‘আল্লাহর শরীক’ হিসেবে চিহ্নিত করে ধ্বংস করা হয়েছিল, ঠিক তেমনি মাদারীপুরের এই বৃক্ষটিকেও শরীক হিসেবে অভিযুক্ত করে হত্যা করা হলো। প্রশ্ন হলো, একটি গাছ কি কারো শ্বাস আটকে রাখছিল? বুদ্ধের মূর্তি কি কারো রুটি কেড়ে নিচ্ছিল? না। তারা ছিল নির্বিষ, নিরীহ, আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের কিছু অবশিষ্ট স্মারক। ধ্বংসকারীরা ঈমান রক্ষার দাবিতে যে দমন চালায়, তা আসলে ধর্মকে একটি কর্তৃত্ববাদী অস্ত্রে পরিণত করে, যেখানে ক্ষমতা ও শুদ্ধতার ভাষ্য একে অপরকে দমন করে। বাংলাদেশের এই গাছ কাটা কাহিনী কেবল পরিবেশ সংক্রান্ত নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক মৃত্যু। একটি সমাজ যখন তার প্রতীক, স্মৃতি ও সহনশীলতা হারায়, তখন সে আসলে নিজেকে কেটে ফেলে। একেকটা বৃক্ষ কাটা পড়ে, আর সমাজ হয়ে পড়ে ইতিহাসহীন, প্রাণহীন, বোধহীন। ধর্মের নামে যদি প্রকৃতি ও প্রতীককে ধ্বংস করা হয়, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ ঈমান কি আসলেই আলোর উৎস? নাকি এটি এক ধ্বংসাত্মক ছায়া?

বটগাছটির ঘিরে চলে আসা লোকজ বিশ্বাস, মানত বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনা—এসবকিছুকে ‘শিরক’ নামক একটিমাত্র নেতিবাচক ছাঁচে ফেলে দেওয়া হলো। হিন্দু- ধর্মের লোক জন কি বিশ্বাস করবে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে ধর্মীয় নেতারা। আগে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে ‘ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে পাঠাগার থেকে পাঁচ বস্তা বই সরিয়ে ফেলেছে উগ্র ধর্ম বাদীরা। বই সরিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে খেলাফত যুব মজলিসের নেতা গোলাম রব্বানীর নেতৃত্বে। পাঠাগারের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে সরিয়ে ফেলা বইগুলোর লেখক হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সঞ্জীব ভট্টাচার্য, জাফর ইকবাল প্রমুখ। স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বন্ধ পাঠাগারটি বন্ধ। পাঠকরা বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আবার গত কয়েকদিন আগে কুড়িগ্রামের একজন শিক্ষকের ফেসবুক পোস্টের জের ধরে সালিশ করে তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে- সেই ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে লাইভ করার ঘটনা ঘটেছে। নাগেশ্বরী উপজেলার একটি কলেজের এক নারী প্রভাষক নিজের ফেসবুকে বোরকা পরা এক নারীর ছবিসহ একটি লেখা পোস্ট করেন ৪ মে ২০২৫। পোস্টের পরপরই ফেসবুকে সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচনার মুখে শিক্ষিকা পোস্ট সরিয়ে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে আরেকটি পোস্ট দেন। এর পরে এই শিক্ষিকার বাড়িতেই বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়ে সালিস করেন । হেফাজতে ইসলামের কুড়িগ্রাম জেলার আহ্বায়ক মুফতি শামসুদ্দিন কাশেমি সালিশ বৈঠক পরিচালনা করেন।

গত কয়েক মাসে ‘ধর্ম বিরোধী’ কর্মকাণ্ডের অজুহাত দিয়ে সারাদেশে নানা জায়গায় মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ‘তৌহিদী জনতা’ কিংবা ‘বিক্ষুব্ধ মুসল্লিদের’ দাবির মুখে দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছিলো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ধর্মীয় উগ্রবাদের উথানের বিষয়টি সামনে এসেছে। বর্তমান সরকার প্রতক্ষ্য ভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে চেয়ে। অতীতের সরকার গুলো ঠিক একই কাজ করেছে। শেখ হাসিনার সরকার তুলনামূলক ভাবে পশ্চাদপদ মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সম মানের স্বীকৃতি ছিল ধর্মীয় উগ্রবাদকে লালন – পালন। শিরক অভিযোগে বটগাছ কাটা , মাজার ভাঙা , পাঠাগার থেকে বই সরিয়ে নেওয়ার মত ঘটনা প্রশ্নের জন্ম দেয় , ভাবতে বাধ্য করে, আমরা কেমন সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হচ্ছি।

সহায়ক তথ্য সূত্র :
১. মাদারীপুরে ‘শিরক’ আখ্যা দিয়ে কাটা হলো শতবর্ষী বটগাছ। ৬ মে ২০২৫। প্রথম আলো।
২. ‘ধর্মবিরোধী’ অভিযোগ তুলে পাঠাগার থেকে নজরুল, রবীন্দ্রনাথদের বই নিয়ে গেলেন একদল যুবক। ২৭ এপ্রিল ২০২৫। প্রথম আলো।
৩. নাস্তিক্যবাদ প্রচারের অভিযোগ : ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে টাঙ্গাইলে পাঠাগার থেকে শত শত বই লুট। ২৭ এপ্রিল ২০২৫। দৈনিক ইত্তেফাক।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!