বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন

শাহবাগে গানের উপর হামলা

অপু সারোয়ার
রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশে ৫ আগস্টের পর যে ঘটনাপুঞ্জি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে—মাজার ভাঙা, হিন্দু, কাদিয়ানী, আহমদিয়া এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক আক্রমণ—তা কোনো বিচ্ছিন্ন হঠকারী জনরোষ নয় । বরং তা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঞ্চিত ফল। এই সহিংসতা রাষ্ট্রীয় নীতির, রাজনৈতিক সুবিধাবাদের, নির্বাচনী প্রাতিষ্ঠানিকতার এবং ধারাবাহিক ধর্মতাত্ত্বিক সংস্কৃতির মিশ্রণে নির্মিত। সহিংসতার উৎস তাই সমাজের প্রান্তে নয় বরং রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে—যেখানে ধর্মকে করা হয়েছে জাতীয় পরিচয়ের প্রধানতম উপাদান, এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক শোষণ ও মতাদর্শগত অনুগততা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠা, সামরিক সরকারের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, এবং পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর কৌশলগত সমঝোতার ফলে যে মতাদর্শিক অবকাঠামো দাঁড়িয়েছে, এই সহিংসতা তারই লজিক্যাল ফলাফল।

৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশব্যাপী অসংখ্য মাজার, পীরস্থান, দরগাহ ও স্থানীয় ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুরের প্রকৃতি এই দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের অন্তর্লীন ধারাবাহিকতাকে উন্মোচন করে। যেকোনো প্রগতিশীল বা বহুত্ববাদী প্রতীককে ধ্বংস করা এ দেশে বহু পুরনো একটি রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে জনগণের মাঝে একটি একরৈখিক ধর্মীয় পরিচয়কে ‘স্বাভাবিক’ এবং ‘জাতীয় কর্তব্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি কেবল ধর্মীয় উগ্রতার নিকৃষ্ট প্রকাশ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের মধ্যেই নিহিত এমন এক নির্মাণ, যা কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও অনুগততা প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। ক্ষমতাকাঠামো যখন বৈধতা হারায়, তখনই এই মতাদর্শিক কাঠামো ‘অন্যকে’ লক্ষ্যবস্তু করে; সংখ্যালঘু, মাজার, নারীর শরীর, ভিন্নমত, ভিন্ন ধর্মাচরণ—সবই হয়ে ওঠে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ক্রোধের পরীক্ষামূলক ভাস্কর্য।

৫ আগস্টের পর কেবল সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের উপর আক্রমণই হয়নি; হামলা হয়েছে তাদের বাড়িতে, মন্দিরে, উপাসনালয়ে, দোকানে এবং সামান্যতম ভিন্নচরিত্রের প্রতীকেও। কাদিয়ানীদের উপর নির্যাতন—যারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের চোখে ‘অমান্যযোগ্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত—তা দেখায় যে বাংলাদেশে ‘ভিন্নতা’ যতটা ধর্মীয় প্রশ্ন, তার চেয়েও বেশি একটি রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মিত রাজনৈতিক প্রশ্ন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী আক্রমণকারীদের যুক্তি ছিল প্রচলিত ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার দায়িত্ব, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের মধ্যেই লুকানো একটি ‘স্বীকৃত সহিংসতা’। এই সহিংসতা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ নয়, বরং দীর্ঘ দশকের রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক পৃষ্ঠপোষকতার ফল। এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। সামরিক সরকার যখন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ধর্মীয় পরিচয়কে সাংবিধানিক বৈশিষ্ট্যে উন্নীত করে, তখনই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বীজ রাষ্ট্রে প্রোথিত হয়। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক সরকারগুলো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই বীজকেই পানি দিয়েছে। ক্ষমতার বাহুল্য, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের অভাব দেখা দিলে ধর্মতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে ক্ষমতার ‘সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা’ নিশ্চিত করা হয়েছে। এক সময়ের প্রগতিশীল রাজনীতি এমনভাবে রূপান্তরিত হয়েছে যে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধিতা করা রাজনৈতিক শক্তিগুলো অবশেষে মৌলবাদী শক্তির কাছেই নির্বাচনী সমর্থন চাইতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলেই দেখা যায়, ক্ষমতায় যিনিই থাকুন—ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান কখনোই নীতিগত হয়নি। বরং রাষ্ট্র নিজেই মতাদর্শিক যন্ত্রের মতো কাজ করেছে—বিশেষ ধরনের ধর্মীয় চিন্তাকে সঠিক, শুদ্ধ এবং জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘মাদ্রাসা-সমর্যাদায়’ নিয়ে আসার যে প্রক্রিয়া বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় লক্ষ্যবস্তুর অংশ হিসেবে ছড়িয়ে গেছে, তা ধর্মীয় জাতিসত্তার নির্মাণকেই শক্তিশালী করেছে। যখন মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমান হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তখন শিক্ষা শুধু শিক্ষাই থাকে না; তা হয়ে ওঠে মতাদর্শিক পুনরুৎপাদনের কেন্দ্র। রাষ্ট্র যখন এই সমতা প্রতিষ্ঠা করে, তখন তা প্রকৃতপক্ষে দুই ধরনের জ্ঞানতন্ত্র—বহুত্ববাদী শিক্ষামূল্যবোধ বনাম একমাত্রিক ধর্মীয় শিক্ষামান—কে একই জাতীয় কাঠামোর মধ্যে বসিয়ে দেয়। এর মধ্যে কার্যত দ্বিতীয়টি সুবিধা পায়, কারণ তা রাষ্ট্র-সমর্থিত ধর্মীয় পরিচয়কে পুনরুৎপাদন করে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকতা ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার দ্বৈততা মীমাংসার বদলে আরও গভীর হয়। শিক্ষাব্যবস্থার মতাদর্শিক রূপান্তর সেই বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার অংশ, যেখানে ধর্মকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ও রাজনৈতিক আনুগত্যের শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী হামলাগুলোর পেছনে থাকা তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশ এমন শিক্ষাতন্ত্রের মধ্যেই বেড়ে ওঠা, যে শিক্ষাতন্ত্র ভিন্নতা ও বহুত্ববাদকে বিপজ্জনক বা ধর্মবিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। গত পনেরো বছরে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার এমন উত্থান ঘটেছে যে রাষ্ট্রিক নীতি ও প্রশাসন প্রায় সম্পূর্ণরূপে ‘ধর্ম-সমন্বিত’ হয়ে পড়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় টিকে থাকতে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এড়িয়ে যায়নি। নারীর স্বাধীনতা, সংস্কৃতির লৌকিকতা, শিল্পকলা, ভাস্কর্য, মাজার, এমনকি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব—সবই বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছে; এবং প্রতিবারই রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল ন্যূনতম, কখনো কখনো সম্পূর্ণ নীরব। ২০১৩ সালে ভাস্কর্য-বিষয়ক বিতর্কে রাষ্ট্রীয় নীরবতা যে পরবর্তী আক্রমণগুলোর ভিত্তি প্রস্তুত করেছিল, ২০২০-এর পর সেটিই আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। রাষ্ট্রের নীরবতা বা দুর্বলতা এখানে কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়—বরং তা মতাদর্শিক অনুকম্পা। রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘যা বলা যাবে না’ এবং ‘যা বলা যাবে’—এই দুইয়ের গভীর বিভাজন ধর্মীয় শক্তির পক্ষে কাজ করেছে।

৫ আগস্ট-পরবর্তী আক্রমণগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতীকী শত্রু নির্মাণের ধারাবাহিকতা। যে সমাজে রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিজেই ধর্মীয় মানদণ্ডে সংজ্ঞায়িত, সেই সমাজে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নাগরিকরা হয়ে ওঠেন ‘অন্য’, যাদের অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হলেও সামাজিকভাবে স্বীকৃত নয়। সংখ্যালঘুদের উপর হামলা তাই কেবল জনরোষ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পরিচয় নির্মাণের মধ্যেই নিহিত এক বৈধ সহিংসতার প্রকাশ। সহিংসতা যখন বারবার ঘটে এবং রাষ্ট্র তা দমন না করে নীরব থাকে, তখন জনগণ তা নৈতিক কর্তব্য হিসেবে উপলব্ধি করতে শুরু করে। এই সহিংসতার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর ‘জাতীয় মানুষ’ তৈরি হয়, যেখানে শুদ্ধতা রক্ষা করার জন্য অন্যকে নির্মূল বা অপমান করা একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে সহিংসতা কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়, তা হয়ে ওঠে সামাজিক আচরণ। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী এই কাঠামোর মধ্যেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি আনুগত্য তৈরি করার রাজনৈতিক কৌশল নিহিত। প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় শক্তিগুলোকে রাষ্ট্র যেভাবে কখনো ‘শত্রু’, কখনো ‘সহযোগী’ হিসেবে ব্যবহার করেছে, তা সমাজের গভীরে এক অনিশ্চয়তা ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। মানুষ বিশ্বাস করতে শিখেছে যে রাষ্ট্রের চেয়ে ধর্মীয় শক্তির হাতে তাদের নিরাপত্তা বেশি—এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সবচেয়ে ভয়াবহ অবক্ষয়। যখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকে, তখন জনগণ বুঝে যায় যে আইন নামমাত্র; প্রকৃত ক্ষমতা ধর্মীয়ভাবে বৈধতা পাওয়া গোষ্ঠীর হাতে। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে সমাজে আরও বৈধ করে তোলে।

এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে ৫ আগস্ট ছিল মাত্র একটি ‘ট্রিগার’, কিন্তু সহিংসতার অভ্যন্তরীণ কাঠামো বহু আগেই প্রস্তুত ছিল। রাষ্ট্র নিজেই একটি মতাদর্শিক যন্ত্র হয়ে উঠেছে, যা নিরন্তরভাবে তার নাগরিকদের শেখায় কোন পরিচয় গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি অগ্রহণযোগ্য। এভাবে রাষ্ট্র একটি ‘নৈতিক শুদ্ধতা’র ধারণা প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলে বহুত্ববাদ, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, নারীর স্বাধীনতা বা সংখ্যালঘুদের অধিকার—সবই অনৈতিক বা বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫ আগস্টের পর যেসব আক্রমণ দেখা গেছে, তা এই মতাদর্শিক কাঠামোরই প্রয়োগ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পালা-করা ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। উভয় শাসনকালেই ধর্মীয় শক্তির প্রতি নীতিগত কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। বরং বিভিন্ন সময় ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক সুবিধা, জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। অতীতে নারী প্রতিমা ভাঙা, মাজারে হামলা, ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙা, সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন—সবকিছুই ঘটেছে। কোনো সরকারই এই সহিংসতার বিরুদ্ধে যথাযথ নীতি গ্রহণ করেনি। এই ধারাবাহিকতার ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের অভ্যন্তরে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী কাঠামো আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে, যা বর্তমান সঙ্কটকে অনিবার্য করেছে।

যে সমাজে একমাত্রিক ধর্মীয় পরিচয়কে ‘জাতীয় পরিচয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেখানে ভিন্নধর্মী মানুষ রাষ্ট্রের কাছে পূর্ণ নাগরিকত্ব ভোগ করতে পারে না। রাষ্ট্র যখন এই বৈষম্য মেনে নেয়, তখন সমাজও তা নিজের নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী নির্যাতন এই বৃহত্তর বাস্তবতারই প্রতিফলন। হামলাগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতিরই পরিণতি। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন সহিংসতা হয়ে ওঠে প্রত্যাশিত, অনুমোদিত এবং কখনো কখনো কাঙ্ক্ষিত। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ধর্মীয় কর্তৃত্বের কাছে নত হয়, এবং জনগণ বুঝে যায় যে ‘জাতীয় সঠিকতা’ রক্ষার নামে সহিংসতা বৈধ। বাংলাদেশের বর্তমান সংকট তাই কেবল রাজনৈতিক সংঘর্ষ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় মতাদর্শিক প্রকল্পের চূড়ান্ত নির্যাস। রাষ্ট্র যে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মকে ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে, তাতে ধর্মীয় উগ্রতার সামাজিক ভিত্তি আরও প্রশস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিধাবাদী আচরণ ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে এমন ক্ষমতা দিয়েছে, যা রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরেও কার্যকর। এর ফলে রাষ্ট্র-সমাজ সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি উত্তাল ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, যা শুধু রাজনৈতিক পুনর্গঠনে মেরামতযোগ্য নয়; এর জন্য প্রয়োজন মতাদর্শিক পুনর্গঠন।

ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করা না গেলে এই সহিংসতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সংখ্যালঘুদের জন্য নিরাপত্তা, বহুত্ববাদী সংস্কৃতির জন্য রাষ্ট্রীয় আশ্রয়, এবং ধর্ম-নিরপেক্ষ নাগরিকত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। মাজার ভাঙা বা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা তাই কেবল ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’র বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামোর পতনের প্রতীক। যে রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের ভিন্নতা রক্ষায় ব্যর্থ, যে রাষ্ট্র ধর্মীয় উগ্রতার সঙ্গে সমঝোতা করে ক্ষমতায় স্থায়িত্ব খোঁজে, যে রাষ্ট্র আইনকে মতাদর্শগত যন্ত্র বানায়—সেই রাষ্ট্রে সহিংসতার চক্র অবশ্যম্ভাবী। বাংলাদেশে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সহিংসতা তাই আমাদের কেবল সতর্ক করে না; এটি দেখায় যে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সংকট কত গভীর, এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি কীভাবে সমাজের প্রতিটি স্তরকে গ্রাস করেছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং নাগরিকত্বের নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠন, ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে জাতীয় পরিচয় নির্মাণ, এবং রাষ্ট্রকে মতাদর্শিক নিরপেক্ষতার পথে ফিরিয়ে আনা। অন্যথায়, মাজার ভাঙা, সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, নারীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ—এসবই ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকারে ফিরে আসবে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!