২৬ জানুয়ারি। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকা উড়ে, আতশবাজি ফোটে, বারবিকিউ জ্বলে, “জাতীয় গর্ব”-এর বুলি আওড়ানো হয়। কিন্তু এই একই দিনে হাজার হাজার মানুষের কাছে কোনো উৎসব নেই—আছে শোক, ক্ষোভ আর দীর্ঘ এক অসমাপ্ত শোকগাথা। কারণ এই দিনটি তাদের কাছে Australian Day নয়; এটি Colonisation Day। এটি সেই দিনের স্মৃতি, যেদিন একটি ভূখণ্ডকে “খালি” ঘোষণা করে তার মানুষের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছিল, যেদিন একটি সভ্যতার ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভিত্তিপ্রস্তর বসানো হয়েছিল।
১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ব্রিটিশ First Fleet যখন এই ভূখণ্ডে নোঙর ফেলে, তখন তারা কোনো শূন্য জমিতে আসেনি। তারা এসেছিল মানুষের দেশে, ভাষার দেশে, গল্পের দেশে, স্মৃতির দেশে। কিন্তু সেই মানুষগুলোকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হয়নি। উপনিবেশকারীরা সঙ্গে করে এনেছিল Terra Nullius—একটি ল্যাটিন শব্দ, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল সবচেয়ে নগ্ন রাজনৈতিক মিথ্যা। “কারও জমি নয়”—এই ঘোষণা দিয়ে এক সম্পূর্ণ মহাদেশকে দখল করে নেওয়া হলো, আর সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসীদের জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য হয়ে গেল।
Terra Nullius কোনো নিরীহ আইনি পরিভাষা ছিল না। এটি ছিল বন্দুক, আইন আর নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের সম্মিলিত অস্ত্র। এর মানে ছিল—এই ভূমিতে যারা আছে, তারা গোনার মতো নয়; তাদের জমি দখল চুরি নয়; তাদের হত্যা অপরাধ নয়; তাদের উচ্ছেদ উন্নয়ন। এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়েই অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, আর সেই রাষ্ট্রের জন্মদিন হিসেবেই আজও ২৬ জানুয়ারি উদযাপন করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কাদের জন্মদিন? কার স্বাধীনতা? কোন “জাতি”-র উদযাপন?
২৬ জানুয়ারি। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকা উড়ে, আতশবাজি ফোটে, বারবিকিউ জ্বলে, “জাতীয় গর্ব”-এর বুলি আওড়ানো হয়। কিন্তু এই একই দিনে হাজার হাজার মানুষের কাছে কোনো উৎসব নেই—আছে শোক, ক্ষোভ আর দীর্ঘ এক অসমাপ্ত শোকগাথা। কারণ এই দিনটি তাদের কাছে Australian Day নয়; এটি Colonisation Day। এটি সেই দিনের স্মৃতি, যেদিন একটি ভূখণ্ডকে “খালি” ঘোষণা করে তার মানুষের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছিল, যেদিন একটি সভ্যতার ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ভিত্তিপ্রস্তর বসানো হয়েছিল।
১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ব্রিটিশ First Fleet যখন এই ভূখণ্ডে নোঙর ফেলে, তখন তারা কোনো শূন্য জমিতে আসেনি। তারা এসেছিল মানুষের দেশে, ভাষার দেশে, গল্পের দেশে, স্মৃতির দেশে। কিন্তু সেই মানুষগুলোকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হয়নি। উপনিবেশকারীরা সঙ্গে করে এনেছিল Terra Nullius—একটি ল্যাটিন শব্দ, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল সবচেয়ে নগ্ন রাজনৈতিক মিথ্যা। “কারও জমি নয়”—এই ঘোষণা দিয়ে এক সম্পূর্ণ মহাদেশকে দখল করে নেওয়া হলো, আর সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসীদের জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস রাষ্ট্রের চোখে অদৃশ্য হয়ে গেল।
Terra Nullius কোনো নিরীহ আইনি পরিভাষা ছিল না। এটি ছিল বন্দুক, আইন আর নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের সম্মিলিত অস্ত্র। এর মানে ছিল—এই ভূমিতে যারা আছে, তারা গোনার মতো নয়; তাদের জমি দখল চুরি নয়; তাদের হত্যা অপরাধ নয়; তাদের উচ্ছেদ উন্নয়ন। এই ধারণার ওপর দাঁড়িয়েই অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, আর সেই রাষ্ট্রের জন্মদিন হিসেবেই আজও ২৬ জানুয়ারি উদযাপন করা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কাদের জন্মদিন? কার স্বাধীনতা? কোন “জাতি”-র উদযাপন? এই দেশে আদিবাসীরা কমপক্ষে ৬৫ হাজার বছর ধরে বসবাস করছে। তারা এই ভূমিকে কেবল ব্যবহার করেনি, সম্পর্ক তৈরি করেছে। ভূমি ছিল তাদের আত্মীয়, নদী ছিল স্মৃতি, পাহাড় ছিল গল্প। অথচ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র এই সম্পর্ককে অস্বীকার করে ভূমিকে কেবল সম্পত্তিতে রূপান্তর করল। ভূমি যখন সম্পত্তি হয়, তখন মানুষকে সরিয়ে দেওয়া যায়। তখন গণহত্যা “সংঘর্ষ” হয়ে ওঠে, শিশু চুরি “সভ্যতা” হয়ে ওঠে, আর সাংস্কৃতিক ধ্বংস “জাতি গঠন” নামে বৈধতা পায়।
২৬ জানুয়ারি তাই কেবল একটি তারিখ নয়; এটি একটি অবস্থান। এই তারিখ মানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ইতিহাসের পক্ষে, যা বলে—উপনিবেশবাদ ভুল ছিল না, কেবল অতীত। এটি এমন এক জাতীয় স্মৃতি নির্মাণ, যেখানে আদিবাসীরা হয় ভুক্তভোগী নয়তো নীরব দর্শক। তাদের শোককে বলা হয় “বিভাজন”, আর তাদের ক্ষোভকে বলা হয় “রাজনীতি”। রাষ্ট্র বলে, “এটি সবাইকে নিয়ে উদযাপনের দিন।” কিন্তু যে দিনটির জন্মই কারও উচ্ছেদের মাধ্যমে, সেটি কীভাবে “সবার” হতে পারে? যে দিনটির অর্থই একটি জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতি, অপমান ও বেঁচে থাকার লড়াই—সেই দিনকে উৎসব বলাটা আসলে ক্ষমতার দম্ভ ছাড়া কিছু নয়।
১৯৯২ সালে Mabo মামলায় অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্ট স্বীকার করে নেয় যে Terra Nullius একটি মিথ্যা ছিল। আইনগতভাবে এই ধারণার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু বাস্তবে? বাস্তবে Terra Nullius আজও জীবিত। এটি জীবিত আছে খনি কোম্পানির চুক্তিতে, আদিবাসী ভূমির ওপর উন্নয়নের নামে আগ্রাসনে, কারাগারে অতিরিক্ত আদিবাসী উপস্থিতিতে, স্বাস্থ্য ও আয়ুষ্কালের বৈষম্যে, আর স্কুলের পাঠ্যবইয়ে “শান্তিপূর্ণ বসতি” শব্দচয়নে। রাষ্ট্র হয়তো বলবে, “ভুল স্বীকার করা হয়েছে।” কিন্তু ভুল স্বীকার মানে কি দায়িত্ব নেওয়া? ভুল স্বীকার মানে কি ক্ষমতা হস্তান্তর? ভুল স্বীকার মানে কি আদিবাসীদের নিজেদের ভূমি, জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেওয়া? নাকি এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা, যা রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে হালকা রাখে, কিন্তু কাঠামোগতভাবে অপরিবর্তিত?
যখন আদিবাসীরা বলে, “Change the Date”, তখন তারা ইতিহাস মুছে ফেলতে চায় না। তারা চায় ইতিহাসের সঙ্গে সৎ হতে। তারা চায় এমন একটি দিন, যা রাষ্ট্রের জন্মকে উদযাপন করবে বটে, কিন্তু কারও অপমানের ওপর দাঁড়িয়ে নয়। কিন্তু এই দাবি উঠলেই বলা হয়—“দেশভাগ হচ্ছে”, “জাতীয় ঐক্য নষ্ট হচ্ছে”। আশ্চর্য, যে ঐক্য টিকিয়ে রাখতে একটি জনগোষ্ঠীর শোককে অস্বীকার করতে হয়, সেই ঐক্য কি আদৌ ন্যায়সঙ্গত? ২৬ জানুয়ারি রক্ষা করা আসলে কোনো তারিখ রক্ষা নয়; এটি একটি ক্ষমতাকাঠামো রক্ষা। এটি সেই ধারণা রক্ষা, যেখানে উপনিবেশবাদকে প্রশ্ন করা যায় না, যেখানে রাষ্ট্রের সহিংস জন্মকে “ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম” বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। এটি সেই মানসিক Terra Nullius, যেখানে আজও আদিবাসীদের বলা হয়—“অতীত ভুলে এগিয়ে চলো”, কিন্তু সেই অতীতের সুবিধা ভোগ করে যায় উপনিবেশের উত্তরাধিকারীরা।
এই দেশ এগোবে কি না, সেটি নির্ভর করছে সে তার জন্মের সত্যের মুখোমুখি হতে পারে কি না তার ওপর। Australian Day যদি সত্যিই ভবিষ্যতের কথা বলে, তবে তাকে Colonisation Day-এর সত্য স্বীকার করতেই হবে। কারণ ন্যায়বিচার ছাড়া উদযাপন কেবল শব্দ, আর স্মৃতি ছাড়া জাতীয়তা কেবল পতাকা।২৬ জানুয়ারি আমাদের উৎসবের দিন হওয়া উচিত নয়; এটি আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়ানোর দিন হওয়া উচিত। প্রশ্ন করার দিন—এই দেশ কীভাবে গড়ে উঠল, কার রক্তের দামে, আর সেই ঋণ আজও কি শোধ করা হয়েছে? যতদিন সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া হবে, ততদিন Australian Day কেবল একটি নামই থাকবে—আর Colonisation Day হবে তার অনুচ্চারিত সত্য।
রাষ্ট্র বলে, “এটি সবাইকে নিয়ে উদযাপনের দিন।” কিন্তু যে দিনটির জন্মই কারও উচ্ছেদের মাধ্যমে, সেটি কীভাবে “সবার” হতে পারে? যে দিনটির অর্থই একটি জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতি, অপমান ও বেঁচে থাকার লড়াই—সেই দিনকে উৎসব বলাটা আসলে ক্ষমতার দম্ভ ছাড়া কিছু নয়। ১৯৯২ সালে Mabo মামলায় অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্ট স্বীকার করে নেয় যে Terra Nullius একটি মিথ্যা ছিল। আইনগতভাবে এই ধারণার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু বাস্তবে? বাস্তবে Terra Nullius আজও জীবিত। এটি জীবিত আছে খনি কোম্পানির চুক্তিতে, আদিবাসী ভূমির ওপর উন্নয়নের নামে আগ্রাসনে, কারাগারে অতিরিক্ত আদিবাসী উপস্থিতিতে, স্বাস্থ্য ও আয়ুষ্কালের বৈষম্যে, আর স্কুলের পাঠ্যবইয়ে “শান্তিপূর্ণ বসতি” শব্দচয়নে।
রাষ্ট্র হয়তো বলবে, “ভুল স্বীকার করা হয়েছে।” কিন্তু ভুল স্বীকার মানে কি দায়িত্ব নেওয়া? ভুল স্বীকার মানে কি ক্ষমতা হস্তান্তর? ভুল স্বীকার মানে কি আদিবাসীদের নিজেদের ভূমি, জীবন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেওয়া? নাকি এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা, যা রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে হালকা রাখে, কিন্তু কাঠামোগতভাবে অপরিবর্তিত? যখন আদিবাসীরা বলে, “Change the Date”, তখন তারা ইতিহাস মুছে ফেলতে চায় না। তারা চায় ইতিহাসের সঙ্গে সৎ হতে। তারা চায় এমন একটি দিন, যা রাষ্ট্রের জন্মকে উদযাপন করবে বটে, কিন্তু কারও অপমানের ওপর দাঁড়িয়ে নয়। কিন্তু এই দাবি উঠলেই বলা হয়—“দেশভাগ হচ্ছে”, “জাতীয় ঐক্য নষ্ট হচ্ছে”। আশ্চর্য, যে ঐক্য টিকিয়ে রাখতে একটি জনগোষ্ঠীর শোককে অস্বীকার করতে হয়, সেই ঐক্য কি আদৌ ন্যায়সঙ্গত?
২৬ জানুয়ারি রক্ষা করা আসলে কোনো তারিখ রক্ষা নয়; এটি একটি ক্ষমতাকাঠামো রক্ষা। এটি সেই ধারণা রক্ষা, যেখানে উপনিবেশবাদকে প্রশ্ন করা যায় না, যেখানে রাষ্ট্রের সহিংস জন্মকে “ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম” বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। এটি সেই মানসিক Terra Nullius, যেখানে আজও আদিবাসীদের বলা হয়—“অতীত ভুলে এগিয়ে চলো”, কিন্তু সেই অতীতের সুবিধা ভোগ করে যায় উপনিবেশের উত্তরাধিকারীরা। এই দেশ এগোবে কি না, সেটি নির্ভর করছে সে তার জন্মের সত্যের মুখোমুখি হতে পারে কি না তার ওপর। Australian Day যদি সত্যিই ভবিষ্যতের কথা বলে, তবে তাকে Colonisation Day-এর সত্য স্বীকার করতেই হবে। কারণ ন্যায়বিচার ছাড়া উদযাপন কেবল শব্দ, আর স্মৃতি ছাড়া জাতীয়তা কেবল পতাকা।
২৬ জানুয়ারি আমাদের উৎসবের দিন হওয়া উচিত নয়; এটি আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়ানোর দিন হওয়া উচিত। প্রশ্ন করার দিন—এই দেশ কীভাবে গড়ে উঠল, কার রক্তের দামে, আর সেই ঋণ আজও কি শোধ করা হয়েছে? যতদিন সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া হবে, ততদিন Australian Day কেবল একটি নামই থাকবে—আর Colonisation Day হবে তার অনুচ্চারিত সত্য।
ফটো : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬- অস্ট্রেলিয়া দিবসে আদিবাসীরা অস্ট্রেলিয়া পতাকায় আগুন দিচ্ছে।







