সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন

বিএনপির প্রত্যাশিত জয় এবং পুনরুত্থিত জামায়াতে ইসলাম

সমসমাজ ডেস্ক
শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন জোট। ৩০০ সদস্যের সংসদে তাদের আসনসংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি—এখন পর্যন্ত ২১২, আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া বা পরিকল্পিত নৈরাজ্যের মাধ্যমে ভোট বানচাল করার অভিযোগ শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-র উত্থান। সংখ্যাগতভাবে তারা বিএনপির তুলনায় কম আসন পেয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাদের অবস্থানকে নিছক পরাজয় বলা যায় না; বরং এটি একটি পুনরুত্থানের ইঙ্গিত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছিল। দীর্ঘ সময় যুদ্ধাপরাধের বিচার, সাংগঠনিক সংকট ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পর এবারের নির্বাচনে তারা তার বহু গুণ বেশি আসন অর্জন করেছে এবং ২২৩টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এটি শুধু আসন বাড়ার ঘটনা নয়; বরং জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের পুনরায় দৃশ্যমান ও প্রাসঙ্গিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। সরকার গঠনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও তারা আবার মূলধারার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবেশ করেছে—এই অর্থে এটি তাদের জন্য ক্ষমতার নয়, প্রাসঙ্গিকতা পুনরুদ্ধারের নির্বাচন।

জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে কৌশলগত পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধাপরাধের রায়ের পর নেতৃত্বে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে দলটি তা কাটিয়ে ওঠে। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব সামনে আনা, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং জনসংযোগ কৌশলে পরিবর্তন ছিল তাদের পরিকল্পনার অংশ। জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্রসমাজের একাংশের সমর্থন তাদের জন্য রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে ওঠে। তাদের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়, যা তরুণ ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। রায়েরবাজারে ১৯৭১ সালের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি ইতিবাচক বক্তব্য ও প্রতীকী হিন্দু প্রার্থী মনোনয়ন—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দলটি ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের বার্তা দিতে চেয়েছে। যদিও সেই প্রার্থী বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন, তবু এই কৌশল রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

নির্বাচন কমিশনের হিসাবে মোট ভোট পড়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ। দুপুর দুইটা পর্যন্ত ছিল ৪৭ শতাংশ; শেষ আড়াই ঘণ্টায় প্রায় ১৪ শতাংশ ভোট পড়ে। এই হঠাৎ বৃদ্ধিকে অনেক বিশ্লেষক “লাস্ট-মাইল সার্জ” বলছেন—অর্থাৎ শেষ সময়ে দলীয় সংগঠন ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো। এর সঙ্গে “কেন্দ্রভিত্তিক মাইক্রো-মোবিলাইজেশন” যুক্ত থাকে, যেখানে কেন্দ্রভিত্তিক তালিকা ধরে ভোটারদের যোগাযোগ করে কেন্দ্রে আনা হয়। সামগ্রিকভাবে বড় সহিংসতা বা প্রকাশ্য কারচুপির প্রমাণ সামনে না এলেও শেষ বেলার ভোটবৃদ্ধি ও কিছু কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে। প্রতিযোগিতার উন্মুক্ততা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও ফলপ্রকাশের স্বচ্ছতা—এই তিন মানদণ্ডে নির্বাচনকে বিচার করা হয়; এ ক্ষেত্রে ফল স্পষ্ট হলেও আরও স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ বিতর্ক কমাতে পারত।

আঞ্চলিকভাবে খুলনা ও রংপুরে জামায়াত তুলনামূলকভাবে এগিয়েছে, আর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও সিলেটে বিএনপির বড় লিড দেখা গেছে। সার্বিকভাবে ফলাফল বিএনপির পক্ষে স্পষ্ট ম্যান্ডেট তৈরি করেছে। তবে এর মধ্যেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বিএনপি সরকার গঠন করলে বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্বে কে থাকবে? বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় রাজনৈতিক ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারিত হতে পারে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, সে ক্ষেত্রে জামায়াত প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

এই সম্ভাবনাকে ঘিরে দেশে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল অপরিহার্য; আদর্শগতভাবে ভিন্ন হলেও যদি তা সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থাকে, তবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বজায় থাকে। অন্যদিকে অনেক নাগরিক ও নাগরিক সমাজের কর্মীদের মত, বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতা; তাই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাদের প্রশ্ন—নীতিগত কারণে যদি কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার যুক্তি থাকে, তবে সেই মানদণ্ড সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

এ নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্বও কমেছে। ২৯৭টি ঘোষিত আসনের মধ্যে মাত্র ৭টিতে নারী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। ৫০টি সংরক্ষিত আসনসহ মোট নারী সংসদ সদস্য হবেন ৫৭ জন—প্রায় ১৬ শতাংশ। দুই দীর্ঘমেয়াদি নারী প্রধানমন্ত্রী—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—থাকা সত্ত্বেও সংসদে নারীর শক্ত অবস্থান গড়ে ওঠেনি। জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি; অন্য দলগুলোর মনোনয়নেও বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি। পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, অর্থনৈতিক বাধা ও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা এখনো বড় প্রতিবন্ধক।

সব মিলিয়ে এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোর দিকনির্দেশ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বিএনপির শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন, জামায়াতের প্রাসঙ্গিকতা পুনরুদ্ধার এবং বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণ—সব মিলিয়ে একটি পরিবর্তনশীল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জনসমর্থন নির্ভর করবে শাসনের মান, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক স্থিতি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার ওপর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়—ভোটে জয়ই চূড়ান্ত নয়; টেকসই গণতন্ত্র নির্ভর করে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক শাসনের ওপর।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!