মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন

ইনকিলাব”, “আজাদী”, “ইনসাফ

সমসমাজ ডেস্ক
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সাম্প্রতিক সময়ে শব্দ ও প্রতীকের যে ব্যবহার বাড়ছে, তা নিছক ভাষাগত পরিবর্তন নয়—এটি স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রকল্প। “ইনকিলাব”, “আজাদী”, “ইনসাফ” শব্দগুলোকে অস্বাভাবিকভাবে সামনে আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে ২১ ফেব্রুয়ারির বদলে ৮ ফাল্গুন ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর নবনির্বাচিত সংসদ। প্রশ্ন একটাই—এটি কি ক্যালেন্ডারের সামান্য রদবদল, নাকি স্মৃতি ও পরিচয় বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা?

প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ভাষা কখনো স্থির নয়। বাংলা ভাষা আরবি, ফারসি, তুর্কি, ইংরেজি—অসংখ্য উৎস থেকে শব্দ গ্রহণ করেছে। এতে বাংলা দুর্বল হয়নি; শক্তিশালী হয়েছে। মুসলিম শাসনের দীর্ঘ সময়, প্রশাসনে ফারসির ব্যবহার, ঔপনিবেশিক শাসন—সব মিলিয়ে বহু শব্দ বাংলা ভাষায় নাগরিকত্ব পেয়েছে। কাজেই আরবি-ফারসি শব্দের উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু প্রশ্ন শব্দের উৎসে নয়; প্রশ্ন তার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে মূল স্লোগান ছিল “জয় বাংলা”, লক্ষ্য ছিল “স্বাধীনতা”। মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল ধারায় “ইনকিলাব” বা “আজাদী” কেন্দ্রীয় স্লোগান হয়ে ওঠেনি। বরং পাকিস্তানপন্থী ও প্রগতিবিরোধী লেখকগোষ্ঠী পুঁথিসাহিত্যের ভাষা অনুসরণের কথা বলতেন, আরবি-ফারসি-উর্দু মিশ্রিত ভাষাকে অগ্রাধিকার দিতে চাইতেন। আবুল মনসুর আহমদ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, পূর্ব-পাকিস্তানের সাহিত্যিক পুনর্জাগরণ পুঁথিসাহিত্যের ভিত্তিতে আসবে, এবং ভাষা হবে মুসলমানের মুখের ভাষা—অর্থাৎ আরবি-ফারসি-উর্দু মিশ্রিত বাংলা।

অর্থাৎ ইতিহাসে ভাষা-নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক অবস্থানের পরিচায়ক। প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিশীল ধারার পার্থক্য তাদের শব্দচয়নেই ধরা পড়ত। একসময় “নামাজ-রোজা” বলাই যথেষ্ট ছিল; এখন “সালাত-সিয়াম” বলার চাপ তৈরি হচ্ছে কি না—এই প্রশ্ন কেবল ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক। কে শব্দ বদলাতে বলছে, কেন বলছে—এ বিশ্লেষণ জরুরি।

২১ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি, নাগরিক অধিকার ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের প্রতীক। এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে UNESCO। ২১ ফেব্রুয়ারি কি “বিদেশী”? গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড; সেটি কোনো একক জাতির সম্পত্তি নয়। তাহলে ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরিয়ে ৮ ফাল্গুনকে সামনে আনার প্রয়োজন হঠাৎ কেন? যদি উদ্দেশ্য হয় প্রতিষ্ঠিত স্মৃতি-রাজনীতিকে দুর্বল করা, তাহলে সেটি ভাষাপ্রীতি নয়—স্মৃতি প্রতিস্থাপনের কৌশল।

ইতিহাস দেখায়, ভাষা যখন ক্ষমতার হাতিয়ার হয়, তখন তা আধিপত্যের উপকরণে পরিণত হয়। লাতিন আমেরিকায় স্পেনীয় ও পর্তুগিজ ভাষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে। ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন এক জিনিস; পরিকল্পিত আরোপ আরেক জিনিস। গত দেড় বছরে “ইনকিলাব”, “আজাদী”, “ইনসাফ” শব্দগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার যদি একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক ধারার মাধ্যমে সংগঠিত হয়, তাহলে সেটি কেবল ভাষার স্বাভাবিক বহুমুখিতা নয়—একটি সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনা।

বাংলার পরিচয় বহুমাত্রিক—মুসলিম শাসন, ঔপনিবেশিক শাসন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ—সব মিলেই গঠিত। এই পরিচয় ভাষাভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক। একে সংকুচিত করে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা রাজনৈতিক সংঘাত ডেকে আনে। যে রাজনীতি গণমানুষের বাস্তব সমস্যা—অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—নিয়ে কথা না বলে প্রতীক ও শব্দের লড়াইকে মুখ্য করে তোলে, তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

এই বিতর্কে কিছু কথিত বামপন্থীও ইতিহাস ঘেঁটে প্রমাণ করতে চাইছেন যে “ইনকিলাব” স্লোগানের উৎস কমিউনিস্ট আন্দোলন। ঐতিহাসিক তথ্যের দিক থেকে তা ভুল নয়। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে কেবল শব্দের উৎস নিয়ে তর্ক করা বাস্তবতার প্রতি অন্ধ থাকা। শব্দ ইতিহাসে যা-ই হোক, আজ তা কোন রাজনৈতিক শক্তি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে—সেটিই প্রাসঙ্গিক।

ভাষা খোলা থাকবে, বিদেশী শব্দ গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক ও কাম্য। কিন্তু ভাষাকে যদি মতাদর্শের ছাঁচে ঢেলে পুনর্গঠন করা হয়, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা স্মৃতি, ইতিহাস ও জাতিসত্তার ধারক। একুশে ফেব্রুয়ারি সেই জাতিসত্তার প্রতীক। তাকে প্রতিস্থাপন করার যে কোনো প্রচেষ্টা আসলে স্মৃতিকে পুনর্লিখনের চেষ্টা। আর স্মৃতি পুনর্লিখন সবসময়ই রাজনৈতিক কাজ—এবং তা কখনো নির্দোষ নয়।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!