প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে কালেমা তাইয়্যেবার আরবি ক্যালিগ্রাফি স্থাপন করা হয়েছে। সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে স্পিকারের আসনের বিপরীত দিকে উঁচু দেয়ালে খোদাই করে এই ক্যালিগ্রাফিটি বসানো হয়। বুধবার, ১১ মার্চ বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। তিনি জানান, ওই দিন দুপুরে সংসদ ভবনে ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় বৈঠকের সময় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন। নির্দেশনার পরপরই পবিত্র কালেমা তাইয়্যেবার আরবি ক্যালিগ্রাফি অধিবেশন কক্ষের দেয়ালে স্থাপন করা হয়। অধিকাংশ মানুষ আরবি ক্যালিগ্রাফিকে অলঙ্করণ বা শিল্পরূপ হিসেবে সহজেই চিনতে পারলেও বাস্তবে সেই ভাষাটি পড়তে বা বুঝতে পারেন না—এটিও এই ধরনের প্রতীকের একটি সামাজিক বাস্তবতা।
এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময় নেওয়া হয়েছে যখন দেশের রাজনৈতিক পরিসরে রাষ্ট্রের প্রতীক, ধর্মীয় পরিচয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদকে সাধারণত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ধর্ম, জাতি বা সংস্কৃতির ভেদাভেদ ছাড়াই দেশের সকল নাগরিকের প্রতিনিধিত্বের ধারণা প্রতিফলিত হওয়ার কথা। সেই প্রেক্ষাপটে সংসদের অধিবেশন কক্ষে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বাক্য স্থায়ীভাবে স্থাপন করা অনেকের কাছে রাষ্ট্রের প্রতীকী চরিত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এই আলোচনার সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। সংসদ অধিবেশনের সময় জাতীয় সংগীত বাজানো হলে জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট কিছু সংসদ সদস্যের উঠে না দাঁড়ানোর ঘটনাও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সংগীত একটি রাষ্ট্রের সামষ্টিক রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক। সংসদের মতো প্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শনকে সাধারণত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও নাগরিক ঐক্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে এই ধরনের আচরণ অনেকের কাছে কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়, বরং রাষ্ট্রের ধারণা সম্পর্কেও একটি অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একই সময়ে সংসদের দেয়ালে কালেমা স্থাপন এবং জাতীয় সংগীতের সময় বিতর্কিত আচরণ—এই দুটি ঘটনা মিলিয়ে রাষ্ট্রের প্রতীকী ভাষা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দেশের সমাজে আরবি ভাষা ও আরবি প্রতীকের প্রতি একটি বিশেষ ধরনের আবেগ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে। এখানে আরবি শব্দ, বাক্য বা ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করা হলে তা সহজেই ধর্মীয় মর্যাদা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। গত তিন দশকে রাষ্ট্রের ভিতরে বাইরে থেকে বাংলা ভাষার খোল নলচে পাল্টে দেওয়ার জন্য আরবি-উর্দুকে ঢুকানো হচ্ছে। ভাষার স্বাভাবিক নিয়ে বিদেশী শব্দ ঢুকে পড়া আর রাজনৈতিক প্রয়োজনে আরবি -উর্দুকে গুঁজে দেওয়া পৃথক বিষয়। অথচ আরবি মূলত একটি ভাষা, যার ইতিহাস ইসলামেরও আগে থেকে বিদ্যমান। প্রাচীন আরব অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠী এই ভাষা ব্যবহার করত। মধ্যপ্রাচ্যের বহু খ্রিস্টান সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আরবি ভাষায় ধর্মীয় গ্রন্থ রচনা করেছে এবং নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন পরিচালনা করেছে। কয়েক দশক আগ পর্যন্ত আরবি নাম বা ভাষা ব্যবহার করা মানেই মুসলমান পরিচয়—এমন ধারণা খুব শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আল-কায়েদা, আইএসআইএসসহ বিভিন্ন ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনের উত্থান এবং রাজনৈতিক ইসলামের বিস্তারের ফলে আরবি ভাষা ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীকে রূপ নিতে শুরু করে। বাংলাদেশের সমাজেও এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা গেছে। এখানে আরবি শব্দ বা প্রতীক ব্যবহার করা মানেই অনেকের কাছে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ও রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ বলে মনে হয়।
এই বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে, যা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি মুসলিম সমাজের ভেতরেও বিভিন্ন মত ও ধারার মানুষ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সময় সময় হামলা, মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল বা সামাজিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। একইভাবে সুফি বা মাজারপন্থী মুসলমানদের অনেক সময় উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। আহমদিয়া বা কাদিয়ানী মুসলিম সম্প্রদায়ও বহু বছর ধরে সামাজিক বৈরিতা ও সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতীক যত শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ততই সমাজের ভেতরে ভিন্ন মত, ভিন্ন বিশ্বাস বা সংখ্যালঘু অবস্থানে থাকা মানুষদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এই মানসিকতার পেছনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সেই সংবিধানও পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। পাহাড়ি ও সমতলের বহু জাতি গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয়কে স্বীকৃতি না দিয়ে একক বাঙালি জাতীয়তার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এর ফলে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যেই একটি কেন্দ্রীভূত পরিচয় গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্রে ইসলামীকরণের ধারা আরও স্পষ্টভাবে যুক্ত হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানের শুরুতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” যুক্ত করেন। পরে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। এর ফলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর সময়েও এই ধারার মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থাকে এবং বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রের প্রতীক ও নীতিতে ধর্মীয় উপস্থিতি বজায় থাকে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে মৌলিক সংস্কার ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সমপর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়া, সারা দেশে মডেল মসজিদ নির্মাণের কর্মসূচি গ্রহণ, এবং ধর্মভিত্তিক সামাজিক শক্তির জন্য রাজনৈতিক পরিসর বিস্তৃত হওয়া—এসব ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ইসলামীকরণের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখেন।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়। পাকিস্তানের সংবিধান সরাসরি নির্ধারণ করে যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মুসলমান হতে হবে। অর্থাৎ সেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদগুলো একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য সংরক্ষিত। নরেন্দ্র মোদীর ভারত “হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র” । তবে ভারত সংবিধানিকভাবে নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দেশ হলেও রাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে তারা প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য থেকে আসা অশোক স্তম্ভ গ্রহণ করেছে। এটি কোনো ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও নৈতিক শাসনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই। দেশটির রাষ্ট্রপতি হিসেবে মুসলমান, শিখ ও হিন্দু—বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ দায়িত্ব পালন করার নজির রয়েছে । বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি ভিন্ন ধরনের দ্বৈততা তৈরি হয়েছে। একদিকে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থাকে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতীকী স্থানে ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীক ক্রমশ দৃশ্যমান হয়। সংসদ অধিবেশন কক্ষে কালেমা স্থাপন সেই ধারারই একটি নতুন উদাহরণ। এই ধরনের প্রতীকী সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের চরিত্রকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও অনেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
১৯৪৭ সালের পর এই অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধকে সাধারণত অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সেই আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের বাস্তব রাজনৈতিক বিকাশ অনেক সময় সেই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিল খুঁজে পায় না। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধটি হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রাম ছিল। ১৯৭১ সালের পর যতই সময় পার হয়েছে , ততই মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা সামনে এসেছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সকল ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্তের পাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে স্বাধীনতার পর দেখা গেছে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বা সংবিধানে ধর্মীয় প্রতীক সংযোজনের মতো প্রশ্নে শক্ত রাজনৈতিক বিরোধিতা মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে সম্মিলিত ভাবে করা সম্ভব হয়নি । ফলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক বর্ণনা এবং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের বাস্তব রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির মধ্যে একটি দূরত্বও তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সংসদ ভবনে কালেমা স্থাপন বা জাতীয় সংগীতের সময় রাজনৈতিক আচরণকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা কঠিন। এগুলো রাষ্ট্রের প্রতীকী ভাষা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার রাজনীতির অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ধর্ম দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভাষা। পাকিস্তানে তা সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত, ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরেও হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শক্তিশালী, আর বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের প্রতীক ও নীতিতে ইসলামী পরিচয়ের উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে। সংসদের দেয়ালে একটি কালেমা ক্যালিগ্রাফি বসানো কেবল একটি অলঙ্করণ নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং নাগরিক সমতার ধারণা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যখন সমাজে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ভিন্ন ধর্মীয় মতের মানুষ নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তখন রাষ্ট্রের প্রতীকী সিদ্ধান্তগুলো আরও বেশি গুরুত্ব পায়।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টায় বসছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল । নতুন সংসদের সূচনার ঠিক আগে অধিবেশন কক্ষে কালেমা তাইয়্যেবার ক্যালিগ্রাফি স্থাপনের ঘটনাটি ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিতে পারেনি । দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পুঁজি । ফলে প্রশ্ন উঠছে—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে, এবং ধর্ম ও রাজনীতির এই সম্পর্ক দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কোথায় নিয়ে যাবে ?