ইউনুস আমল
অক্টোবর ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আটটি জাতীয় দিবস বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের ব্যাখ্যা ছিল—আগের সময়ে কিছু দলীয় দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তাই যেগুলোকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় ৭ মার্চের জাতীয় দিবস বাতিল হওয়ায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ৪ নভেম্বরের সংবিধান দিবস নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে। তবে অন্য কিছু দিবস—যেগুলো ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক—সেগুলো বাতিল নিয়ে তেমন বিতর্ক দেখা যায়নি। অনেকেই এগুলোকে “পরিবারকেন্দ্রিক দিবস” হিসেবেই দেখেছেন।
৭ মার্চ দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দিন হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২০ সালের আগে এটি জাতীয় দিবস ছিল না। ওই বছর আদালতের নির্দেশে দিনটিকে জাতীয় দিবস ঘোষণা করা হয়। পরে সরকারি পরিপত্র জারি হয়। ২০২১ সাল থেকে দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় পরিসরে পালিত হতে থাকে—ভাষণ প্রচার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন উঠছে—যদি ২০২১ সালের আগে এটি জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত না হয়ে থাকে, তাহলে বাতিল হওয়ায় এত প্রতিক্রিয়া কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বিতর্কটি কেবল “দিবস” থাকার বা না থাকার বিষয় নয়। সমালোচকদের মতে, ৭ মার্চ একটি দলের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি কেন্দ্রীয় মুহূর্ত। তাই এটিকে জাতীয় দিবসের তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া অনেকের কাছে প্রতীকী অর্থ বহন করে। অন্যদিকে, সরকারের সমর্থকদের যুক্তি—জাতীয় দিবস ঘোষণা ও বাতিল দুটোই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অতীতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দিবস যোগ করা হয়েছিল, এখন সেগুলো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। কিছু দিবস যে অতিরিক্তভাবে ব্যক্তি বা পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল, সে সমালোচনাও আগে থেকেই ছিল। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সব দিবস এক ধরনের নয়। কিছু দিবস ব্যক্তি বা পরিবারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। কিন্তু ৭ মার্চ একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অংশ, যার সঙ্গে রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
তারেক আমল
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তাঁর নামেই পরিচালিত হয়েছিল। পাকিস্তানের শুরু থেকেই শেখ মুজিবর রহমান অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন। তবে শেখ মুজিবের প্রধান নেতৃত্বের সময়কাল ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০। পৃথিবীর কোনো দেশে বিপ্লব বা যুদ্ধ সরল পথে হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসে সীমাবদ্ধতা, ভুল এবং সিদ্ধান্তহীনতা নিত্যসঙ্গী। যুদ্ধের পর দেশে প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং অরাজকতা দেখা দিয়েছিল। এই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা সক্রিয় ছিল। এক দিকে ছিল চিনপন্থী, বামপন্থী ও জাসদ। অন্য দিকে শক্তিশালী ধারা ছিল বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি। এর মধ্যে ছিল মুসলিম লীগ, জামায়েত ইসলামী, নেজামী ইসলামী এবং অন্যান্য দল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুসলিম লীগ দল হিসাবে উচ্ছেদ হয়েছে। রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে মুসলিম লীগ টিকে আছে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে। বাংলাদেশকে আর পাকিস্তানের সাথে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু পাকিস্তানী ভাবধারার বাংলাদেশ কায়েমের রাজনীতি হচ্ছে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দর্শন। মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করা, বিতর্কিত করা, অন্ধ ভারত বিরোধিতা এবং রাজনীতিকে ধর্মীয় করণ হচ্ছে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক দর্শন।
বাংলাদেশের জন্মের সাথে শেখ মুজিবর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বিশেষ ভাবে জড়িত। ফিবছর ৭ মার্চের আগে-পরে সহ মুজিবর রহমানের ৭ মার্চের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। এই বিতর্কের প্রধান দুইটি ধারা। প্রথম ধারা শেখ মুজিবর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এই আলোচনার পল্লবিত প্রবহমানতা হচ্ছে শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি , তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন । দ্বিতীয় বিতর্ক হচ্ছে শেখ মুজিবর রহমান ভাষণ শেষে জয় বাংলার সাথে সাথে জয় পাকিস্তান বলেছিলেন। জয় পাকিস্তান বলাকে পাকিস্তান না ভাঙার সাথে যুক্ত করে বিভিন্ন যুক্ত দেওয়া হয়ে থাকে।
যে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনাকে অনুৎসাহিত করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তবে দুঃখজনক ভাবে সকল আলোচনা এক বিন্দুতে সমর্পিত হয়, বাংলাদেশ অভ্যূদ্বয় বিরোধী বয়ানে। এই সব বয়ানের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত ধারাবাহিক আলোচনা কম। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে জাতিসংঘ ৭ মার্চের বক্তব্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে তাই এই বক্তব্য মহান কিছু এই জাতীয় বক্তব্য দিয়ে আত্ম প্রশান্তি মূলক বক্তব্য সামাজিক মাধ্যম ছেঁয়ে গেছে। জাতিসংঘ ৭ মার্চের বক্তব্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসের কোন সংযোগ নেই। ৭ মার্চের বক্তব্যকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে মাত্র এক দশক। এই স্বীকৃতি ইতিহাসের পাদটীকায় স্থানের কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সহ অর্থনৈতিক ভাবে পশ্চাদপদ দেশ সূমহে বিদেশের স্বীকৃতি প্রচার শাসক শ্রেনীর জনসন্তুষ্টি তৈরির হাতিয়ার।
গত দেড় দশকের হাসিনার স্বৈরশাসনের আমলে ৭ মার্চের ভাষণের জাতি সংঘের স্বীকৃতি , আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি এই জাতীয় বিষয় গুলো অপশাসনকে আড়াল করার জন্য ব্যাবহৃত হয়ে এসেছে। ২০২৬ সালে ৭ মার্চ নতুন হাসিনা পতন পরবর্তী সময়ে ৭ মার্চ ভাষণকে নিয়ে বিতর্ক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। পূর্বের অপযুক্তি গুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু ধর্মীয় আবেগ। এই বছর ৭ মার্চ ছিল ১৭ রোজা। ঘটনা ক্রমে ১৭ রোজা ছিল বদরের যুদ্ধ। ইসলামের শুরুর দিকের যুদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সয়লাব হয়ে গেল বদরের যুদ্ধ উদযাপনের আহবান। ৭ মার্চকে ঢেকে দেওয়া নতুন কৌশল। হিজরী ক্যালেন্ডার – চন্দ্র বৎসর গণনার রীতিতে আগামী বছর আর বদর যুদ্ধ দিবস মার্চ মাসে হবে না। অতীতে কোন মুসলিম দেশে বদর যুদ্ধ দিবস পালনের কোন ইতিহাস নেই।
এর পাশাপাশি দেখা গেল তারেক রহমানের ‘ কারাবন্দি ‘ দিবসের ডাক। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তারেক রহমান গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তারেক রহমানকে একাধিক মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রায় ১৮ মাস কারাগারে ছিলেন তিনি। পরে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন যাপন করার পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন। এই বছর বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন সীমিত পরিসরে তারেক রহমানের ‘ কারাবন্দি ‘ দিবস পালন করেছে। পালন করেছে।
১৫ অগাস্ট ১৯৭৫ সালে শেখ সপরিবারে খুন হয়েছিলেন। ১৯৯০ এর দশকের কোন এক সময়ে খালেদা জিয়া ১৫ অগাস্ট ঘটা করে কেক কেটে জন্ম দিন পালন শুরু করলেন। বছরের যে কোন দিনের মত ১৫ অগাস্ট স্বাভাবিক ভাবে যে কোন মানুষের জন্ম – মৃত্যু হয়ে থাকবে। তবে এই দিনে জন্ম দিন পলিন একটি অপ্রোজনীয় রাজনৈতিক বিবাদ। বিভিন্ন সময়ে খালেদা জিয়ার পাসপোর্ট, স্কুলের সার্টিফিকেট ইত্যাদি উদৃতি করে ভিন্ন জন্ম তারিখের কথা সংবাদ পত্রে এসেছে।
৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে বিতর্ক ছিল। দুইটি প্রধান দাবি আছে। প্রথম, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। কেউ বলেন, তিনি অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। দ্বিতীয়, ভাষণে ‘জয় বাংলা’ বলার পাশাপাশি ‘জয় পাকিস্তান’ও বলেছেন। কিছু মানুষ এটিকে পাকিস্তান অখণ্ড রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। তবে এই বিতর্ককে এক বিন্দুতে বাংলাদেশের বিরোধী বয়ানে এসে শেষ হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘ ৭ মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এর সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের সরাসরি কোনো সংযোগ নেই। এই স্বীকৃতি ইতিহাসে স্থায়ী নয়। জাতিসংঘ ৭ মার্চের ভাষণকে স্বীকৃতি কিংবা ২১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্র ভাষা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কোন হেরফের ঘটে না। এই সব স্বীকৃতি অপশাসন আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায় । ২০২৬ সালে ৭ মার্চের বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ধর্মীয় আবেগের কারণে বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছে। ৭ মার্চ ছিল ১৭ রোজা। ১৭ রোজা ছিল বদরের যুদ্ধের দিন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বদরের যুদ্ধ উদযাপনের আহবান দেখা দিয়েছে। এটি ৭ মার্চকে ঢেকে দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তারেক রহমানের ‘কারাবন্দি দিবস’ও আলোচনায় এসেছে। ২০০৭ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রায় ১৮ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পান এবং বিদেশে যান। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন। সেই বছর বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সীমিতভাবে দিনটি পালন করেছে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবার খুন হন। ১৯৯০-এর দশকে খালেদা জিয়া ১৫ আগস্ট জন্মদিন উদযাপন শুরু করেন। খালেদা জিয়ার জন্ম তারিখ নিয়েও নানা বিতর্ক রয়েছে। তবে বিষয়টি বোঝার জন্য সময়ের বাস্তবতা মনে রাখা দরকার। তিনি যে প্রজন্মের মানুষ, সে সময় শুধু তাঁর নয়—বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রেই প্রকৃত জন্মদিন এবং স্কুল-কলেজ বা বোর্ড-বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজে লেখা জন্ম তারিখের মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তখন আজকের মতো জন্ম নিবন্ধনের বাধ্যতামূলক বা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা স্কুলে ভর্তি করানোর সময় আনুমানিক একটি তারিখ লিখিয়ে দিতেন। ১৫ আগস্ট জন্মদিনের উদযাপন অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিবাদ সৃষ্টি করে। ঠিক একই ভাবে ৭ মার্চের ভাষণের দিন অন্য কোন দিন উদযাপন নতুন বিতর্কের সূচনা করবে।