সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এখনো অস্বস্তির আগুন !

যমুনা রহমান
বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও রাজনৈতিক চেতনার কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—একটি ঐতিহাসিক রূপান্তর, যা শুধু ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা নয়, বরং জাতীয় আত্মপরিচয়, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এই ইতিহাসকে ঘিরে যে বয়ান-সংঘাত গড়ে উঠেছে, তা আজ নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে—যেখানে অতীতের পুনর্ব্যাখ্যা, বর্তমানের রাজনৈতিক রূপান্তর, এবং মিডিয়া–নির্ভর বাস্তবতার মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনা পতনের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটকে নতুনভাবে উন্মোচন করে। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল দীর্ঘদিনের দমন, বৈষম্য ও অপমানের বিরুদ্ধে। এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্রকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—এই রাষ্ট্র কার? কিন্তু এমন মুহূর্ত খুব দ্রুতই নিয়ন্ত্রিত বয়ানে রূপান্তরিত হয়, যেখানে বিদ্রোহের ধার ভোঁতা করে সেটিকে গ্রহণযোগ্য আলোচনায় পরিণত করা হয়।

অভ্যুত্থানের পরপরই একটি দৃশ্যমান প্রবণতা হলো মিডিয়া–নির্ভর রাজনীতির উত্থান। টেলিভিশন টক শো—সময়, একাত্তর, চ্যানেল ২৪ বা ডিবিসি—একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাট তৈরি করেছে: নিয়ন্ত্রিত তর্ক, ‘ব্যালান্স’ রক্ষার প্রচেষ্টা, এবং এমন একটি পরিসর যেখানে কেউই কাঠামোগত সীমা অতিক্রম করে না। এখানে ‘দুই পক্ষের কথা’ শোনানো হয়, কিন্তু সেই দুই পক্ষের বাইরের বাস্তবতা—রাস্তার সংঘর্ষ, ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ, দমন-পীড়নের প্রকৃতি—অনুপস্থিত থাকে। ফলে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়, যাতে সেগুলো আর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ না হয়ে নৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।

এই পরিবেশে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের কণ্ঠ দ্রুত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে—সংযত, মার্জিত, নৈতিক ভাষায় কথা বলা, কিন্তু সংঘাতকে সীমিত রাখা। এই ধরনের সেলিব্রিটি অ্যাক্টিভিজম রাজনীতিকে দৃশ্যমান রাখে, কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত করে ফেলে। এতে ক্ষোভ থাকে, কিন্তু তা সংগঠিত শক্তিতে রূপ নেয় না; অন্যায়ের কথা বলা হয়, কিন্তু সেই অন্যায় টিকিয়ে রাখা ক্ষমতার কাঠামোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা হয় না। ফলে প্রতিবাদ একটি নৈতিক অবস্থানে আটকে যায়—রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে না। মিডিয়ার জন্য এই ধরনের রাজনীতি স্বাভাবিকভাবেই সুবিধাজনক, কারণ এখানে তর্ক আছে কিন্তু ভাঙন নেই, সমালোচনা আছে কিন্তু সংঘর্ষ নেই; দর্শক একটি নিয়ন্ত্রিত ক্ষোভের অভিজ্ঞতা পান, যেখানে মনে হয় সবকিছু বলা হচ্ছে, কিন্তু আসলে মূল প্রশ্নগুলো অক্ষত থাকে।

একই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ঘিরে বিকল্প বয়ান নির্মাণের একটি প্রক্রিয়াও সক্রিয় রয়েছে। এখানে দ্বৈত কৌশল দেখা যায়—একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতৃত্ব ও আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ভেতরে নতুন অংশীদারিত্বের দাবি তুলে সেটিকে পুনর্দখল করা। প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বকে ছোট করা, বিকল্প প্রতীককে বড় করে দেখানো, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিকে অতিরঞ্জিত করা, এবং যুদ্ধকালীন দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করা—এসবের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্মৃতিতে পরিণত হয়। ফলে ইতিহাস নিজেই রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

গত দেড় বছরে দেশের বাস্তবতা আরও কঠিন হয়েছে—রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, উগ্র গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে, এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু এসব ঘটনাকে টক শোতে প্রায়ই বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হিসেবে নয়। ফলে বাস্তবতার সঙ্গে আলোচনার ফ্রেমের একটি স্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদেরকে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তির ভাষায় উপস্থাপন করছে। এই মূল্যবোধগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও নতুন নয়। প্রশ্ন হলো—এই ভাষা কতটা রাজনৈতিক? যখন রাষ্ট্রকে এমনভাবে দেখা হয়, যেন কিছু নিয়ম ঠিক করা বা কিছু সংস্কার আনলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব, তখন রাষ্ট্রের গভীর ক্ষমতার কাঠামো—প্রশাসন, পুঁজিশক্তি, প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ—অদৃশ্য থেকে যায়। এই কাঠামো অক্ষত রেখে পরিবর্তনের কথা বললে তা প্রায়ই সীমিত হয়ে পড়ে।

এই সীমাবদ্ধতাই মিডিয়া–বান্ধব রাজনীতির সঙ্গে মিলে যায়। এখানে বড় কোনো সংঘাত নেই, তাই বড় কোনো ঝুঁকিও নেই। ফলে এই রাজনীতি সহজে গ্রহণযোগ্য হয়, কিন্তু রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম থাকে। তবুও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের একটি বাস্তব সংকট রয়েছে—তারা পুরোনো দলগুলোর প্রতি আস্থা হারিয়েছে, আবার শক্তিশালী বিকল্পও খুঁজে পায়নি। এই অবস্থায় নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো একটি শূন্যতার মধ্যে কাজ করছে, যা একদিকে সম্ভাবনা তৈরি করে, অন্যদিকে সীমাবদ্ধতাও বহন করে।

ইতিহাস সাধারণত তাদেরই মনে রাখে, যারা অস্বস্তি তৈরি করেছে—যারা এমন প্রশ্ন তুলেছে, যার উত্তর সহজ ছিল না। যে রাজনীতি সবাইকে সন্তুষ্ট রাখে, সেটি সচরাচর বড় পরিবর্তন আনে না। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান যে প্রশ্নটি রেখে গেছে—এই রাষ্ট্র কার—তার উত্তর খুঁজতে হলে কেবল টক শো, নৈতিক ভাষা বা সংস্কার–কেন্দ্রিক বয়ান যথেষ্ট নয়। দরকার সেই রাজনৈতিক সাহস, যা বাস্তব ক্ষমতার সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। বাংলাদেশ আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে নির্ধারণ করতে হবে রাজনীতি হবে অস্বস্তিকর কিন্তু রূপান্তরমুখী, নাকি হবে মসৃণ কিন্তু সীমাবদ্ধ। এই পছন্দই ভবিষ্যতের ইতিহাস নির্ধারণ করবে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!