বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার একটি বক্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল একটি তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’। তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি বিষয়টি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আসিফ মাহমুদ বলেন, এই প্রস্তাবে সরকারকে কিছু শর্ত মানতে বলা হয়েছিল, যার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বাচনের বাইরে রাখার পরিকল্পনাও ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই নির্বাচন আয়োজন করেছে।
‘ডিপ স্টেট’ বলতে সাধারণভাবে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতার বাইরে থাকা এমন এক প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা প্রশাসন, সামরিক বা গোয়েন্দা কাঠামোর ভেতর থেকে সরকারকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড অনেক সময় আইনি কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হয় এবং জবাবদিহির আওতার বাইরে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল গণতন্ত্রের দেশগুলোতে ডিপ স্টেটের ভূমিকা বেশি দেখা যায়। তুরস্ক, মিসর বা পাকিস্তানের মতো দেশেও এ ধরনের কাঠামোর প্রভাবের উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশেও অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে এমন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে গত সরকারের সময় গুম, ক্রসফায়ার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় ‘ডিপ স্টেট’ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বেশিরভাগই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি বা দায় স্বীকার করা হয়নি।
আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—যদি এমন প্রস্তাব সত্যিই দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কারা এই ‘ডিপ স্টেট’-এর অংশ ছিল? তিনি এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নাম প্রকাশ করেননি, যা তাঁর দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে। অন্যদিকে, তাঁর বক্তব্য সত্য হলে তা দেশের গণতন্ত্রের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা প্রয়োজন।
এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পরও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং ‘মব’ নির্ভর সহিংসতার ঘটনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো পক্ষ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সহিংসতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে নির্বাচন নিয়ে অনীহা বা শর্ত আরোপের প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে তা সহিংসতা আরও বাড়াতে পারে এবং গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা জরুরি। পাশাপাশি, ‘ডিপ স্টেট’ সংক্রান্ত অভিযোগসহ রাষ্ট্রের ভেতরের অদৃশ্য প্রভাবগুলো চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও জোরালো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার সিদ্ধান্ত, ডিপ স্টেটের সম্ভাব্য ভূমিকা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সহিংসতা—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।