রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৬ পূর্বাহ্ন

পাহাড়ের দুঃসময়ে ‘বৈ-সা-বি’—আন্তঃজাতিগত ঐক্যের দীপ্ত প্রতীক

নিরন চাকমা
শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে আশির দশকে সামরিক শাসন ও কাউন্টার ইন্সার্জেন্সির কারণে পাহাড়িদের জীবন যখন দুর্বিষহ, প্রকাশ্যে রাজনীতি করা নিষিদ্ধ, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে আন্দোলনকারী শক্তি জেএসএস’র মধ্যে বিভেদ—এই এক কঠিন সময়ে পাহাড়িদের মধ্যে আন্তঃজাতিগত সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে দিয়েছিল যে একটি শব্দ সেটি হলো “বৈ-সা-বি”। ত্রিপুরা জাতিসত্তার উৎসব বৈসুক থেকে ‍“বৈ”, মারমা জাতিসত্তার উৎসব সাংগ্রাই থেকে “সা” ও চাকমাদের উৎসব বিঝু থেকে “বি” আদ্যক্ষরগুলো নিয়েই তৎকালীন সচেতন পাহাড়ি ছাত্র-যুবকরা এই “বৈ-সা-বি” শব্দটি প্রচলন করে জাতিসত্তাগুলোকে সাংস্কৃতিকগতভাবে ঐক্যের কাতারে নিয়ে আসেন। সবাই এতে সামিল হয়েছিলেন। সুদৃঢ় হয়েছিল আন্তঃজাতিগত ঐক্য।

কিন্তু ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর নতুনভাবে রাজনৈতিক বিভাজনের পর এই সাংস্কৃতিক ঐক্যেরও ফাটল ধরে। চুক্তি পক্ষের শক্তিগুলো আর বৈ-সা-বি শব্দটি মানতে চাইল না। এক পর্যায়ে এসে তারা সকল জাতিসত্তার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইলো “বিঝু’ শব্দটি। আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরে ২০০৮ সালের ৯ মার্চ সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটসমূহকে পাহাড়িদের উৎসবের নাম বৈ-সা-বি’র পরিবর্তে ‍‘বিঝু’ হিসেবে পালন করার জন্য পত্র দেয়া হয়েছিল। সে সময় সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তার প্রতিবাদ জানায়, কেউ তা গ্রহণ করেনি। ফলে সে যাত্রায় তারা সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

এরপর তারা ‘বৈ-সা-বি শব্দের মধ্যে অন্য জাতিসত্তাসমূহের প্রতিনিধিত্ব নেই, বৈ-সা-বি কোন উৎসবের নাম নয়’ ইত্যাদি ধুয়ো তুলে জলঘোলা করতে শুরু করলো। আখেরে তাতে লাভ হলো শাসকগোষ্ঠি। সম্প্রতি বর্তমান বিএনপি সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানও একই সুরে কথা বলেছেন এবং ‌‘বৈ-সা-বি’ নামে উৎসব পালন না করার ঘোষণাও দিয়েছেন। যা থেকে পরিষ্কার যে, শাসকগোষ্ঠি পাহাড়িদের মধ্যে ঐক্য চায় না। অতীতেও চাকমা সংসদ, মারমা সংসদ, ত্রিপুরা সংসদ… ইত্যাদি সষ্টি করে দিয়ে পাহাড়িদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে দিয়েছিল শাসকগোষ্ঠি।

আসলে বৈ-সা-বি শব্দটিতে তিনটি জাতিসত্তার আদ্যক্ষরের কথা বলা হলেও সৌভাগ্যক্রমে অধিকাংশ জাতিসত্তার উৎসবের নামের আদ্যক্ষর “স” ও “ব” এ দু’টি বর্ণ রয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যারা “বিষু”, গুর্খা-অহোমিরা “বিহু”, খেয়াংরা “সাংলান’, খুমিরা “সাংক্রাই”, চাকরা “সাংগ্রাইং”, ম্রোরা “চাংক্রান” বলে থাকে। সান্তালরা ‘বাহা পরব’ বলে থাকে (যদিও সময়ের হেরফের আছে)। কাজেই ‘বৈ-সা-বি’ বলতে গেলে বেশিরভাগ জাতিসত্তারই প্রতিনিধিত্ব করে।

যে চেতনাবোধ থেকে ‘বৈ-সা-বি’ প্রবর্তনের মাধ্যমে তৎকালীন ছাত্র-যুবসমাজ ঐক্যের প্রয়াস চালিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে পড়েছে। শাসকগোষ্ঠীর ‘ভাগ করে শাসন করার’ ঘৃণ্য কূটকৌশলের বিপরীতে ‘রাখি বন্ধন’-এর মতো বৈ-সা-বি হচ্ছে সবাইকে ঐক্য সূত্রে গ্রথিত করার একটি আন্দোলনও বটে।

নিরন চাকমা

ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক।
১০.০৪.২০২৬


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!