রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৪ পূর্বাহ্ন

রক্তের নদীর পাশে জ্বলেছিল মানুষ—লোগাং, এক রাষ্ট্রের নীরব গণহত্যার স্মৃতি

অপু সারোয়ার
শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

লোগাং—একটি ছোট নদীর নাম, একটি গ্রামের নাম, আর এক রক্তাক্ত স্মৃতির নাম। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সরু জলের রেখা, যার পানিতে এক সময় লালচে আভা দেখা যেত—লোককথা বলে, সেই রঙ থেকেই নাম হয়েছিল “লো-গাং”, রক্তের নদী। স্থানীয় চাকমা ভাষায় “লো” বা “লৌ” মানে রক্ত, আর ভারতীয় উপমহাদেশের বহু ভাষায় “গাং”, “গাঙ”, “গাঙ্গ” মানে নদী। কেউ কেউ মনে করেন “গাঙ্গ” থেকেই “গঙ্গা” নামের উৎপত্তি। লোগাং—রক্ত নদী—নামটি যে ভাবেই আসুক না কেন, কেউ হয়তো কখনো ভাবেনি এই নদীর অববাহিকায় এত রক্ত ঝরবে। অথচ ইতিহাস কখনো কখনো নামের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভবিষ্যৎকে নির্মমভাবে সত্যি করে তোলে। ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল—সেই দিন, যখন এই নদী সত্যিই রক্তের নদীতে পরিণত হয়েছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে তখন উৎসবের ঋতু। বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইং, বিষু, বিহু, সাংক্রান—নতুন বছরের আগমনী আনন্দে পাহাড় ভাসছে। ঘরে ঘরে “বৈসাবি”-র প্রস্তুতি। ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমাদের বিজু—সব মিলিয়ে এক সম্মিলিত জীবনোৎসব। তিন দিন ধরে চলে এই উৎসব—চৈত্রের শেষ দু’দিন, আর পহেলা বৈশাখ। ফুল বিজুতে ভোরের নদীতে ফুল ভাসায় মেয়েরা, মূল বিজুতে সাজে ঘর, গইজ্যাপইজ্য বিজুতে শেষ হয় উৎসবের রঙ। শিশুরা নতুন কাপড় পরে, গ্রামে গ্রামে গান, নাচ, আহার, একে অন্যের বাড়ি যাওয়া—জীবনকে নতুন করে স্বাগত জানানোর আনন্দে ভরে ওঠে পাহাড়।

কিন্তু সেই উৎসবের ঠিক আগের দিন, লোগাংয়ে নেমে আসে মৃত্যু। দরিদ্র, নিরীহ, নিরস্ত্র শত শত মানুষ—শিশু, নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ—হত্যা করা হয় এক নির্মম আক্রমণে। সকালে ছড়িয়ে পড়ে একটি অভিযোগ—একজন রাখাল বালক নাকি শান্তিবাহিনীর হাতে নিহত। পরে জানা যায়, এই অভিযোগের কোনো প্রমাণই পাওয়া যায়নি। না কোনো লাশ, না কোনো আলামত। তবু এই অভিযোগ যেন ছিল একটি সংকেত—একটি পূর্বনির্ধারিত সহিংসতার দরজা খুলে দেওয়ার অজুহাত। বিকেলের আগেই সংগঠিত হয়ে ওঠে হামলা। ধারালো দা, বটি, কুড়াল, বন্দুক হাতে সেটলাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে আদিবাসী গ্রামে। অভিযোগ রয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা ছিল এই হামলায়।

গ্রাম ঘিরে আগুন জ্বলে ওঠে। একের পর এক ঘর পুড়ে যায়—প্রায় পাঁচশ, হয়তো তারও বেশি। যারা পালাতে চায়, তাদের ধাওয়া করা হয়। কুপিয়ে, গুলি করে, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। আগুনের আলোয় মানুষের ছায়া স্পষ্ট হয়, আর সেই ছায়াকেই নিশানা বানানো হয়। যেন এক বিকৃত উৎসব—মানুষ হত্যার উৎসব। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউ রেহাই পায়নি। নিহতের সংখ্যা আজও অনিশ্চিত—দুই শতাধিক, কেউ বলেন চারশোর কাছাকাছি। কিন্তু সংখ্যা এখানে মুখ্য নয়; মুখ্য হলো সেই নির্মূলের ইচ্ছা, যা একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

সেদিনের একটি ছোট ঘটনা যেন বড় বিপর্যয়ের সূচনা করে—দুই পাহাড়ি নারী গরু চরাতে গিয়ে যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হন। তারা প্রতিরোধ করেন, চিৎকার করেন, হাতে দা তুলে নিজেদের রক্ষা করতে দাঁড়ান। তাদের চিৎকারে আসে কিছু পাহাড়ি পুরুষ। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়, একজন পরে মারা যায়। সেই ঘটনাকে ঘিরেই ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা, আর সেই উত্তেজনাকে রূপ দেওয়া হয় সংগঠিত প্রতিশোধে—যেখানে সত্য, গুজব, ভয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার একসাথে মিশে যায়। ঘটনার পর এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ করা হয়। বাইরের কেউ সহজে প্রবেশ করতে পারেনি। যারা দেখতে চেয়েছিলেন—লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী—তাদের পথেই থামিয়ে দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, রিপোর্ট লেখা হয়—কিন্তু প্রকাশ পায় না। সত্য থেকে যায় অন্ধকারে, বিচার থেকে যায় অনুপস্থিত।

এক মাস পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু শোকের ভাষা নয়, সেখানে শোনা যায় দায় চাপানোর ভাষা। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করা হয়, ঘটনার দায় চাপানো হয় অন্যের ওপর। যেন রাষ্ট্র নিজেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অস্বীকার করে, নিজের সহিংসতাকে বৈধতা দেয়। সেই বছর পাহাড়ে উৎসব হয়নি। বিজুর রঙ মুছে যায়, বৈসুর গান থেমে যায়, সাংগ্রাইংয়ের জল শুকিয়ে যায়। আনন্দের জায়গায় আসে শোক, উৎসবের জায়গায় নীরবতা। পাহাড় তখন শুধু প্রকৃতি নয়—হয়ে ওঠে রক্ত, আগুন আর স্তব্ধ কণ্ঠের স্মৃতি।

এই গণহত্যার বিচার হয়নি। বরং আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন—খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, ভূমি দখল—বিভিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, দূরদেশের নিপীড়নের জন্য যে সমাজ কাঁদতে পারে, নিজের দেশের আদিবাসীদের বেলায় সেই সমাজ নীরব থাকে। শুধু নীরব নয়, অনেক সময় অস্বীকার করে—যেন এই বেদনা তাদের নয়। আজ এত বছর পরও লোগাং একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—এই রাষ্ট্র কার? এই ন্যায়বিচার কার জন্য? একটি গণহত্যা যদি বিচারহীন থেকে যায়, তাহলে সেই নীরবতা কি কেবল সময়ের, নাকি ইচ্ছাকৃত বিস্মৃতি?

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র “এক জাতি, এক পরিচয়”-এর ধারণায় দাঁড়িয়ে সংহতি গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা-সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করে। সেই দাবির সঙ্গে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নীতির সংঘর্ষ শুরু হয়। ভূমি এখানে শুধু সম্পদ নয়—অস্তিত্ব, ইতিহাস, সম্পর্কের কেন্দ্র। কিন্তু রাষ্ট্র উন্নয়ন ও নিরাপত্তার যুক্তিতে বাঙালি বসতি স্থাপনকে উৎসাহিত করে।

১৯৭০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক বাঙালি সেটলারকে এই অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়—ধারণা করা হয় ৪ থেকে ৫ লাখের মতো। এই প্রক্রিয়াকে অনেকেই “ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং” বলেন। ফলে বদলে যায় জনসংখ্যার ভারসাম্য, বাড়ে ভূমি দখল, তীব্র হয় সাংস্কৃতিক সংঘাত। পাহাড়িদের কাছে এটি হয়ে ওঠে অস্তিত্ব সংকট; আবার অনেক সেটলার নিজেরাও হয়ে ওঠে এক অজানা সংঘাতের বন্দী। এই প্রেক্ষাপটে অঞ্চলটি ক্রমশ সামরিকীকৃত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপক সেনা উপস্থিতি, অন্যদিকে পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার্যক্রম—সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিণত হয় এক দীর্ঘস্থায়ী নিম্ন-তীব্রতার সংঘাতে। গুজব, ভয়, প্রতিশোধ—সবকিছু মিলিয়ে সহিংসতা হয়ে ওঠে প্রায় নিয়মিত।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প—ভূমি হারানো, উচ্ছেদ, বাস্তুচ্যুতি—সবকিছু মিলিয়ে পাহাড়ি জীবনে অনিশ্চয়তা নেমে আসে। যৌন সহিংসতা হয়ে ওঠে এক ভয়াবহ বাস্তবতা। বহু মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে আদিবাসী নারী ও মেয়েরা এই সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পাহাড় আজও নিরাপদ নয়—ভূমি হারানো, সামরিক আধিপত্য, পুঁজিবাদী শোষণ—এই তিনটি বাস্তবতা তাদের জীবনকে ঘিরে রেখেছে।

বিচারহীনতা এই ক্ষতকে আরও গভীর করে। দায়ীদের জবাবদিহিতা না থাকলে সহিংসতা থামে না; বরং নতুন সহিংসতার পথ তৈরি করে। একইসঙ্গে তৈরি হয় স্মৃতির বিভাজন—পাহাড়িদের কাছে যা জীবন্ত বেদনা, জাতীয় মূলধারায় তা প্রায় অনুপস্থিত। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি কিছু আশা জাগিয়েছিল—আঞ্চলিক পরিষদ, ভূমি কমিশন, শরণার্থী প্রত্যাবাসন। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতি, আস্থার সংকট, অসম্পূর্ণতা—সব মিলিয়ে এটি অনেকের কাছে আংশিক সমাধান হিসেবেই রয়ে গেছে। ভূমি বিরোধ মেটেনি, সামরিক উপস্থিতি কমেনি পুরোপুরি, আস্থার ফাঁক রয়ে গেছে।

আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামে সহাবস্থান যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অদৃশ্য উত্তেজনা। বাজারে, স্কুলে, জীবনের প্রতিদিনের স্তরে পাশাপাশি থাকা—কিন্তু গভীরে জমে থাকা অবিশ্বাস সহজে মুছে যায় না। মাঝে মাঝে সংঘর্ষ ফিরে আসে, মনে করিয়ে দেয়—সমস্যার শেকড় এখনো অমীমাংসিত।

লোগাং তাই শুধু অতীত নয়; এটি বর্তমানেরও সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বীকৃতি, ন্যায়বিচার, সমান মর্যাদা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র পূর্ণ হয় না।আর এই পুরো ইতিহাসের ভেতরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি কাঠামোগত সত্য—উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ, উভয়ই এখানে ভিন্নতাকে শত্রু হিসেবে নির্মাণ করেছে। আর এই শত্রুতার পাহারাদার হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে তথাকথিত দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রযন্ত্র—বিশেষ করে সেনাবাহিনী—যারা নিরাপত্তার নামে অনেক সময়ই হয়ে ওঠে নিপীড়নের রক্ষক। লোগাং ভুলে যাওয়া সহজ। কিন্তু ভুলে গেলে ইতিহাস ফিরে আসে—আরও নির্মম হয়ে। স্মরণ মানে শুধু শোক নয়; স্মরণ মানে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো, প্রশ্ন তোলা, এবং অস্বীকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা।

ফটো : খাগড়াছড়িতে লোগাঙ গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে পিসিপি’র স্মরণসভা ও প্রদীপ প্রজ্বলন। ১০ এপ্রিল ২০২৬।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!