গত কয়েক দিন ধরে ১১ বছরের মেয়েটির নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নিখোঁজ হওয়া মেয়েটির বাস রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায়। অনেক মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়। এ ধরনের উদ্বেগ খুবই স্বাভাবিক। কারণ অনেকেরই একই বয়সের সন্তান রয়েছে, যারা এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী হতে পারে। মেয়েটির মা ক্যানসারে আক্রান্ত। তাই সন্তান হারানোর বিষয়টি আরো বেশি মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠে ছিল—মেয়েটি কোথায় গেল, কীভাবে হারাল, তার সঙ্গে কোনো অঘটন ঘটেছে কি না?
মেয়েটি অবশেষে নিরাপদে ফিরে এসেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায়। এটি নিঃসন্দেহে একটি সুখবর। তবে যখন জানা গেল যে মেয়েটি নিখোঁজ হয়নি, বরং প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। এই সংবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধমের আবহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই ঘটনা নিয়ে সমালোচনা শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন উঠে —একজন ১১ বছরের মেয়ে কীভাবে প্রেমে পড়ে এবং প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে যেতে পারে?
এখন, মেয়েটি যেহেতু ছোট একটি শিশু, তার আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও ট্রল শুরু হয়েছে। কিছু মানুষ তার বয়স ও পরিস্থিতি উপলব্ধি না করেই তাকে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। এমনকি বাল্যবিয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন এটি শিশুর পুতুল খেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ, ১১ বছর বয়সী একটি বাচ্চা, বিশেষত ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া একটি শিশু, প্রেম বা পুরুষ-নারীর সম্পর্ক সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হওয়ার কথা নয়। কৈশোরকাল এমন এক সময়, যখন শিশুদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এই বয়সে অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে।
এছাড়া, মেয়েটির পরিবারে তার মা ক্যানসারে আক্রান্ত। যা তাকে প্রয়োজনীয় মনোযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটানো অস্বাভাবিক নয়। মেয়েটি নিরাপদে ফিরে এসেছে, এটি আমাদের জন্য বড় একটি আনন্দের বিষয় হওয়া উচিত। কিন্তু এখন তাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বয়ঃসন্ধির সময়ে কিশোর – কিশোরীরা মানসিক একাকিত্ব বা পরিবারের প্রতি এক ধরনের বিরাগ অনুভব করে, যা তাদের বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে প্ররোচিত করতে পারে। যদি কথিত প্রেমিক প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তবে এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ একটি ১১ বছরের মেয়ে তার ইচ্ছায় এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়। তাকে ফাঁদে ফেলা বা প্রতারণার শিকার করা হতে পারে, যা অবশ্যই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংবাদমাধ্যমগুলো মেয়েটিকে উদ্ধার করার পর ভিডিও এবং তার বক্তব্য সংগ্রহে তৎপর হয়েছিল সংবাদমাধ্যমগুলো। সাংবাদিকদের এই আচরণ শিশুদের প্রতি সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী।শিশুদের বিষয়ে সাংবাদিকতা কতটা নৈতিকভাবে হওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে । শেষ পর্যন্ত, মেয়েটি হয়তো তার ভুল বুঝতে পারবে। তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তির বদলে, আমাদের উচিত তাকে সমর্থন দিয়ে পুনর্বাসিত করা, যেন সে তার ভবিষ্যত গড়তে পারে। জীবনের সামনে আরও অনেক সুযোগ রয়েছে এবং আমরা চাই, সে একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবন শুরু করুক।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী , পর্দা , বোরকা হিজাব ও বাল্য বিবাহের বক্তব্যের ডালা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এসেছে। এই ঘটনাকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা করছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে কোন দেশেই কোন কালে অপরাধ কমানো যায়নি।যদি তাই হতো তা হলে দেশে ঘুষ বাণিজ্যের বিস্তার হতো না। যারা এই ঘটনা বা নারী বিষয়ক যে কোন ইস্যুতে নারীকে গৃহবন্দী করা কিংবা বাল্য বিবাহ চালুর প্রস্তাব দেয় তারা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ধর্মীয় রাজনীতি বিস্তার করতে চায়।
সমসমাজ সিটি ডেস্ক
৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৫