বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ন

প্রসঙ্গ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান- ১ম পর্ব- ইমাম গাজ্জালী

ইমাম গাজ্জালী
শুক্রবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

গণ-অভ্যুত্থান হলো বিপ্লবের প্রথম সোপান। গণ-অভ্যুত্থানই পেকে বিপ্লবে পরিণত হতে পারে। গণ-অভ্যুত্থানে যখন শাসক উচ্ছেদ বা রেজিমের পতন ঘটানো হয়, তখনও রাষ্ট্র-প্রশাসন ও সমাজ অক্ষুণ থাকে। কিন্তু বিপ্লবে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে খোল নালচে পাল্টিয়ে ফেলা হয় এবং উৎপাদন সম্পর্ক বদলে ফেলা হয়। সেক্ষেত্রে বলা চলে গণ-অভ্যুত্থানই বিপ্লবের প্রথম সোপান। গণ-অভ্যুত্থান থেমে গেলে বিপ্লবও থেমে যায়। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানই পরবর্তীতে ‘সশস্ত্র বিপ্লবে’ রূপ নিয়েছিল এবং একটি দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। এখানে মুক্তিযুদ্ধকেই কোট আনকোটে সশস্ত্র বিপ্লব বলার কারণ সেখানে প্রধান প্রবণতা ছিল বিপ্লবের। তা সত্তেও উঠতি বুর্জোয়া দল আওয়ামী লীগ ও ভারত কর্তৃক গৃহীত বিপ্লব বিরোধী নানা পদক্ষেপ এবং বামপন্থী কমিউনিস্টদের বালখিল্যতা, অপ্রয়োজনীয় ইস্যুতে বিভক্তি, জের-জবর-দাড়ি-কমা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক, প্রভাবশালী রাশিয়া ও চীনের প্রতি অন্ধ অনুকরণ ও আবেগ-ইত্যাদি নানা কারণে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ বিপ্লবে রূপ নিতে পারেনি। সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

একটা সমাজে যখন বিপ্লব অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটা এতটাই অনিবার্য হয়ে ওঠে যে, দেশে যেসব শ্রেণি এবং সেই শ্রেণির রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তারা বিপ্লব সংঘটনে অসমর্থ হলে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিপ্লব বা বাক বদল বহুদলকে জিরো থেকে হিরো করেছে, আবার বহু হিরোকে জিরো করেছে। এক সময়কার অসম্ভব প্রভাবশালী মুসলিম লীগ এখন জিরো। ১৯৫৭ সালের পর শেখ মুজিবের চেয়ে অনেক বড় নেতা ছিলেন ভাসানী, তার দলও ছিল তুলনায় বড়। ছয় দফা এবং ভাসানীর সত্তরের নির্বাচন বয়কট ও মুজিবের ভূমিধস বিজয় এমন উচ্চতা দিয়েছিল যে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে একাধিকবার তৈরি হয়েছিল। বাহাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে যখন ট্রেডিশন কমিউনিস্টদের বড় অংশ (সিপিবি) আওয়ামী সহযোগী থেকেছে এবং আরেকাংশ মুক্তিযুদ্ধে তত্ত¡গত বিভ্রান্তির কারণে সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, তখন জাসদ ও সর্বহারা পার্টি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল। অভিন্ন শত্রæর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিশেবে এই দুইটি দলের ঐক্য সংহতি সমঝোতা লক্ষ্য করা যায়নি। জাসদের নেতারাও মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বৈঠক করেছিল। ভাসানীকে সামনে রেখে ওই দুই দলের ঐক্য সংহতি সমঝোতা হলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন ধারা সৃষ্টি করত। কিন্তু অতিশয় দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বাংলাদেশে দুইটি প্রবণতা বরাবরই লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে যতবার বৈপ্লবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, ততবারই বুর্জোয়াদের এবং বামপন্থী কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের মধ্যে একই ধরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অফ সিজনে কমিউনিস্টরা সমাজ বিপ্লবের জন্য প্রাণপাত করতে থাকে। আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে তারা অনেক সময় হতাশ হয়ে যায়। তখন ‘জনগণ তাদের কথামত চলে না’, ‘বুর্জোয়াদের কথা শোনে’-ইত্যাদি খেদ-অভিমান প্রকাশ করতে থাকে। আর বিপ্লবের জোয়ার শুরু হলে তারা শীত ঘুমে যায়। বালখিল্যতা, অপ্রয়োজনীয় বিভক্তি, জের-জবর-দাড়ি-কমা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক আর অনুকরণের রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। তাদের কল্পনার বিপ্লব যখন বাস্তবের বিপ্লবের সঙ্গে মেলে না, তখন সেটাকে বিপ্লব বলে গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত থাকে। এসব ঐতিহ্য তাদের বাস্তবের বিপ্লব থেকে দূরে সরিয়ে কল্পনার বিশুদ্ধ বিপ্লবের ঘোরের মধ্যে ঘুম পারিয়ে রাখে। উদাহরণটা এমন যে, যারা সারাবছর ঝড়ে আম কুড়াবার প্রশিক্ষণ দেয়, আর ঝড় উঠলে কাথামুড়ে ঘুমায়। পরে বিরাজমান বিপ্লবকে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’, ‘বুর্জোয়াদের আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলাফল’, ‘সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত’, ‘আঞ্চলিক শক্তিধর দেশের পরিকল্পনা’-ইত্যাদি অভিযোগ দিয়ে নিজেদের অযোগ্যতা ও ভুল-বিচ্যুতি আড়াল করে রাখে এবং সমাজ বিপ্লবের দায়িত্ব থেকে মুক্তির অজুহাত পেয়ে যায়। একটা আত্ম প্রশান্তি খুঁজতে থাকে। কিন্তু অন্ধ হলে তো প্রলয় বন্ধ থাকে না।
অপরদিকে, বিপ্লব উঠতি শাসকশ্রেণি বা বুর্জোয়াশ্রেণির জন্যও অস্তিস্থ-সংকট তৈরি করে। তারা বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে অসমর্থ হলে বিলুপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বুর্জোয়ারা দেশের বামপন্থী বিপ্লবীদের চেয়েও অনেক বেশি পরিপক্ক, কৌশলী ও বুদ্ধিমান। এই যুগে বুর্জোয়া শ্রেণি বিপ্লব সংঘটনে অসমর্থ, সেটা আমরা সবাই জানি। তা সত্তে¡ও তারাই বিপ্লব সংঘটন করে। প্রয়োজনে সমাজের বিপ্লবী অংশের বৈপ্লবিক অর্জন আত্মসাৎ করে, নিজেরা সেই বিপ্লবের নেতা বনে যায়। যেমন একাত্তরে এবং চব্বিশে এর উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়।
একাত্তরের রণাঙ্গণে মাঠে অনুপস্থিত শেখ মুজিবুর রহমান, সেটার কারণ নিয়ে না হয় বিতর্ক করা যাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ, ওই দলটিও রণাঙ্গণে প্রায় অনুপস্থিত। সেটার ব্যাখ্যা কি? এ সত্তে¡ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একক নেতৃত্বের দাবিদার আওয়ামী লীগ। কারণ রণাঙ্গণে না থেকেও নেতৃত্ব দখল করে আওয়ামী লীগ যে কাজ করেছিল সেই পুরানো রাষ্ট্র, পুরানো ভাবাদর্শ ও সাবেকি শ্রেণিকেই বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বিপ্লবী নেতৃত্ব না থাকলে সেটা সম্ভব হত না। বর্তমানের গণ-অভ্যুত্থানের পরও সাবেকি রাষ্ট্র ও ব্যবস্থা বহাল আছে।
চব্বিশে বিএনপির সঙ্গে একাত্তরের আওয়ামী লীগের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দেড় দশকের একটি ফ্যাসিস্ট রেজিম জগদ্দল পথরের মত জাতির ওপর চেপে বসে ছিল। এমনই এক ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন জাতির ওপর চেপে বসেছিল, মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের কোনো পথ ছিল না। মানুষ বিক্ষুব্ধ ছিল। ক্ষোভ ধুমায়িত হচ্ছিল। সেই ক্ষোভ বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু বিক্ষুব্ধের রাজনৈতিক বিস্ফোরণের ভাষা দিতে সক্ষমতা দেখায়নি বিএনপি ও বামপন্থীরা। বিএনপি অক্ষম ছিল তার শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আর বামপন্থীদের অক্ষমতা তার অতীত ভুলের শৃঙ্খলায় আবদ্ধ থাকার কারণে। এসব অক্ষমতা দেশে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করে। আর এর সুযোগই ষোলআনা কাজে লাগিয়েছে এদেশের সা¤প্রদায়িক ও ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী।
চলবে…


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!