বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:২৮ অপরাহ্ন

নারী ফুটবলারদের ‘ বিদ্রোহ ‘ এবং একুশে পদক

লেখক
শনিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের একটি বড় অংশ বর্তমান কোচ পিটার বাটলারের অধীনে আর খেলতে রাজি নয়। ৩০ জানুয়ারী ২০২৫ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাবিনা খাতুন, সানজিদা আক্তার, শামসুন্নাহার, ঋতুপর্ণা চাকমা, মাসুরা পারভীন এবং মনিকা চাকমাসহ মোট ১৮ জন ফুটবলার এই অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন।ফুটবলাররা জানান, ২০২৪ সালের সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ থেকেই কোচ বাটলারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। পরে কোচের দুর্ব্যবহারের কারণে এই দূরত্ব দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। তাঁরা স্পষ্ট জানান, পিটার বাটলারের অধীনে তাঁরা আর খেলতে চান না। ফুটবলাররা জানিয়েছেন, যদি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কোচ পিটার বাটলারের বিষয়ে কোনো সুরাহা না করে, তবে তাঁরা দল থেকে পদত্যাগ করবেন। ফুটবলারদের তিন পৃষ্ঠার লিখিত বিবৃতিতে কোচের বিরুদ্ধে বডি শেমিং, বৈষম্যমূলক আচরণ, অশোভন মন্তব্য, গালাগালি এবং মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের দাবি, পিটার বাটলারের আচরণে ক্যাম্পে আতঙ্ক এবং অসম্মানিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের একুশে পদক

প্রথমবারের মতো কোনো ক্রীড়া দল হিসেবে একুশে পদকপেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। এর আগে ২০০১ সালে সংস্থা হিসেবে স্বাধীনতা পদক পেয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। নারী ফুটবল দল দুবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে—২০২২ সালে প্রথমবার এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বার। সর্বশেষ নেপালে সাফ শিরোপা জয়ের পর আর কোনো ম্যাচ খেলেনি দলটি। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সাফল্য অর্জনকারী দলটিই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। এ সুখবরটি এমন সময়ে এলো, যখন কোচ পিটার বাটলারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১৮ জন নারী ফুটবলার গণপদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন। এই সংকট সমাধানে বাফুফে সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যেই নারী ফুটবল দলের একুশে পদক পাওয়ার ঘোষণা দেশে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কোচের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সিনিয়র ফুটবলাররা সাংবাদিকদের কাছে তিন পৃষ্ঠার লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, কোচ পিটার বাটলার তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • বডি শেমিং: খেলোয়াড়দের শারীরিক গঠন নিয়ে কটূক্তি।
  • বৈষম্যমূলক আচরণ: সিনিয়র-জুনিয়রের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা।
  • অশোভন মন্তব্য: মেয়েদের পোশাক ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বাজে মন্তব্য।
  • গালাগালি ও মানসিক নির্যাতন: নিয়মিত গালিগালাজ এবং মানসিক হয়রানি।
  • ফুটবলাররা বলেন, কোচের আচরণে ক্যাম্পে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং তাঁরা অসম্মানিত ও হতাশ বোধ করছেন।

কে এই পিটার বাটলার?

পিটার বাটলার ৫৮ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ কোচ, যিনি ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের দায়িত্বে আছেন। এর আগে তিনি বাফুফের এলিট ফুটবল একাডেমির কোচ ছিলেন এবং লাইবেরিয়া ও বোতসোয়ানার জাতীয় দলের কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন।

বিতর্কের মধ্যেও ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁর অধীনে বাংলাদেশ নারী দল দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয় করে। তবে তখন থেকেই ফুটবলারদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধছিল, যা এখন প্রকাশ্যে এসেছে। খেলোয়াড়দের এমন বিদ্রোহ নারী ফুটবলের সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিদ্রোহের পেছনের ইস্যু

২০২৪ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকেই কোচ বাটলারের সঙ্গে সিনিয়র ফুটবলারদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কোচ দলকে তরুণ খেলোয়াড়দের দিকে ঝুঁকিয়ে পরিচালিত করতে থাকেন। কয়েকজন সিনিয়র ফুটবলারকে বেঞ্চে বসিয়ে নতুন খেলোয়াড়দের খেলানোর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ জন্মায়। এ সময় কোচের শারীরিক গঠন নিয়ে মন্তব্য ও কিছু ফুটবলারকে ওজন কমাতে বলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ আরও বাড়ে। বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্লেষক রানা শেখ সংবাদ মাধ্যমকে  বলেন, “মূল সমস্যাটি ১৭-১৮ জনকে নিয়ে নয়। ৩-৪ জন সিনিয়র খেলোয়াড়, যাদেরকে কোচ বদলাতে চেয়েছিলেন, তারাই এই বিদ্রোহের কেন্দ্রে আছেন।” ফুটবলারদের অসন্তোষের আরেকটি কারণ বকেয়া অর্থ। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর যে বোনাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিও এখনও মেটানো হয়নি। এ ছাড়া, গত অক্টোবরের পর থেকে নারী ফুটবল দলের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। ফুটবলাররা বলছেন, চুক্তি নবায়ন না থাকায় ফেডারেশন আইনত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না।

বাফুফের অবস্থান

বিদ্রোহের পর ফেডারেশন সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নারী উইংয়ের প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ বলেন, “এখনই বিস্তারিত কিছু বলছি না। তবে এর পেছনে কারা আছে, তা খুঁজে বের করা হচ্ছে।” বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইমরুল হাসান বলেন, “বাংলাদেশ ফুটবল কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে জিম্মি নয়।” অন্যদিকে, কোচ বাটলার এখনও ফেডারেশনের সমর্থন পাচ্ছেন। শনিবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ৩১ জনের মধ্যে ১৩ জন ফুটবলার নিয়ে তিনি অনুশীলন পরিচালনা করেন। কোচের অপসারণ দাবি করা ১৮ জন ফুটবলার সেই অনুশীলনে উপস্থিত ছিলেন না। ফুটবলারদের পক্ষ থেকে ফেডারেশনকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—যদি কোচ পিটার বাটলারকে সরানো না হয়, তবে তাঁরা একযোগে দল থেকে পদত্যাগ করবেন। তাঁদের বক্তব্য, “যদি এমনটাই হয়, তবে ধরে নেব দেশের নারী ফুটবলে আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে।”


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!