বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১৫ অপরাহ্ন

সংবিধান বিতর্ক : ‘মুজিববাদী সংবিধান’ এবং ভারতীয় সংবিধানের প্রভাব প্রসঙ্গে

লেখক
রবিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

এক

৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ইউনুস সরকার ১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানের আইনি কাঠামোতে শপথ নিয়েছেন। গত পঞ্চাশ বছরে ছোট বড় নানান কিছিমের সংশোধনীর খড়গ পড়েছে ১৯৭২ সালের সংবিধানের উপর । শেখ মুজিবর রহমানের শাসনামলে চারটি সংশোধনী হয়েছিল। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের খোল-নাচে পরিবর্তন হয়। বাকশাল নামক দল / জোট গঠন করা হয়েছিল। এই সংশোধনীতে বাকশালে যোগ দেওয়া তিনটি রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য সকল দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল। এই শাসনকে একদলীয় শাসন হিসেবে দেখা হয়।
৫ অগাস্ট ২৪ এর পর থেকেই ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল নিয়ে বিক্ষিপ্ত আলোচনা চলে আসছে। বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান সহ যেকোন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ যেকোন সংবিধান লেখার পর সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক কিছু সংযোজন বিয়োজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতি ‘সংবিধান সংশোধন ‘ বা আইনি কাঠামোতে ‘ নির্বাহী আদেশ ‘ এর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তনের কাজ হয়ে থাকে।

সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য ইউনুস সরকার সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করে। এই কমিশন ইতিমধ্যে রিপোর্ট পেশ করেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে পর্যালোচনা চলছে। সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা -পর্যালোচনা একটি ইতিবাচক দিক। সংবিধান সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের আগেই ডিসেম্বর ২৪ এর শেষ সপ্তাহে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘ জুলাই ঘোষণা পত্র ‘ জনসম্মুখে প্রকাশের ঘোষণা তারিখ ঘোষণা করে। ৩১ ডিসেম্বর ২৪ ছিল সেই দিন। শেষ পর্যন্ত ‘ জুলাই ঘোষণা পত্র ‘ ৩১ ডিসেম্বর ২৪ প্রকাশিত হতে পারেনি। এই নিয়ে প্রাথমিক ভাবে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ইউনুস সরকারের মধ্যে চূড়ান্ত মত ভেদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর পরে ইউনুস সরকার ‘ জুলাই ঘোষণা পত্র ‘ প্রণয়নের দায়িত্ব নেন। সরকারি তত্ত্বাবধানে ‘ জুলাই ঘোষণা পত্র ‘ আলোর মুখ দেখার অপেক্ষায় আছে। এর পরে আলোচনা পর্যালোচনা পর্ব রয়েছে। যেকোন রাজনৈতিক বক্তব্য লিখিত ও আলোচনা-পর্যালোচনা ইতিবাচক দিক। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলের ‘ জুলাই ঘোষণা পত্র ‘ নিয়ে সভা সমাবেশ পর্ব থেকে ‘ মুজিববাদী সংবিধান কবর দেওয়া’ স্লোগান অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আলোচিত হচ্ছে।

দুই

বাংলাদেশে ‘মুজিববাদ’ নামে কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব বা মতবাদ নেই। কোন চিন্তাকে ‘বাদ’ বা ইজম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রয়োজন। আওয়ামীলীগ এ ধরনের কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেনি। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে ‘ মুজিববাদ ‘ বা ‘ মুজিববাদী ‘ শব্দ গুলো আলোচিত হয়েছে। কিন্তু সরকারি ভাবে কখনই বা শেখ মুজিবর রহমান এই ‘ মুজিববাদ ‘ এর রূপরেখা প্রণয়ন করেননি। ১৯৭২ সালে জুলাই মাসে তৎকালীন ছাত্রলীগের ভাঙ্গন হয়। এই ভাঙ্গনের ফল শ্রুতিতে জাসদ নামক দলের সৃষ্টি হয়েছিল অক্টোরব ১৯৭২। এই সময়ে যারা শেখ মুজিবর রহমানের সরকারকে সমর্থন করতেন তারা নিজেদেরকে ‘মুজিববাদী ‘ হিসেবে পরিচয় দিতেন। জাসদ পন্থিরা ‘ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ‘ পন্থি হিসাবে পরিচিত পান। সম্ভবত এই সময়ে ‘মুজিববাদ’ বহুল ভাবে আলোচিত ও প্রচারিত হয়। এই আলোচনা বা প্রচারের কোন তাত্বিক ভিত্তি কখনোই তৈরী হয়নি। ১৯৭২ সালের পর থেকে ছাত্রলীগ বিভিন্ন সময় ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে। ছোট বড় সকল ভাঙন নিজেদেরকে ‘ মূল ছাত্রলীগ ‘ হিসেবে দাবি করত। ১৯৯০ পর্যন্ত ছাত্রলীগের বিভিন্ন অংশকে বুঝাতে ‘জাসদ ছাত্রলীগ ‘ মুজিববাদী ছাত্র লীগ ‘ ‘ জাগপা ছাত্রলীগ ‘ ‘ বাসদ ছাত্রলীগ ‘ ইত্যাদি ব্যাবহৃত হত। কোন নামের পক্ষে কোন তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ার নূন্যতম উদ্যোগ ছিল না।

১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে সাংবাদিক ও আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ‘ মুজিববাদ ‘ নামে একটি ঢাউস সাইজের বই লিখে ছিলেন। সহজ পাঠ্য,পড়ার মত বই। তবে এই বইয়ে নতুন কোন তত্ব বিনির্মিত হয়নি। মুজিবাদ বই লেখার এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। বইয়ের শুরুতে এই সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে ‘লেখকের কতিপয় প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামায়। মুজিববাদে নামকরণ সম্পর্কে শেখ মুজিবর রহমান বলেছিলেন “এ দেশের লেখক, সাহিত্যিক কিংবা ঐতিহাসিকগণ আমার চিন্তাধারার কি নামকরণ করবেন সেটা তাঁদের ব্যাপার, আমার নয়। নামকরণের প্রতি আমার কোনো মোহ নেই।” ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ‘মুজিববাদ’ রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যাবহৃত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আর আলোচনা করেনি। বিষয়টি মাটি চাপা পড়ে যায়। উল্লেখ্য, ইতালির লেখক ও সাংবাদিক ওরিয়ানা ফাল্লাচি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে মুজিববাদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যায় যাননি। মুজিববাদ নিয়ে পরবর্তী দশক গুলোতে নীরব থেকেছেন খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস।

শেখ মুজিবের শাসনকালকে মুজিবাদী শাসন বলার রেওয়াজ রয়েছে। এই রেওয়াজের বড় ভূমিকা রেখেছেন ইলিয়াসের মত লেখকরা। এই স্রোতোধারায় বিপরীত দিক থেকে ভূমিকা রেখছেন চীন পন্থী বামপন্থীরা। সাংবাদিকতা, শিল্প সাহিত্যে তৎকালীন চীনপন্থিদের প্রভাব ছিল। চীনপন্থিরা নিশ্চিত ভাবেই বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের লড়াইয়ে বিভ্রান্তকর অবস্থানে ছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির ফলে এই আরবান এলিটদের কালচারাল আইডেন্টিটি শঙ্কার মধ্যে পড়ে যায়। শেখ মুজিবের শাসনামলের দমন পীড়নের ন্যায্য বিরোধিতা করতে যেয়ে ‘মুজিববাদ ‘ হিসাবে শেখ মুজিবের শাসন কালকে বুঝিয়েছেন চীনপন্থীরা । শেখ মুজিবের শাসন আর দর্শন হিসেবে মুজিববাদ দুটো পুরোপুরি পৃথক বিষয়। ১৯৭২ সালের সংবিধান কোনোভাবেই ‘মুজিববাদী’ সংবিধান ছিল না। বরং এটি ছিল সীমাবদ্ধতা সহ গণতান্ত্রিক নীতি ও মূল্যবোধে গঠিত একটি সংবিধান, যা স্বৈরতন্ত্রের পথে বাধা হিসেবে অবস্থান নিয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে সংবিধানগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। গণতন্ত্রের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া ১৯৭২ সালের সংবিধান তাঁকে এই ব্যবস্থা প্রবর্তনে বাধা দেয়। তাই, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক ভাবে যদি ‘ মুজিববাদ ‘ বলতে হয় , তবে তা বাকশালী শাসন কাল। বাকশাল গঠন এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্র ‘ উত্তরণ তত্বের সম্পর্ক রয়েছে। এই বিষয় পৃথক আলোচনার দাবি রাখে। ‘১৯৭২ সালের সংবিধানকে মুজিববাদী সংবিধান’ বলা বিভ্রান্তি।

তিন

১৯৭২ সালের সংবিধানকে নাকচ করে দেওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। এই সব উদ্দোগের পিছনে রাজনৈতিক দৃষ্টিভিঙ্গি রয়েছে। কোন দৃষ্টিভঙ্গিকে ধামাচাপা দেওয়া দমন পীড়ন। আবার কোন দৃষ্টিভঙ্গিকে চাপিয়ে দেওয়াও দমন পীড়ন। যে কোন দমন পীড়নের পিছে মানুষের মনন তৈরির বিষয় রয়েছে। বর্তমান সময়ে এই ১৯৭২ সালের সংবিধানকে বাতিলের চেষ্টা চলছে। সেই উদ্যোগের সাথে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে যুক্ত করা হচ্ছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানকে ‘ মুজিববাদী’ সংবিধান , ‘ভারতীয় সংবিধানের অনুকরণ’ ‘ কর্তৃত্ববাদী’ বলা হচ্ছে। এই বক্তব্য গুলো রাজনৈতিক। সব রাজনৈতিক বক্তব্যের পিছনে একটি দর্শন থাকে। বাংলাদেশের সংবিধান ভারতীয় সংবিধানের নকল বা অনুরূপ। এই জাতীয় বক্তব্য ইন্টারনেটে ভেসে বেড়ায়। নিচে ভারতীয় সংবিধানের সাথে বাংলাদেশের সংবিধানের মিল-অমিলের বিষয়টি তুলে ধরা হলো।

মানুষ তাঁর পারিপার্শিক অবস্থা থেকে জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা নিয়ে থাকে। এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশের সংবিধান রচনায় সংবিধান প্রণেতারা ব্রিটেনের সংবিধান থেকে দিক নির্দেশনা নিয়ে থাকতে পারেন। যে কোন দেশের সংবিধান রচনার সময় নিকট প্রতিবেশীদের সংবিধানকে অধ্যায়ন করা বা ধারণা নেওয়ার মধ্যে কোন অন্যায়ের কিছু নেই। বিপরীত ভাবে সহজ লভ্য ভাবে পাওয়া তথ্য ভান্ডারকে এড়িয়ে যাওয়া কোন যোক্তিক কাজ নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কোন দীর্ঘ মেয়াদি সংবিধান ছিল না। বেশ কয়েক দফা রদবদলের মধ্য দিয়ে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভবিষৎ সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে। পাকিস্তান পর্বের বিভিন্ন সময় একদলের সংসদ সদস্যদের ভাগিয়ে নিয়ে বিরোধী দলের সাথে ভোট দিয়ে সরকার পতনের নজির রয়েছে। এই জাতীয় নাজুক পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে স্বাধীন ভোটাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখে। ভারত – পাকিস্তান সহ এশিয়ার বহু দেশে অনুরূপ অনুচ্ছেদ রয়েছে। ব্রিটেন , অস্ট্রেলিয়া কিংবা যেসমস্ত দেশে ৭০ নং অনুচ্ছেদের মত বাঁধাধরা নেই। সেখানেও কদাচিৎ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার নজির রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানকে অনেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভারতের সংবিধানের কপি বলে দাবি করেন। এই দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা। ১৯৭২ সালের সংবিধানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই আলোচনা শুধু অন্য দেশের অনুকরণ কি না সে বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চার মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র—বাতিল করতে চায়, তারাই এ ধরনের বিভ্রান্তিমূলক ধারণা ছড়ায়। এই মূল নীতি গুলো ভারতের সংবিধানে নেই। ১৯৭৬ সালে ধর্ম নিরেপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র যুক্ত হয়েছে।

১. জাতীয়তাবাদ: জাতিরাষ্ট্র বনাম বহুজাতিক রাষ্ট্র : বাংলাদেশ একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র। ১৯৭২ সালে প্রতিবাদ সত্বেও চাকমা মারমা ও অন্যান্য জাতিদের অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি। অন্যদিকে, ভারত কোনো জাতিরাষ্ট্র নয়; এটি একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র। ভারতের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ নেই।

২. ধর্মনিরপেক্ষতা: ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হওয়ার সময় ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা হয় স্বাধীনতার চেতনা ও বামপন্থী শক্তির তীব্র দাবির প্রেক্ষিতে। কিন্তু ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময় (১৯৪৯) সেখানে সরাসরি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পরে ১৯৭৬ সালে, বাংলাদেশে সংবিধান প্রণয়নের চার বছর পর, ভারতের সংবিধানে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ (secularism) অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

৩. সমাজতন্ত্র: বাঙালির আর্থ-সামাজিক মুক্তির প্রত্যয়। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রকে বাংলাদেশ সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই নীতি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শোষণমুক্তির পথে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিল। অনেকে এই সমাজতন্ত্রের মধ্যে কার্ল মার্ক্সের সমাজতন্ত্র খুঁজে ফেরে। পৃথিবীতে বহু ধরণের সমাজতান্ত্রিক বা সমতা ভিত্তিক দর্শন রয়েছে। সংবিধানে বর্ণিত সমাজতন্ত্রের সুনিদৃস্ট কোন রূপরেখা কখনো প্রকাশিত হয়নি। ১৯৬০/৭০ দশকে বহু স্বাধীন দেশ সমাজতন্ত্রকে সংবিধান স্থান দিয়েছে। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার মতোই, ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি সংবিধানে ১৯৭৬ সালে সংযোজন করা হয়।

৪. গণতন্ত্র : গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থার কথা সকল বিভিন্ন ভাবে , বিভিন্ন আঙ্গিকে সকল দেশের সংবিধানে আছে। পাকিস্তানের সিকি শতাব্দীর শাসনামল ছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময়কাল। তাই বিশেষভাবে গণতন্ত্রের কথা সংবিধানে আসা একটি যৌক্তিক বিষয়।

ঢালাও ভাবে বাংলাদেশের সংবিধান ভারত বা অন্যদেশের অনুরূপ বলার কোন যৌক্তিক কারণ। ব্রিটিশের উপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল এমন সব দেশের সংবিধান রচনায় ব্রিটেনের সংবিধান টি ধারণা বা অনুরেণা নেওয়ার নজির ভুরিভুরি। বাংলাদেশের সংবিধান সীমাবদ্বতা নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য লিখিত। অন্য কিছুর নকল নয়। সংবিধানের মূল নীতিগুলো রাষ্ট্রের সদিচ্ছার বিষয়। মৌলিক অধিকার জনগণের বিষয়। সংবিধান যেহেতু জনগণের ইচ্ছা-অভিপ্রায় তাই মৌলিক অধিকারকে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধান শুধু আইনজীবীরা ব্যাখ্যা করবেন না। সংবিধান যেহেতু জনগণের দলিল, সেহেতু তারা বলতেই পারেন সংবিধান তাদের অভিপ্রায়ের সঙ্গে আছে কি নেই ! জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে, রাষ্ট্রের অন্যান্য নীতি ও কাঠামো অর্থহীন হয়ে পড়বে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!