‘থার্ড গিয়ার দিয়ে এক্সিলেটরে পা রেখে আস্তে আস্তে ঢুকে পড়েছি ঘরে। আমাকে দেখেই গাড়ির হেডলাইটের মতো জ্বলে উঠলো বউয়ের চোখ দুটো। ভয়ে আমার তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। আমিও ঘর থেকে বেড়িয়ে এলাম ব্যাক গিয়ার মেরে। তারপর এইট্টি মাইল স্পিডে চলে এলাম এখানে।’ খুব সহজেই বুঝা যায় যে, এই কথাগুলো পরিবহনের কোনও এক শ্রমিকের। এ ভাবেই বিভিন্ন পেশার মানুষের কথাবার্তায় শব্দ চয়নে তফাৎ ঘটে। আমরা জানি যে মানুষের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষার সৃষ্টি। আর এই ভাষার প্রয়োগ করতে গিয়ে তাদের কথাবার্তায় স্ব স্ব পেশায় ব্যবহৃত কথাগুলো চলে আসে সহজেই। প্রয়োজনে অন্যের ভাষা থেকে শব্দ ধার নেয়। ভাষায় বৈচিত্র আসে, সমৃদ্ধ হয়, সৃষ্টি হয় জাতীয় ভাষা।
পেশাজীবীদের মতো বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের ভাষা- যেমন বিত্তবান আর বিত্তহীন, শাসক আর শাসিত, শোষক আর শোষিতের ভাষা আলাদা হয়। এ পর্যায়ে ভাষা শুধু মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম থাকে না, হয়ে ওঠে ভাষা ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য সাধনের অস্ত্রও। যেমন, পাÐব বংশের যুধিষ্ঠির ছিলেন সত্যবাদী। ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বলেছিলেন, ‘অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ।’ ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাগুলো বলেন উচ্চস্বরে, যাতে তা সবাই শুনতে পায়। আর ‘ইতি গজ’ বলেন নি¤œ স্বরে, যাতে কথাগুলো তেমন কেউ শুনতে না পায়। এই ছোট্ট কৌশলী বাক্য জিতিয়ে দেয় পাÐবদের। যুধিষ্ঠির জানতেন, প্রতিপক্ষ কৌরব বংশের এক দুর্ধর্ষ সেনাপতির নাম অশ্বত্থামা। ‘অশ্বত্থামা হত’ কথাটি শত্রæ পক্ষের মধ্যে প্রচার হলে তারা ধরেই নেবে যে, সেনাপতি অশ্বত্থামা মারা গেছেন। আর সবাই জানতো যে যুধিষ্ঠির কখনো মিথ্যা বলেন না। ফলে বিশৃঙ্খলা ঘটবে যুদ্ধক্ষেত্রে, ঘটলোও তাই। এভাবেই পরাজয় নিশ্চিত হয় কৌরবদের। বিজয় ঘটে পাÐবদের। পরে দেখা গেল, সেনাপতি অশ্বত্থামা মারা যায়নি, মারা গেছে অশ্বত্থামা নামের এক হাতি। কায়দা করে কথা বলায় ভাষার মধ্যে ঢুকে পড়ে অস্পষ্টতা, সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি, কথার জালে ফেলে ফাঁকি দেওয়া, মিথ্যে কথা বলা শুরু হয়। ভাষার মধ্যে ঢুকে পড়ে ‘রাজনীতি’। ধীরে ধীরে ভাষা হয়ে ওঠে শাসক আর শাসিতের, শোষক আর শোষিতের পরস্পরকে ফাঁকি দেওয়া, আঘাত করা বা ষড়যন্ত্রের অস্ত্র, এক শ্রেণী আরেক শ্রেণীকে কী ভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবে তারই ঘুঁটি। এক শ্রেণীর কাছে অন্য শ্রেণীর মনের ভাব তথা উদ্দেশ্য প্রকাশ হয়ে পড়লে বিপদ বাড়বে, কথার ফাঁকিবাজি ধরা পড়বে, শাসকের কথা মানতে চাইবে না শাসিত, দরিদ্র বশে থাকবে না ধনীদের। তাইতো শ্রেণী বিভক্ত সমাজে দেখা যায় দুই রকম ভাষা, রাজার ভাষা আর প্রজার ভাষা, শাসকের ভাষা আর শাসিতের ভাষা, ধনীর ভাষা আর দরিদ্রের ভাষা। ব্রহ্মা থেকে পেয়ে ব্রাহ্মণের মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসা সংস্কৃত ভাষা যেন বৈশ্য ও শুদ্র অর্থাৎ দরিদ্ররা বুঝতে না পারে সে জন্য ধর্মীয় নির্দেশ জারি হয়, সাধারণের এ ভাষায় কথা বলা পাপ, শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শাসিত বিত্তহীন সাধারণ মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমও ভাষা। এ ভাষা শাসক বিত্তবানের আশ্রয়-প্রশ্রয় পায় না। বেড়ে ওঠে অবহেলায়। যেমন, অনার্য, লোকায়ত, প্রাকৃত, দেশি থেকে বাংলা ভাষা। কিন্তু একটি দেশে সাধারণ মানুষ সংখ্যায় যেহেতু অনেক বেশী, তাই অসচেতনতা সত্বেও তাদের ভাষার সমৃদ্ধি ঘটতে থাকে, ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে অপ্ররিরোধ্য। তখন সাধারণের বিজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে, বিতাড়িত হয় বিদেশী, বিজাতীয়, শাসক এমনকি বিত্তবানের ভাষা। তাইতো, ভাষার লড়াইয়ের সাথে বিত্তবান-বিত্তহীন শ্রেণীর লড়াই অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে।
ভারতবর্ষের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ব্রহ্মার ভাষা সংস্কৃতর সঙ্গে এদেশিয় ভাষার লড়াই। যখন শাসকের পরাজয় ঘটে তখন সে ভাষারও বিলুপ্তি বা বিতাড়ণ ঘটে। যুগে যুগে এভাবেই সাধারণ মানুষ তার ভাষার লড়াই করতে গিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে লড়েছে, কথা বলার স্বাধীনতা চেয়েছে, আর লড়াই করতে গিয়ে এনেছে ভৌগলিক স্বাধীনতাও। যারা ভাষার লড়াইয়ের মাঝপথে হাল ছেড়ে দিয়েছে, তাদের ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এক সময় হারিয়ে ফেলেছে স্বাধীনতাও। ধীরে ধীরে অস্তিত্বই বিলীন হয়ে পড়েছে সে জাতির। ভারত বর্ষের ইতিহাসের পাতায় পাতায় এর উদাহরণ মিলবে।
আমাদের পরিচিত সংস্কৃত, আরবী, ফার্সি, পর্তুগিজ ভাষা এমন রাজার ভাষা, বিদেশি ভাষা। এসব ভাষা এদেশে এসেছে শাসকের ভাষা হিসেবে। চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এদেশের সাধারণ মানুষের ওপর। কিন্তু এদেশের মানুষ সে সব ভাষার ধার ধারেনি, প্রতিরোধ করেছে। ওদের কিছু কিছু শব্দ গ্রহণ করে নিজের ভাষাকে সমৃদ্ধও করেছে, কিন্তু মূলে ঠিক রেখেছে। বর্জন, লড়াই এবং গ্রহণ করার মধ্যে দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে, উন্নত করেছে নিজের ভাষাকে। এক সময় এদেশ শাসন করতে আসে ইংরেজ জাতি, তারা ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর জন্য নানা কায়দা কসরত করে। কিন্তু অবশেষে ভারতবর্ষের জনগণের বর্জণে আন্দোলনে মহান [!] ইংরেজি ভাষাও সরে যেতে বাধ্য হয়। তাইতো সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় যে, ভাষার সংগ্রামই স্বাধীনতার সংগ্রাম, দারিদ্র মুক্তির সংগ্রাম, শ্রেণীর সংগ্রাম, জনগণের মুক্তির সংগ্রাম।
ইংরেজরা যখন বিদায় নেয় তখন ধর্মীয় উন্মাদনায় ভাগ করা হয় ভারতবর্ষ, সৃষ্টি হয় হিন্দুদের জন্য ভারত এবং মুসলামানদের পাকিস্তান। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় পূর্ব বাংলা অন্তর্ভূক্ত হয় পাকিস্তানে, নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। আবারো সেই ভাষার প্রশ্ন। আবারো সেই স্পষ্টতা-অস্পষ্টতা, নিজ ভাষায় কথা বলার অধিকার-অনধিকার, স্বাধীনতা-পরাধীনতা, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তির প্রশ্ন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা জনগণের ভাষা হবে নাকি রাজা, শাসক, বিত্তবানের ভাষা হবে? পাকিস্তানের শাসকরা সামনে নিয়ে আসে উর্দু ভাষাকে। শুরু হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সরল মানুষকে ধর্ম দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা। নেওয়া হয় এদেশের সাধারণ মানুষের ভাষা বাংলা ভাষাকে বিতাড়ণের উদ্যোগ। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে শুরু হয় ভাষা রক্ষার লড়াই। এটা শুধু ‘পূর্ব পাকিস্তানে’র বাংলা ভাষার লড়াই নয়- সিন্ধি, বেলুচসহ পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার লড়াইও। কারণ ভাষা শুধু মায়ের ভাষা, প্রেমের ভাষা, আবেগের ভাষার প্রশ্ন নয়, স্বার্থের প্রশ্নও। বাঙালিদের শিক্ষিত শ্রেণী ভাবে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা না গেলে চাকরি মিলবে না, চাকরি না মিললে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাঙালিরা। ঘাড়ে বসে প্রভূত্ব করবে ইংরেজি আর উর্দু জানা লোকজন। তাই দাবি ওঠে, ‘পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ এটা শুধু ভাষার লড়াই থাকে না, হয়ে ওঠে অস্তিত্বের লড়াই। প্রতিবাদের গর্জে ওঠে ছাত্রযুব সমাজ। রাজপথে রক্ত ঢালে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক।
ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী পিছু হটে। বাংলা ভাষাকে ইসলামীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, ইতিহাস হিসেবে প্রচার হতে থাকে যে, মুসলিম শাসকেরাই বাংলাভাষার রক্ষাকর্তা, মুক্তিদাতা। এভাবে বাংলা ভাষার ইতিহাসকেও পাল্টে ফেলার প্রবণতা লক্ষনীয়। বলা হতে থাকে, ‘হাজার বছর আগে বাঙালি জাতির মুখের ভাষা বাংলাকে কেড়ে নিয়েছিল দক্ষিন ভারত থেকে আগত সেন রাজারা। সেন রাজাদের হিন্দু পন্ডিতেরা নির্দেশ জারি করেছিল, বাংলা ভাষা বলবে অথবা শুনবে তারা রৌরব নামক নরকে যাবে। ওই সময় তুর্কি বংশোদ্ভূত ইকতিয়াউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি নির্যাতীত বাঙালিদের মুক্ত করতে এগিয়ে আসেন এবং মাত্র ১৮ জন ঘোরসওয়ারী নিয়ে সেন রাজাকে পরাজিত করে বাংলাকে স্বাধীন করেন।’ [খন্দকার কামরুল হুদা- স্বাধীনতা সংগ্রাম ও শেখ মুজিব, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা- ৩২।] এই স্বাধীনতার লড়াই কিন্তু এদেশিয়রা করেনি, করেছে বিদেশিরা। যাদের প্রচার করা হয় মুসলমান হিসেবে। এখানে ইতিহাস বিকৃতি এবং বাঙালির ইতিহাসে সাম্প্রদায়িকতা ঢুকানোর চেষ্টা সুস্পষ্ট। অথচ সেকালের প্রবাদ অনুযায়ী, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, নলখাগড়ার প্রাণ যায়।’ এই সব যুদ্ধের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক ছিল না, শুধু শাসক বদল হওয়া ছাড়া।
ল²ণ সেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং সংস্কৃত ভাষার পৃষ্ঠপোষক এবং শাসক হিসেবে প্রজাদের এদেশীয় ভাষার বিরোধীতা করতেন। বখতিয়ার খলজি [১২০০ খ্রিষ্টাব্দ] তাদের ক্ষমতাচ্যূত করেন। এরপরই ব্রাহ্মণ শাসকের মতোই মুসলমান শাসকেরা বাংলা শাসন করার সুযোগ পায়। এরও বেশ কিছুদিন পর শুরু হয় স্বাধীন সুলতানি শাসন যার প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। ‘তিনি শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সম্ভাব্য দিল্লির আক্রমন প্রতিরোধ কল্পে নিজের সেনাবাহিনীর সাথে স্থানীয় জনবল যুক্ত করার উদ্দেশ্যে স্থানীয় জনসাধারণের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এজন্য তিনি নিজের অমাত্যবর্গ ও সেনাবাহিনীকে স্থানীয় ভাষা শিক্ষার নির্দেশ দেন এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্থানীয় ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন।’ [আবু বকর ভূঁইয়া- বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়- পৃষ্ঠা ৩৫।] এ থেকে স্পষ্ট যে, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ ধর্মীয় কারণে বা ব্যাক্তিগত উদারতায় এদেশীয় জনসাধারণের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন নি, স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করেন নি। শাসক হিসেবে নিজের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যেই সাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। শাসকের আনুকূল্য পেয়ে দ্রæত বিকশিত হয়েছে বাংলা ভাষা বাঙালি সংস্কৃতি।
শাসক-শাসিত যখন একই সূত্রে গাঁথা হয়, স্বার্থ হয়ে ওঠে অভিন্ন তখন দ্রæত সমাজে শৃঙ্খলা ফিরে আসে, বন্ধ হয় হানাহানি, দ্রæত বিকশিত হয় সাহিত্য সংস্কৃতি। মাথা উঁচু করে বিশ্বমাঝে দাঁড়ায় সে জাতি। যদিও তখনো এ ভাষার নামকরণই দেশি বা লোকভাষা হিসেবেই চলছে এ ভাষা, কিন্তু অনুবাদ হচ্ছে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ ইত্যাদি গ্রন্থের, যোগাযোগ গড়ে উঠঠে বিদেশী বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে। দেশি ভাষার মাহাত্ম গুণকীর্তন করে লেখা হচ্ছে পাঁচালী, কবিতা। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে মহাভারতের অনুবাদক শ্রীকর নন্দী বলেন-
‘দেশি ভাষা এহি কথা করিয়া প্রচার
সঞ্চরউ কীর্তি মোর জগৎ ভিতর।’
অর্থাৎ-
‘দেশি ভাষায় এই কথা প্রচার করে আমার কীর্তির কথা জানিয়ে দাও।’
কবি শেখর দেশি ভাষায় লিখতে গিয়ে বলছেন-
‘কহে কবিশেখর করিয়া পুটাঞ্জলি
হাসিয়া না পেলাহ লৌকিক ভাষা বলি।’
অর্থাৎ-
‘লৌকিক ভাষায় কাব্য রচনা করছি বলে কেউ যেন হেঁসে ফেলো না।’
সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পাচ্ছি দৌলত কাজীকে। তিনি বলছেন-
‘দেশি ভাষে কহ তাক পাঞ্চালির ছন্দ
সকলে শুনিয়া যেন বুঝয়ে সানন্দ’
অর্থাৎ
‘দেশি ভাষায় বলো, যাতে সহজেই সবাই বুঝতে পারে।’
দেশি ভাষাকে হিংসা করার লোকের অভাব ছিল না, তাইতো কবি আব্দুল হাকিমের সাহসী উচ্চারণ আমরা পাই-
‘যে সব বঙ্গেত জন্ম হিংসে বঙ্গবাণী
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ণ জানি।’
অথাৎ-
‘বঙ্গে জন্মগ্রহণ করেও যারা বঙ্গবাণীকে হিংসা করে তারা যে কার জন্ম তা নির্ণয় করা মুশকিল।’
শাসক শাসিতের চিন্তার ঐক্য, দুপক্ষের স্বার্থের ঐক্য অভিন্ন অর্থাৎ দিল্লীর শাসন-হামলা মুক্ত থাকার চেষ্টার যে ঐক্য গড়ে ওঠে তার ফলে উন্নতি ঘটতে থাকে দেশিয় ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির উন্নতি। এক সময় দেশটি বঙ্গদেশ থেকে বাংলায় পরিণত হয়, দেশি, লোক ভাষা থেকে রূপান্তরিত হয়ে তা হয়ে ওঠে বাংলাভাষা।
এ পর্যায়ে অবশ্যই মনে রাখা দরকার যে, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ বা তার জ্ঞাতিগোষ্ঠী মাঝারি পর্যায়ের শাসক হওয়ায় দিল্লির শাসন থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে দেশি জনের সঙ্গে মিলেমিশে টিকে থাকার কৌশল নিয়েছিলেন। এ জন্য সুলতানেরা এবং বাংলার জনগণ উভয়ই উপকৃত হয়। সুলতানেরা এদেশীয়দের সহযোগিতায় দিল্লির বেশ কিছু আক্রমন প্রতিহত করতে সক্ষম হয় দীর্ঘদিন। একই ভাবে এদেশীয় জনগনের সংস্কৃতি ভাষা পরদেশী আক্রমন থেকে রক্ষা পেয়ে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। সে কৃতিত্ব অবশ্যই শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এবং তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর। কিন্তু অবশ্যই কোনও মুসলিম সুলতানের নয়। এখানে ধর্মের কোনও কৃতিত্ব নেই। আছে শাসক হিসেবে জনগণের পক্ষে থাকার সঠিক সিদ্ধান্তের।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে সংঘটিত পলো বিদ্রোহের নেতা জমিদার ঈশান রায়। ১৮৭২-‘৭৩ সালে সংঘটিত এ কৃষক আন্দোলন পুরো ভারতবর্ষের ইংরেজ শাসনকে নাড়িয়ে দেয়। বৃটিশ সরকার আন্দোলনের ফলশ্রæতিতে ১৮৮৫ সালে প্রজাস্বত্ত¡ আইন পাশ করতে বাধ্য হয়। এখন জমিদার শাসনের পক্ষের কেউ যদি প্রমান করার চেষ্টা করেন যে, ঈশান রায় জমিদার ছিলেন, তিনি জমিদারী উদারতায় পলো বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেই ওই বিদ্রোহী কৃষকেরা বিজয়ী হয়, তখনই ইতিহাসে বাধে বিপত্তি। উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়ে ইতিহাসকে চালিত করার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। ইতিহাস পাঠক মাত্রই জানেন যে, পলো বিদ্রোহের নেতা ঈষান রায়ের জমিদারি ছিল ছোট এবং তিনি বড় জমিদারদের সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে কৃষকের পক্ষ নেন। আর এটাও গোপন কথা নয় যে, মাঝারি বিত্তবানেরা সব সময় দোদুল্যমানতায় ভোগেন। তারা তাদের স্বার্থ অনুযায়ী কোনও না কোনও দলে ভিড়ে যান এবং ফায়দা লোটার চেষ্টা করেন। শাসক বিত্তবান গোষ্ঠীর শাসক শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বা ঈষান রায়কে বাঙলার ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে মুসলমান বা জমিদার হিসেবে উদারতা দেখানোর চেষ্টা মূলত বিভ্রান্তি ছড়ানো চেষ্টা। এতে বাঙালি জাতির ইতিহাস মনস্ক হয়ে ওঠার পথে জটিলতা সৃষ্টি করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়।
যাইহোক, ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারির পর পিছু হটে পাকিস্তানি শাসক। প্রতিশ্রæতি দেওয়া হয় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার, অন্তরালে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। চেষ্টা করা হয় ‘রবীন্দ্র সংগীত’ লেখানোর। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা থেকে ‘মহাশশ্মান’ পাল্টে লেখার চেষ্টা করা হয় ‘গোরস্থান’। ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’ কবিতার পরিবর্তণ করা হয়, পড়ানো হতে থাকে ‘ফজরে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি।’ এভাবেই ভাষার ইসলামিকরণের চেষ্টা অব্যাহত থাকে। এতেও সামাল দিতে না পারায় বাঙালিকে বশে রাখার জন্য জারি করা হয় সামরিক শাসন। হরণ করা হতে থাকে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার। বাঙালিরা বুঝতে পারে যে, এ শুধু ভাষার প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন স্বাধীনতারও। বাঙালির নিজস্ব অভিজ্ঞতায় উঠে আসে স্বাধীনতার কথা। এ অঞ্চলের জনগণ পাকিস্তানের নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীন করে ফেলে বাংলাদেশকে। লক্ষ্য, একটি স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ধর্মে ধর্মে কোনও ভেদাভেদ ঘৃণা থাকবে না, একজন আরেকজনকে শোষণ করতে পারবে না। গড়ে উঠবে মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সাধারণ মানুষের বাংলাদেশ।
কিন্তু সাধারণ মানুষ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলে শাসক বিত্তবানেরা বেকায়দায় পড়ে যায়। নিজেদের বাঁচার পথ খোঁজে। শাসক-শোষক শ্রেণী কৌশলী হয়। তারা কৌশলী পথে একদিকে সাধারণ মানুষকে বিজয়ের স্বাদ পূরণ করে বিজয়ী হতে সহযোগিতা করে, অন্যদিকে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে সে বিজয়কে কেড়ে নেওয়ার পথও সৃষ্টি করা হয়। বিজয়ের স্বাদ পূরণ হওয়া মানুষ ঘরে ফিরে যায়, ছড়ানো হয় বিভ্রান্তি। মীমাংসিত বিষয়কে তর্কে ফিরিয়ে আনা হয়। ঘোলা করা হয় পানি। হতাশা ছড়িয়ে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়, ‘আগের রাজাই ভালো ছিল।’ স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না। বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিয়ে ঘরে ফিরে যায়, ফিরিয়ে আনা হয় পুরনো কাঠামো। জাতীয় ঐক্য ভেঙ্গে যায়, টিকে যায় শ্রেণিবিভক্ত সমাজ, শাসক-শাসিত, ধণী-দরিদ্র। উন্নয়নে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে বিত্তহীনেরা ক্ষিপ্ত হয়, ক্ষোভ প্রকাশ করে। এক দেশ এক শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হয়না, ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিহ্ন করা যায়না। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশে পাকিস্তানি ভাবধারার বিপরীতে বাঙালি ভাবধারা বিকাশের সুযোগই পায় না। এতে লাভবান হয় পাকিস্তানি ভাবধারা, যে ধারার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারালো তিরিশ লক্ষ মানুষ। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বাড়তেই থাকে। ভৌতিক ভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয় অনেকে। পাকিস্তানি ভাবধারার রাষ্ট্রে বাঙালি রাষ্ট্রপ্রধান থাকবে কেন? অবশেষে বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বুক ফুলিয়ে চলতে শুরু করে পাকিস্তানি ভাবধারার ধারক বাহকেরা।
কখনো প্রকাশ্যে কখনো কায়দা কৌশলে চলতে থাকে ভাষার ওপর আক্রমন। প্রকাশ্যে শ্লোগান ওঠে, ‘তোয়াব ভাই তোয়াব ভাই, চাঁন তারা পতাকা চাই।’ মাদ্রাসা শিক্ষা ফুলেফেপে উঠতে থাকে। ইসলামী জালসার নামে পাকিস্তানি ভাবধারার রাজনীতি গ্রামে গ্রামে প্রচার হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে চলতে থাকে ভাষার ওপর আক্রমন। উপর তলার মানুষের মধ্যে আধুনিকতা বা বিদেশের সাথে তাল মেলানোর যুক্তিতে ইংরেজি শব্দের প্রভাব বাড়তে থাকে। বাবা, কাকা, মামা, চাচা, ফুপা, মেসো পিসের পরিবর্তে মাম্মী, ড্যাডি, আঙ্কেল, আন্টির প্রচলন ঘটতে থাকে। দরিদ্র সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মের প্রভাব খাটিয়ে বাংলা ভাষার প্রচলিত শব্দকে নিস্ক্রিয় করে সেখানে আনা হতে থাকে আরবী শব্দ। যেমন- কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা যায়, ‘কেমন আছেন?’ উত্তর আসে ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ এতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত উত্তর ‘ভালো আছি’ বা ‘সর্দিগর্মি হয়েছে’ ‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না’ ইত্যাদি স্পষ্ট উত্তর দিতে ভুলে যেতে থাকে সাধারণ মানুষ। এদেশের সাধারণ মানুষের ‘আল্লাহ ভীতি’ কারো চেয়ে কম নয়। আগে কোন অন্যায় করতে দেখলে বলা হতো ‘আল্লাহকে ভয় পাও না কেন’ অথবা পরামর্শ দেওয়া হতো ‘আল্লাহকে ভয় পাওযা উচিত।’ এখন সেখানে বলা হচ্ছে ‘তাকওয়া’ নেই কেন অথবা ‘তাকওয়া’ থাকা উচিত। এভাবেই প্রচলিত বাংলা শব্দকে নিস্ক্রিয় করে বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ জোর করে ঢোকানো হচ্ছে বাংলাভাষায়। এতে বাংলাভাষা অহেতুক ভারি এবং জটিল হয়ে উঠছে। এক সময় এ সব শব্দের জটিলতায় বাংলাভাষাকে আর হয়তো চেনাই যাবে না।
কিন্তু বাঙালি জাতি বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে একটি অভিজ্ঞ জাতি। এরা ভাষার সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতা পর্যন্ত এগিয়ে গেছে। সে স্বাধীনতা অর্জন করেছে তিরিশ লক্ষ মানুষের আত্মাহুতির বিনিময়ে। এ জাতি তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে মুক্তির পথে এগিয়ে যাবে, দেশিবিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদেরও নির্মূল করবে। সফল হবে মুক্তিযুদ্ধও। বাঙালি জাতি অবশ্যই এগিয়ে যাবে প্রগতির পথে।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক কর্মী।