ধর্মপাশা সুনামগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা। এক সময়ে যোগাযোগ ব্যাবস্থা বেশ কঠিন ছিল। এই যোগাযোগ ব্যাবস্থার দুর্গমতার কারণে এক সময় “মা করে না ছেলের আশা’ এরই নাম ধর্মপাশা এই রকম একটি জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল। বতর্মানে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। কংস নদ সেতু যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতিতে প্রভাব ফেলেছে।গত এক সপ্তাহে ধর্মপাশার দুটি মাজারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রথমে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজনগর গ্রামে হজরত লোড়া পীরের মাজারে আগুন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২৬ ফেব্রুয়ারি নোয়াবন্দ গ্রামে হজরত কালাম শাহ (রহ.) মাজারেও একই ঘটনা ঘটে। এতে মাজারের শামিয়ানা, গিলাফ ও অন্যান্য উপকরণ পুড়ে যায়। স্থানীয়রা দ্রুত আগুন নেভাতে সক্ষম হলেও মাজার দুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য ধর্মপাশায় বেশ কিছু মাজার রয়েছে। সম্ভবতঃ অতীতের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা পীর-মাজার এর বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। ৫ অগাস্ট ২০২৪, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে একের পর এক মাজারে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। সিলেট, গাজীপুর, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নোয়াখালী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব হামলা সংঘটিত হয়েছে, যার ফলে কয়েকজন আহতও হয়েছেন। মাজারে হামলা চালাতে বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইভেন্ট খুলে আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাধারণত সুফি বা ধর্মীয় প্রচারকদের কবরের ওপর মাজার গড়ে ওঠে, যেখানে অনেক মানুষ মানত করে এবং ধর্মীয় আচার পালন করে। মাজারে উরস পালন, এবং মাহফিল আয়োজনকে নাজায়েজ মনে করেন সালাফি ও ওহাবি মতাদর্শের অনুসারীরা। তাদের কাছে মাজারের কার্যক্রম বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, যা হামলার অন্যতম প্রধান কারণ। সৌদি আরব সালাফি ও ওহাবি মতাদর্শের পৃষ্টপোষকতা করে আসছে। ১৯৬০-৭০ দশকে সৌদি আরব তেল বিক্রির টাকায় ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। একই সময় বিশ্ব ব্যাপী আমেরিকা- ইউরোপীয় পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মুসলিম দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়েছিল। এই আন্দোলন গুলোকে দমন করতে আমেরিকার সাথে যোগ দেয় সৌদি আরব। দেশে দেশে বিলিয়ন- বিলিয়ন ডলার ব্যায় করে ইসলামের সৌদি ভার্সন প্রচার ও প্রসার করা হয়। সৌদি আরব সালাফি/ওয়াহাবি একদিকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক আন্দোলনের উপর সাম্রাজ্যবাদের বজ্রমুষ্টি হয়ে আঘাত হানে। অপর দিকে পীর- মাজার এবং সালাফি ও ওহাবি মতাদর্শের সাথে ভিন্ন মত পোষণ করে এমন ইসলামিক মাজহাব [ গ্ৰুপ ] কে আক্রমন করে আসছে। এই আক্রমনের ধারাবাহিকতায় সারাদেশে মাজারের উপর আক্রমণ চলছে। এছাড়া, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীও এই হামলায় জড়িত থাকতে পারে। এক দল আরেক দলের চেয়ে ‘ বেশি মুসলমান ‘ এই প্রবণতা ও রাজনৈতিক চিন্তা থেকে মাজার ও ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়ে আসছে।
মাজার আক্রমণের প্রধান অজুহাত হিসেবে দেখানো বলা হয় ‘ অনৈসলামিক ‘ কার্যকলাপ। কে কিভাবে নির্ধারণ করছে কোনটি ‘ অনৈসলামিক ‘ কাজ। গত ১১ জুলাই ২০২৪ ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় তিনশত বছরের পুরাতন ও ঐতিহাসিক বিবি সখিনার মাজার রাতের আঁধারে মাটি খুঁড়ে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। কংক্রিটের ঢালাই ভেঙে প্রাচীন এই মাজারে চার ফুট গভীর গর্ত করে দিয়েছে। বিবি সখিনার মাজারটি রানীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের সন্ধ্যারই সাতঘরিয়া এলাকায় একটি বিশাল পুকুর পাড়ে অবস্থিত। পুকুরটির নামও বিবি সখিনা পুকুর বলে পরিচিত। শত বছরের একটি কবর বা স্থাপনা ধ্বংস করা হলো রাষ্ট্র নির্বিকার। সিলেটে শাহ্পরানের মাজারে আক্রমণ হয়েছে। একই অভিযোগ। এই আক্রমন গুলো বন্ধ হওয়ার মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা।
ফটো : ধর্মপাশা উপজেলার রাজনগর গ্রামের লোড়া পীরের মাজার। পেট্রলভর্তি বোতলের মাধ্যমে মাজারটিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে অগ্নিসংযোগ করা হয় বলে ধারণা করছে পুলিশ।