বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৫৪ অপরাহ্ন

গণ পরিষদ নির্বাচন ও সেকেন্ড রিপাবলিক অঙ্গীকারে জাতীয় নাগরিক পার্টি আত্মপ্রকাশ।

লেখক
রবিবার, ২ মার্চ, ২০২৫

গত ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দেওয়ার লক্ষ্যে দুটি সংগঠন—গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি—গঠিত হয়েছে। এই দুই সংগঠন একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে এবং বিভিন্ন দিক থেকে দেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কমিটি গঠন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ জাতীয় নাগরিক কমিটির শোরগোল ইতোমধ্যে বেশ আলোচনায় এসেছে, যা এই নতুন সংগঠনের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন উঠিয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে এই দল এবং তার পদ-পদবি নিয়ে চলা আলোচনা গত কয়েকদিনে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এ দুটি সংগঠনের উত্থান বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে, যা ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের সময়কালে স্পষ্ট হয়নি। ঐ সময়ে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব কোথা থেকে আসছে তা নিশ্চিত ছিল না, তবে হাসিনার পতনের পর আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন সংকট ও বিতর্কের মুখে পড়েছে, যার মধ্যে ছাত্র শিবিরের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্যরা প্রায়ই ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ ছাত্র শিবিরের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, যা একটি অস্বীকৃত সত্য ছিল না। ছাত্র শিবিরের নেতারা নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন এবং সেই কারণে তাদের ভূমিকা রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাসিনা বিরোধী আন্দোলন শুরুর পরেই ঢাকায় গণতান্ত্রিক ছাত্র অধিকার সংগঠন থেকে অনেক নেত্রী যোগ দিয়েছেন, যার মধ্যে নাহিদ ইসলাম অন্যতম, যিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন দলের গঠনের প্রচেষ্টা, বিশেষ করে ‘কিংস পার্টি’ নামে পরিচিতি পাওয়ার খবরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। গণতান্ত্রিক ছাত্র অধিকার আন্দোলনের নেত্রী নাহিদ ইসলামকে পদত্যাগ করে নতুন দল গঠনের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল, যাতে ‘কিংস পার্টি’ নামক অপবাদ ঘুচানো যায়। তবে প্রশ্ন উঠছে, নাহিদ ইসলামের পদত্যাগের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পার্টি কি ইউনূস প্রভাব মুক্ত হতে যাচ্ছে? এই প্রেক্ষাপটে, দলটির ওপর ‘কিংস পার্টি’ হওয়ার তকমা আরও দৃঢ়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির নতুন গঠন সম্পর্কে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, “নতুন দলের ‘কিংস পার্টি’ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই,” এবং তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে নতুন দল রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। তবে, তিনি এটিও উল্লেখ করেছেন যে, দেশের জাতিগতভাবে পরিবর্তন প্রয়োজন। এছাড়া, আসিফ নজরুল ও মাহফুজ আলমসহ অন্যান্য নেতারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কিনা, সেই বিষয়ে আগেই আলোচনা শুরু হয়েছে। মাহফুজ আলম ইতিমধ্যেই লক্ষ্মীপুর-১ আসনে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন এবং হবিগঞ্জ থেকে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির ভবিষ্যত
জাতীয় নাগরিক পার্টি (জানাপা) প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নকে সামনে রেখেছে। জানাপা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে।” নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে তারা গণপরিষদ নির্বাচনকে অপরিহার্য মনে করছেন।
এদিকে, ইউনুস সরকারও সংবিধান পরিবর্তনের জন্য আলী রীয়াজের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধানের প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করছে। প্রশ্ন উঠেছে, জানাপা এবং ইউনুস সরকারের সংবিধান ধারণা একে অপরের সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?
গণপরিষদ নির্বাচন: নতুন বিতর্ক?
এছাড়া, জানাপা দাবি করছে যে গণপরিষদ নির্বাচন দিয়ে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হবে, যা দেশের রাজনীতি এবং আইনগত কাঠামোকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করবে। তবে, এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারের স্থায়িত্ব কিভাবে প্রভাবিত হবে, সে বিষয়টি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি যে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে, তার সঙ্গে ফ্রান্সের ইতিহাসের প্রথম ও দ্বিতীয় রিপাবলিকের সম্পর্ক রয়েছে। ফরাসি বিপ্লবের সময় রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে প্রথম রিপাবলিক ঘোষণা করা হয়েছিল, এবং এর পরবর্তীকালে দ্বিতীয় রিপাবলিক গঠন হয়েছিল, যা মাত্র কয়েক বছর টিকে ছিল। বাংলাদেশে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ এর ধারণা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক
জাতীয় নাগরিক পার্টি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, তারা যেকোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে, জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে যুক্তদের নতুন দল গঠন নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে, কারণ তারা সাম্প্রতিককালে নিজের রাজনৈতিক চিন্তা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।
এভাবে, জাতীয় নাগরিক পার্টির ভবিষ্যত রাজনীতি এবং নির্বাচনী পথে কীভাবে এগোবে, তা নির্ভর করছে তাদের দলের কাঠামো এবং সঙ্গতিপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশলের ওপর। এখন পর্যন্ত, এই নতুন দল রাজনৈতিক বিভক্তি, সংকট এবং বিতর্কের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!