বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৩৬ অপরাহ্ন

জাতীয় পতাকা এবং সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির ডিজাইন প্রসঙ্গ- অপু সারোয়ার

অপু সারোয়ার
শনিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৫

এক

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম পতাকার নকশার কথা জানা যায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার  অভিযোগ বিৱৰণি থেকে। এই পতাকার খসড়া নকশা বা রূপ প্রকল্প তৈরী করেছিলেন পাকিস্তান সশ্রস্র বাহিনীতে কর্মরত নৌকমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন।  মোয়াজ্জেম হোসেনের পতাকার নকশাটি পাওয়া যায়নি। তবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের মামলার বিবরনের ৪৮ ও ৫০ অনুচ্ছে থেকে জানা যায় প্রস্তাবিত পতাকাটি ছিল সবুজ ও সোনালী রঙের। পতাকার খসড়া নকশা তৈরির সময়কাল ছিল ১৯৬৬। সাধারণ ভাবে সবুজ রংয়ের ধারণাটি এই ভূখণ্ডের মানুষদের মননে ঠাঁই নিয়েছে শস্য- শ্যামলিমায় ভূখণ্ডের কাব্যিক অভিব্যাক্তি থেকে। সোনালি রং হচ্ছে তকালীন সময়ের প্রধান অর্থকারী ফসল পাট। পাটের অদূরে নাম ছিল সোনালি আঁশ। আগরতলা মামলা দুইটি ধাপে হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রধান আসামি করে রাষ্ট্র দ্রোহীতার মামলা হয়েছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্র শেখ মুজিবর রহমানকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে একনম্বর আসামি করে। এই পর্যায়ে মোয়াজ্জেম হোসেন দ্বিতীয় আসামি। আগরতলা মামলা বহুল আলোচিত হলেও পতাকার ইতিহাসের কথা চাপা পড়ে গেছে।

 দুই

 বাংলাদেশের যুদ্ধ কালীন পতাকার জন্ম ৬ জুন ১৯৭০ সালে। জয়বাংলা বাহিনীর পতাকা  হিসাবে এই পতাকার জন্ম। ,৭ জুন ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কেন্দ্রিক গণআন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন তেজগাঁও এর শ্রমিক মনু মিয়া। রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে জুন মাসের গুরুত্ব ছিল এই কারণে। ৭ জুন ১৯৭০ সালে শ্রমিক লীগ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জনসভার আয়োজন করেছিল। ছাত্রলীগ মনু মিয়া শহীদ দিবস একটি গতানুগতিক ধারার বাইরে সাংগঠনিক ভাবে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই চিন্তা থেকে শেখ মুজিবর রহমানকে গার্ড অফ অনার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়েই পতকার সৃষ্টি। জয় বাংলা বাহিনী নামে ছাত্রলীগের কর্মীদের রাজনৈতিক প্লাটফর্মের ব্যানারে এই গার্ড অফ অনার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। জয় বাংলা বাহিনী একটি বেসামরিক প্রতীকী বাহিনী ছিল। পতাকা তৈরী নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়েছিল তৎকালীন ইকবাল হলে। সিদ্ধান্ত হয়েছিল সম্মিলিত ভাবে । বিভিন্ন জনের মতামতের ভিত্তিতে পতাকাটি তৈরী হয়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল অবিভক্ত ছাত্রলীগ। ঢাকা ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েক জন সংগঠক পতাকা তৈরির রসদ জোগাড়ে অংশ নিয়েছিল। পতাকায় সবুজ আয়তক্ষেত্রের মাঝে লাল বৃত্তে ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র। পতাকায় মানচিত্র জুড়ে দেওয়ার কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে যেন যুক্ত বাংলা আন্দোলন হিসাবে বিভ্রান্ত না করা যায়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে কোন গণ আন্দোলনকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করতো পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। সম্ভাব্য পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডাকে রুখে দেওয়ার জন্য আগাম সতর্কতার জন্য পতাকায় মানচিত্র দেওয়ার বিষয়টি এসেছিল।

১৯৭০ সালে জুন মাসে জয়বাংলা বাহিনীর পতাকা প্রদর্শন বা শেখ মুজিবর রহমাকে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ন সাংগঠনিক সিদ্বান্ত হলেও বিষয়টি সার্বজনীনতা পায়নি। গার্ড অফ অনারের পতাকা প্রদর্শন রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গ হলেও দাবানলের সৃষ্টি করতে পারেনি সেই মুহূর্তে। শেখ মুজিবর রহমানকে গার্ড অব অনার ও পতকা দেওয়ার বিষয়টি পত্র পত্রিকায় জনসভার সংবাদের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৭০ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহের পত্রিকা গুলোতেও জয়বাংলা বাহিনীর পতাকার বিশেষ ঘটনা হিসেবে সামনে আসতে ব্যার্থ হয়েছিল। ৭ জুন ১৯৭০ সালের জন সভার সংবাদ তৎকালীন সময়ের প্রধান দুই দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদে যথাক্রমে ৩ ও ৪ কলাম জুড়ে প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল ৮ জুন ১৯৭০ সালে । দৈনিক সংবাদে ৭ জুনের সংবাদ প্রকাশের পাশেই ” স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কুচকাওয়াজ -মুজিবের অভিবাদন গ্রহণ ” শিরোনামে পৃথক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এই স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীই জয়বাংলা বাহিনী। এর পরে আসে অখন্ড পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনী ডামাডোলে পতাকা বা জয়বাংলা বাহিনী রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

 তিন

 ১৯৭০ সালের অখন্ড পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগের সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এই ভূখণ্ডের রাজনীতি দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। ইসলামাবাদ প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ধীরে ধীরে পাকিস্তান প্রশাসনের সমান্তরাল স্বতঃস্ফূর্ত জনগণের কর্তৃত্ব গড়ে উঠে। ডিসেম্বর ১৯৭০ থেকে মার্চ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর ও শেখ মুজিবর রহমানের বিভিন্ন বক্তব্য গনমাধ্যমের প্রাধান্য পায়। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল অখন্ড পাকিস্তানের  ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের মুহূর্ত। ১ মার্চ ১৯৭১ সালে সামরিক শাসক  ইয়াহিয়া খান  জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণার করেন। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন ও সংবিধান তৈরির সকল সম্ভবনা শেষ হয়ে যায়।  ইয়াহিয়া খান ঘোষণার  খবরে রাস্তায় নেমে আসে বিক্ষুব্ধ মানুষ। সকল দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।  ২ মার্চ সমগ্র ঢাকায় এবং ৩ মার্চ দুপুর ২টা পর্যন্ত সমগ্র বাংলায় হরতাল ডাকে আওয়ামীলীগ।

২ মার্চ ১৯৭১ সালের হরতালের দিনে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশের আয়োজন করেছিল। সমাবেশে জমায়েতে প্রত্যাশার চেয়ে বহু গুন্ মানুষ হওয়ায় ছাত্র নেতৃবন্দ কলাভবনের গাড়ি বারান্দার ছাদে অবস্থান করে সমাবেশের বক্ততা করছিলেন। সমাবেশ চলাকালে ছাত্রলীগের তখনকার ঢাকা নগর শাখার সভাপতি শেখ জাহিদ হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কুড়ি-পঁচিশ জনের একটি দল পতাকা নিয়ে কলাভবন এলাকায় মিছিল নিয়ে আসেন। সেখান থেকে পতাকা নিয়ে আ স ম আব্দুর রব সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে পতাকাটি নাড়েন। এই ভাবেই জয় বাংলা বাহিনীর পতকা আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। প্রবাসী মুজিব নগর সরকার এই পতাকাকে জাতীয় পতাকা হিসাবে গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় এই পতাকা যুদ্ধ পতাকা হিসাবে ব্যাবহৃত হয়। যুদ্ধ পরবর্তীতে শিল্পী কামরুল হাসান পতাকা তৈরির সুবিধার্থে পতাকা থেকে মানচিত্র বাদ দেন। হারিয়ে যায় যুদ্ধকালীন পতাকা।

চার

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার বিতর্কে প্রান্তিক আলোচনা হচ্ছে সর্বহারা পার্টির পতাকা প্রণয়নের দাবি। এই দাবি প্রথম সামনে আসে ১৯৮০ সালে চলন্তিকা প্রকাশনী সর্বহারা পার্টির দলের অভ্যান্তরিন প্রচার পত্র সিরাজ সিকদার রচনাবলী হিসেবে প্রকাশের পর। প্রসঙ্গত ১৯৮০ সালের আগের পুস্তক আকারে সিরাজ সিকদারের রচনাবলী বা সর্বহারা পার্টির অভ্যান্তরিন দলিল দস্তাবেজ গ্রন্থিত হয়নি। সর্বহারা পার্টির রিপোর্ট , প্রচার পত্র , দলের সার্কুলার গুলোকে সিরাজ সিকদারের রচনাবলী হিসেবে বাজারজাত করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। ১৯৮০ দশকে এই কাজটি হয়েছে ব্যাক্তি পূজা ও গুরুবাদিতার জায়গা থেকে। ১৯৭২ সালে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে প্রদত্ত রিপোর্টে উল্ল্যেখ করা হয় পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন সর্বপ্রথম মুন্সিগঞ্জ, ঝালকাঠি অন্যান্য স্থানে পূর্ববাংলার বর্তমান জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। জাতীয় পতাকার নকসা শ্রমিক আন্দোলন কর্তৃক তৈরী। বাংলাদেশ পুতুল সরকার শেষ পর্যন্ত পতাকা গ্রহণ করে। সর্বহারা পার্টি অনিয়মিত প্রকাশনা স্ফুলিঙ্গ বিশেষ সংখ্যায় মে , ১৯৮১ সালে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের পতাকা রূপকার ও উত্তোলনের কথা উল্ল্যেখ করা হয়। স্ফুলিঙ্গের ভাষ্যানুযায়ী ৮ জানুয়ারি ১৯৭০ সালে পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রতিষ্টা বার্ষিকীতে বাংলাদেশের পতাকার অনুরূপ একটি পতাকা ঢাকা , মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহে এই উত্তোলিত হয়েছিল। পৃষ্ঠা ৬৪।

 পাঁচ

১৯৮৪ সালে তৎকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নুরুল আমিন এম ফিল অভিসন্দর্ভ স্ফুলিঙ্গ পত্রিকাকে উদৃতি দিয়ে পতাকা উত্তোলনের কথা লিখেছেন। নুরুল আমিনের প্রবন্ধটির নাম Marxist Politics in Bangladesh: A Case Study of the East Bengal Sarbohara Party । স্ফুলিঙ্গ গোপন দলের মুখপত্র হওয়ায় এর প্রচার খুব কম ছিল। সাধারণ ভাবে বামপন্থি দলের সাহিত্য প্রধানতঃ সেই দলের মধ্যেই সীমিত থাকে। অপরাপর রাজনৈতিক দলের সাহিত্য পড়ার মনন বাংলাদেশের বামপন্থিদের মধ্যে তেমন গড়ে উঠেনি। একই সাথে বামপন্থি সাহিত্য গুলো পক্ষপাতিত্বের বেড়াজালে আটকে থাকার অভিযোগ মুক্ত নয়। নুরুল আমিনের উল্লেখিত লেখা সহ বেশ কিছু লেখা সর্বহারা পার্টির পতাকা উত্তোলনের বিষয়কে একাডেমিক জগতে ও রাজনৈতিক মহলে পরিচিত হতে সহায়তা করে। নুরুল আমিনের লেখায় সর্বহারা পার্টির কোন নেতা কর্মী বা সমর্থকের সাক্ষাৎকারের নেওয়া হয়নি।

 ছয়

১৯৭১ সালের সর্বহারা পার্টির কংগ্রেসে পতাকা উত্তোলন নিয়ে কোন বিস্তারিত নেই। তবে মে ১৯৮০ সালে স্ফুলিঙ্গ এবং এর পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা ও সাক্ষাৎকারে বেশ আরো বিস্তারিত এসেছে। পতাকার রূপকার – ডিজাইনার হিসেবে সামিউল্লাহ আজমীর নাম উঠে এসেছে। বিভিন্ন বর্ণনায় পতাকা উত্তোলনের নতুন দুই একটি জায়গার নাম উঠে এসেছে। সর্বহারা / শ্রমিক আন্দোলনের সাথে প্রতিষ্ঠাকালীন সময় জড়িত আ কা ফজলুল হক রানার বর্ণনা ১৯৭১ সালের শ্রমিক আন্দোলনের ডিজাইন করা পতাকা বরিশালের ঝালকাঠি ও নলছিটি এবং মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে তোলা হয়েছিল এই সংক্রান্ত সংবাদ দৈনিক ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ সালে দৈনিক পূর্বদেশে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পূর্বদেশের ১০ জানুয়ারি ১৯৭১ সালে পতাকা উত্তোলনের কোন সংবাদ ছাপা হয়নি।

সাত

সর্বহারা পার্টি তাদের বিভিন্ন লেখায় পতাকা প্রণয়ন ও উত্তোলনের কথা উঠে এসেছে । তবে বিস্তারিত বর্ণনা দিতে অসমর্থ হয়েছে সকল দাবিই। পতাকার রূপকার হিসাবে সামিউল্লাহ আজমী এর নাম বহুল ভাবে আলোচিত। তবে দলের সাবেক সদস্যদের কেউ পতাকার নকশার সাথে সামিউল্লাহ আজমী ও খালেদার নাম উল্ল্যেখ করে থাকেন। Sikdar, Samiullah and Sarbahara – epilogue প্রবন্ধে রাজী আজমী শ্রমিক আন্দোলনের ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে , কোন নিদৃষ্ট এলাকার নাম উল্ল্যেখ না করে, দেশের বিভিন্ন স্থানে পতাকা উত্তোলনের কথা উল্ল্যেখ করেছেন। পতাকা উত্তোলনের সংবাদ দৈনিক পূর্বদেশের ১৪ জানুয়ারী ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হওয়ার কথা বলছেন লেখক রাজী আজমী। (২) রাজী আজমীর লেখা থেকে জানা যায় পতাকার সবুজ অংশ দিয়ে সুজলা -সুফলা গ্রাম বাংলা / কৃষক এবং লাল বৃত্ত দিয়ে বিপ্লব / শ্রমিক শ্রেণী বুঝানো হয়েছিল।দুর্ভাগ্যজনক ভাবে দৈনিক পূর্বদেশের ১৪ জানুয়ারী ১৯৭১ সালে পতাকা উত্তোলনের কোন সংবাদ নেই। প্রসঙ্গতঃ সামিউল্লাহ আজমীর সহোদর এবং শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিষ্টাতা সদস্য ছিলেন ।

আট

 ” মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ৭ই নভেম্বর অভ্যুত্থানে কর্নেল তাহের” লেখক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন সামিউল্লাহ আজমীর পতাকার নকশার কথা জানিয়েছেন – পৃষ্ঠা ১৩-১৪। আনোয়ার হোসেন একসময় শ্রমিক আন্দোলন / সর্বহারা পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। আনোয়ার হোসেনের লেখায় কোন বিস্তারিত নেই। আনোয়ার হোসেন অনেকের মত তথ্যের অভাবে সামিউল্লাহ আজমী একজন অবাঙালি ছিলেন এই বিষয়কে প্রাধান্যে এনে আলোচনাকে কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করে থাকেন।

সর্বহারা পার্টির দাবি অনুযায়ি পতাকা উত্তেলিত হয়েছিল ৮ জানুয়ারি ১৯৭১ । পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে আ কা ফজলুল হক রানা এবং রাজী আজমী সংবাদ সংগ্রেহের তারিখ সঠিক ভাবে মনে রাখতে না পাড়ার সম্ভবনা রয়েছে। কাকতালীয় ভাবে পতাকা একই রকমের হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের নাম দুটি, তাদের চরিত্র দুটি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে একাধিক শিল্পী সাহিত্যিক বিজ্ঞানী নিজ নিজ অবস্থানে থেকে একই ধরণের সৃষ্টি সম্ভব। সামিউল্লাহ আজমী ও খালেদা বুলু শ্রমিক আন্দোলনের জন্য , এই ভূখণ্ডের জন্য পতাকা তৈরির সম্ভবনাকে নাকচ করে দেওয়া অন্যায্য হবে। ১৯৭০ সালে শ্রমিক আন্দোলন অতি ক্ষুদ্ৰ ছিল। ঘরোয়া ভাবে বা প্রকশে অল্প লোক সমাগমের মাধ্যমে কোন কিছু হয়ে থাকলে তা প্রচারিত হওয়ার সম্ভবনা কম। প্রচেষ্টা যতই ছোট বা অপ্রচারিত হোক না কেন সামিউল্লাহ আজমী ও খালেদা বুলু তাঁদের প্রচেষ্টার জন্য সন্মান যোগ্য। সর্বহারা পার্টির পতাকার ডিজানের দাবি ১৯৭২ সাল থেকেই। তবে দুঃখের বিষয়, ১৯৭৫ সালের সময়কালের সর্বহারা পার্টির কোন দলিল দস্তাবেজে সামিউল্লাহ আজমীকে পতাকার ডিজাইনের জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হয়নি।

১৭ জানুয়ারি ১৯৭১ সালে পূর্বদেশ পত্রিকায় ১২ পৃষ্ঠা পত্রিকায় ” জেলার খবর ” পাতা বা অনুচ্ছেদে ‘ নতুন পতাকা’ শিরোনামে ছাপা হয় ” সম্প্রতি ১৪ই জানুয়ারী ]মুন্সীগঞ্জ শহর ও মহকুমার বিভিন্ন স্থানে সবুজের মাঝে গোলাকার লাল সূর্য’ আঁকা কয়েকটি বড় আকারের পতাকা উড়তে দেখা যায়।মুন্সীগঞ্জ শহরে প্রবেশ-তোরণ হরগঙ্গা মহাবিদ্যালয় ভবন ও শহর কমিটির নির্মীয়মান ভবনের ওপর এ পতাকা উড়তে দেখা যায়। এছাড়াও কাঠপট্টি, কমলাঘাট, তালতলা, লৌহজং, টঙ্গীবাড়ী ও বাহের-কামরাখাড়া ইউনিয়নের কমিউনিটি ভবনের ওপরেও এ পতাকা উড়তে দেখা যায় বলে এখানে প্রাপ্ত সংবাদে জান। গেছে। এ সমস্ত পতাকায় নিকটস্থ বিভিন্ন প্রাচীর পাত্রে স্বাধীন পূর্ব বাংলর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকা’ লেখা ছিল। এবং এর পাশে লেখা ছিল-পূর্ব বাংলার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকার প্রতি প্রতিটি বাঙ্গালীর সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। কে বা কার। ঝাত্রের অন্ধকারে এ পতাকা উত্তোলন করে, তা জানা যায়নি।” – দলের নাম না থাকলেও এই পতাকা উত্তোলন – দেওয়াল লিখন সর্বহারা পার্টির পতাকা উত্তোলন নিয়ে দাবি।

সর্বহারা পার্টির পতাকার উত্তোলনের যে ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তা নিছক একটি দেওয়াল লিখনের সাথে পতকা জুড়ে দেওয়া। সভা-সমাবেশ , জনগণের অংশ গ্রহণ ছিল না। জনগণের অংশ গ্রহণ ছাড়া পতাকা বা কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। সর্বহারা পার্টির উদ্দোগ শুভ হলেও এই উদ্যোগ প্রথম নয়। সর্বহারা পার্টির শুভানুধ্যায়ীদের দাবি ২রা মার্চ ১৯৭১ সালে ১৪ জানুয়ারির ১৯৭১ সালের পতাকা নকল। ছাত্রলীগ সর্বহারা পার্টির পতাকা নকল করে মাঝখানে বাংলাদেশের মানচিত্র জুড়ে দিয়েছিল ! ২রা মার্চ ১৯৭১ সালকে পৃথক ভাবে কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ঘটনা হিসেবে দেখলে সর্বহারা পার্টির দাবির গুরুত্ব বেড়ে যায়। এই ঘটনা প্রান্তিক ও জনসাধারণের অংশ গ্রহণ ছাড়া হলেও স্বাধীনতার পক্ষের যেকোন উদ্যোগ কোন না কোন ভাবে ইসলামাবাদ প্রশাসনকে পর্যুদস্ত করতে সহায়ক ছিল।

নয়

রাজী আজমী বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্টা সদস্য। তিনি দাবি করছেন শ্রমিক আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রতিষ্টা বার্ষিকীতে ৮ জানুয়ারি ১৯৭০ সালেও পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল। তবে কোথায় কিভাবে পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল, পতাকা উত্তলোনে করা অংশ নিয়েছিল সে সম্পর্কে কোন তথ্য তিনি দিতে পারেননি। শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাকালীন দুইজন মাত্র জীবিত সদস্য আকা ফজলুল হক রানা, রাজী আজমী কোন পতাকা উত্তোলনের সাথে যুক্ত থাকার দাবি করেনি। যদি কোথায় পতাকা উঠেও থাকে এর প্রচার ও প্রভাব কতটুকু ?

রাজী আজমী দ্বিতীয় প্রতিষ্টাতে পতাকা উত্তোলনের দাবি করলেও ৮ জানুয়ারি শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিষ্টা হয়নি এমন তথ্য তিনি নিজেই দিয়েছেন। ! New Age, Dhaka, 4 February 2016 পত্রিকায় প্রকাশিত আজমীর প্রবন্ধ থেকে জানা যায় ৮ জানুয়ারি ঢাকার রামপুরায় সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে একটি সংগঠনের ইশতেহারের ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ সভা হয়েছিল। এই সভায় উপস্থিতদের মধ্যে ছিল সিরাজ সিকদার , সামিউল্লাহ আজমী , আকা ফজলুল হক রানা, রাজী আজমী সহ অল্প কয়েকজন। এই সভায় কোন সংগঠনের নাম নিধারণ করা হয়নি। রাজী আজমীর ভাষ্যানুযায়ী ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন নামটিও কিছুটা পরে স্থির হয়।’ জুলাই ১৯৮৬ সালে “এশিয়ান সার্ভে” ( Asian Survey” of July 1986) জার্নালে নুরুল আমিনের লেখায় পাটকল শ্রমিকের বাসায় ৪০/৫০ জনের অংশ গ্রহণের মাধম্যে শ্রমিক আন্দোলন প্রতিষ্টার দাবিকে নাকচ করে দিয়ে রাজী আজমী বলেন ” প্রতিষ্টা সম্মেলন ” জাতীয় কিছুই হয়নি।

New Age, Bangladesh, 3 January 2016 পত্রিকায় রাজী আজমী ১৯৬৯ সালের ৮ই জানুয়ারি কেরানীগঞ্জে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম কংগ্রেসের কথা উল্ল্যেখ করেছেন।এই দিনই শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিষ্টা বার্ষিকী। কংগ্রেস গোপনে, সীমিত উৎসব মুখর পরিবেশ হয়েছিল। এই কংগ্রেসে ঘরোয়া ভাবে পতাকা উত্তোলন বা পতাকা নিয়ে কোন আলোচনার কথা উল্ল্যেখ রাজী আজমীর লেখায় নেই। আবার আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্টা সদস্য আকা ফজলুল হক রানাশু ধু ১৯৭০ সালের ৮ জানুয়ারি পতাকা উত্তোলনের কথা বলেছেন। ( লাল সন্ত্রাস পৃষ্টা ৫২)

১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাধীনতার কথা চিন্তা করেছে। স্বাধীনতার চিন্তাগুলোর লীলাভূমি ছিল কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়। যাঁরা চিন্তা করেছেন তাঁদের মত ও পথের পার্থক্য ছিল। মূল চিন্তা স্বাধীনতা ছিল। কখনো কোথায় পৃথক অবস্থানে থেকে একই বা খুব কাছাকাছি আসার সম্ভবনা রয়েছে । পতাকা তৈরির বিষয়টি এমন হবার সম্ভবনা রয়েছে। কে আগে বা পরে পতাকা তৈরী করেছে সেটাকে নকল বা আইডিয়া চুরি হিসেবে ভাবা অসমীচীন। কারণ সকল পক্ষের স্বদিচ্ছাটা একই ছিল। স্বাধীনতা।

 


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!