বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

গম, বিষ্ময়কর মানবসভ্যতা ও রাষ্ট্র  – বুলবুল তালুকদার 

বুলবুল তালুকদার 
মঙ্গলবার, ১ এপ্রিল, ২০২৫

গম, বিষ্ময়কর মানবসভ্যতা ও রাষ্ট্র
মনুষ্য জাতির প্রথম শত্রু মূলত গম। গম পৃথিবীর প্রথম খাদ্য দ্রব্য হিসেবেই প্রাগৈতিহাসিক পটে পাওয়া যায়। ইতিহাস প্রারম্ভিক হলোসিন যুগে গম প্রথমে পশ্চিম এশিয়ায় চাষ হয়েছিল বলে পাওয়া যায়। তবে পাথর যুগের মানুষের একদল মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলে গমকে খাদ্য হিসেবে খুঁজে পায়, এমন ইতিহাসও দেখা যায় এবং গমকে কেন্দ্র করেই প্রথমে সমাজ গড়ে উঠে। অনেক বড় ইতিহাস ওটা আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য নয়। এমনকি তাদের দ্বারা গমের চাষ হয়েছে বলেও ইতিহাসে মেলে। দেড় মিলিয়ন বছর পূর্বে মানুষ ছিল মূলত শিকারী জাতি (hunter-gatherer)। যেখানেই শিকার মিলতো সেখানেই গ্রুপে গ্রুপে মানুষের চলাচল ছিল। এক জায়গায় তাদের বেশি দিন থাকা হতো না। এর পিছনের উপসর্গটি ছিল খাদ্যের সন্ধান। তখনও সমাজ বলে কিছুই গড়ে উঠেনি। রাষ্ট্রতো বহুদূর।
এই গম এবং মানুষ সমাজ গড়ে উঠার কাহিনীটি “Spiens” নামক বইটি বিজ্ঞানী Yovalnoch Harari’ র লেখা। বইটি আমার পুরো পড়া হয়নি তবে এই বইটির কিছু অংশ পড়ার ছোট্ট একটি কাহিনী আছে যা বলার লোভটি সামলাতে পারছি না। ইউরোপের অষ্ট্রিয়ার লিঞ্জ শহরে কোন এক সকালে ডাক্তারের কাছে আমার যাবার কথা ছিল সকাল এগারোটার দিকে। সেদিন সকাল নয়টায় শহরে ভিন্ন একটি কাজ সেরে দেখি হাতে দুই ঘন্টা সময় রয়েছে। সময়টিকে কাজে লাগাতে শহরের প্রাণকেন্দ্র লাণ্ডস্ট্রাসের উপরে “থালিয়া” (Thalia) নামক একটি পাঁচ তলার লাইব্রেরি আছে, সেখানে যাই। ওটা মূলত লাইব্রেরি কাম সেলশোপ। কাগজ- কলম থেকে শুরু করে উপহার সামগ্রিক সহ বহুকিছুই মিলে তবে পাঁচ তলায় আছে একটি কফিশপ এবং বড় জায়গা নিয়ে একটি লাইব্রেরি। চমৎকার সব বসার জায়গা। যে কেউ ওখানে বসে সারাদিন বই পড়লেও কোন অসুবিধেই নেই। দেখতে দেখতে হাতে ওই Spiens বইটি নিয়ে (জার্মান ভাষায়) পড়েছিলাম। কখন যে দুই ঘন্টা পাড় হয়ে গিয়েছিল টের পাইনি। ওই দুই ঘন্টায় যতটুকু বইটি পড়ার হয়েছিল সেখান থেকেই কিছু অংশ স্মরণশক্তির উপর লেখা।
যা হোক, এই গম যখন থেকে মানুষের দক্ষতার উৎপাদন শুরু হলো, তখন থেকেই গমকে ঘিরে সমাজ গড়ে উঠা কেননা গম উৎপাদন করতে গিয়ে মানুষেরা একপর্যায়ে দেখলো অন্যান্য পুশু পাখীদের হাত থেকে গমকে রক্ষা করতে অনেক মানুষের প্রয়োজন হয়। উৎপাদনকৃত গমকে তুলতে, ধারণ করতে অনেক মানুষের প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই ধীরে ধীরে মানুষের সমাগম এবং সমাজ গড়ে উঠা (সংক্ষেপে)। সেই সময়ে মানুষেরা যখন বুঝতে শিখলো একত্রিত হয়ে গম উৎপাদন করে অনায়াসেই খাদ্যের যোগান হচ্ছে। পূর্বের মতন এক এলাকা থেকে ভিন্ন এলাকায় ছুটতে হচ্ছে না খাদ্যের সন্ধানে। বিষয়টি মানুষের বেশ মনঃপুত হয়ে উঠে এবং সেই গম উৎপাদনকেই কেন্দ্র করে ছন- কোটা, গাছ – গাছালির দ্বারা ঘর করে বসবাসের শুরু এবং ধীরে ধীরে বহু মানুষের সমাগম। এক সময় মধ্যপ্রাচ্যের সেই অঞ্চলে গম কেন্দ্রীয় প্রায় দুই- আড়াই হাজার মানুষের প্রথম একটি গ্রাম গড়ে উঠে।
পূর্বে কখনোই এত মানুষের একত্রিত বসবাস ছিল না। এত মানুষের একত্রিত বসবাসের কারণে শুরু হলো নানান রোগ বালাই কেননা একেকজনের ভিতরে একেক রোগের সমাহার এবং তা নিকটবর্তী বসবাসের কারণে ভাইরাসের মতন ছড়াতে থাকে। এমন এমন সব রোগ বালাই যেমন জ্বর তার মধ্য ছিল একটি। জ্বর যে কোন ভাইরাস সেটাতো কারো জানা নেই। তবে একজনের কাছ থেকে ভিন্নজনে পৌঁছায়। এভাবে সেই সময়ে নানান অজানা রোগে গ্রামে আক্রান্ত হয় আবার মৃত্যুও ঘটে। মানুষের সমাগমে মানুষের মৃত্যু দেখে এক পর্যায়ে মানুষের ধারণায় এলো অনেক সন্তান জন্মের কেননা মানুষের প্রয়োজন যে। তা না হলে গম উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং খাদ্যের অভাব হবে। এভাবেই বাড়তে থাকে মানুষের সংখ্যা তবে এত এত সন্তান জন্মের কারণে এক সময় মৃত্যুর ম্যাছাকার শুরু হয় মা ও সন্তানের। ওটাই ছিল পৃথিবীর মানুষ সৃষ্টি প্রথম মহামারী। গ্রাম সৃষ্টির পরেই মূলত মহামারী প্রথম আসে। পূর্বে এক জায়গা থেকে ভিন্ন জায়গায় মানুষেরা ছুটে বেড়াতো বলেই মানুষের ভাইরাস দ্বারা মানুষের মাঝে মহামারী হয়নি। হবার সুযোগও ছিল না কেননা একে অপরের সাথে সংযুক্ত ছিল না যে।
যা হোক এই গম উৎপাদনে প্রথম দিকে যে কয়জন জড়িত ছিল তাদের মাথায় প্রথম ভাবনা আসে কি করে আরও মানুষের মাঝে সহজলভ্য এই গমকে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের খাদ্যের বিষয়টিকে নিশ্চিত রাখা যায়। যেহেতু তারা প্রথমে জায়গা নিয়ে গম উৎপাদন করেছিল তাই তারাই সেই সব গম ক্ষেতের মালিক বনে যায়। নতুন নতুন মানুষের আগমন হতো খাদ্যের সন্ধানে তাদের দিয়ে গম ক্ষেতে কাজ করিয়ে গম উৎপাদন বেশি করে করানো হত এবং কাজের বিনিময়ে আবার গম দিয়ে কাজের মূল্যায়ন করা হতো। এই কাজের মূল্যায়ন করা এখান থেকে আজকের দিনে চাকরি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য। এই প্রচেষ্টা মূলত একপ্রকার ফেনোমেনাল wheat Paradox নামে পরিচিত। এই wheat Paradox থেকেই মানুষ এক সময় গৃহপালিত মানবসভ্যতা (domesticated Humanity) তে চলে আসে। এই মানবসভ্যতা থেকেই মানুষের চাহিদা এবং চাহিদা থেকেই ধীরে ধীরে ক্ষমতা এবং ক্ষমতা থেকেই মানুষ জীবন আজকের দিনে মানবসভ্যতায় আধুনিক সমাজ এবং আধুনিক যুগে বসবাস।
এই যে গম থেকেই মানবসভ্যতার এত দূর আসা তাহলে বলা যায় কি, মানুষ গমকে উৎপাদন করে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে? আসলে বিষয়টি পুরোটাই উল্টোরথ। মূলত এই গম নামক খাদ্যশস্যটিই মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বা বন্দি করে ফেলেছে নির্দিষ্ট জীবনে। কেননা এক সময়ে এমন কোন বন্দি জীবন ছিল না। যেখানে খুশি এবং যেভাবে খুশি চলাচল বা বসবাসের জন্য মানুষ ছুটতো তবে এমন গমকে উৎপাদন ও রক্ষার জন্য বন্দি জীবন। মূলত মনুষ্য জীবনের ট্রাজেডি এই গম থেকেই শুর।
গমের কাহিনীটি বলার কারণ আজকের বিশ্ব যেভাবে দ্রুততার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষ মানুষকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, মানুষ মানুষের পার্থক্য গড়ে উঠছে, মানুষ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে, এগুলোর উপসর্গ মূলত গম থেকেই। এই যে বিশ্ব আজকের দিনে রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং সেই রাজনীতি দ্বারাই আবার বিশ্বে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রের গঠন হচ্ছে। সেই গঠনের পিছনে আবার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে আবার অমানবিকতা। যে গম থেকেই মানবসভ্যতার আগমন আবার সেই মানবসভ্যতার ধ্বংসের পিছনেও সেই গম। সব চক্রাকারে ঘুরছে। সেই চক্র ও চক্রের ক্রিয়া দেখে ভাবাই যায় যে, কি এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর (Phenomenal) মানবজাতি। যে জাতি নিজেরাই গড়ে আবার নিজেরাই ধ্বংস করে। হোক সেটা সমাজে- সমাজে, রাষ্ট্রে- রাষ্ট্রে কিংবা বিশ্ব পরিমণ্ডলে।
বুলবুল তালুকদার 
সমসমাজ সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য 
অষ্ট্রিয়া- লিঞ্জ 


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!