বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:২৯ অপরাহ্ন

নারী সংস্কার কমিশনের ভিতরে বাহিরে – অপু সারোয়ার

অপু সারোয়ার
রবিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৫

নারীর নীতির একগুচ্ছ সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার টেবিলে উপস্থাপিত হয়েছে ১৯ এপ্রিল ২০২৫। বেশ কিছু গণমাধ্যম নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনকে ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। প্রতিবেদনে ১৫ মূল বিষয়সহ ৪৩৩টি সুপারিশ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের করণীয় গুলোকে পৃথক করা হয়েছে। সুলিখিত ও সাজানো প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে ভাল প্রস্তাবনার পাশাপাশি অস্পষ্ট ও স্ববিরোধিতা রয়েছে।

নারী বিষয়ক সংস্কার একটি মৌলিক সংস্কার। ইউনুস সরকারের অন্য সংস্কার কমিশনের তুলনায় এই প্রতিবেদন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে খুব বেশি টানা হেচড়া করেনি। সংবিধানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেছে। শুধু মাত্র ইউনুস সরকারের প্রতিবেদন সেই হিসাবে এই প্রতিবেদনকে নাকচ করা অন্যায্য হবে। ইতিমধ্যে সকল ইসলাম পন্থীরা এই রিপোর্টের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। হেফাজতে ইসলাম কমিশন বাতিলের দাবি তুলেছে। জামায়াতে ইমলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও অন্যান্য ইসলামী দলও সরাসরি মুল  সুপারিশগুলোর বিরোধিতা করছে।  ইউনুস কিংস পার্টি – এনসিপি ও বিএনপি এই রিপোর্ট সম্পর্কে মুখ খোলেনি। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে ইসলামপন্থীদের লাফালাফির উপর ভিত্তি করে এই দুই দল সিদ্ধান্ত নিবে। আওয়ামীলীগের এই সব নিয়ে ভাবার কোন অবকাশ নেই। আর যদি কখনো অবকাশ হয় তবে ইসলামপন্থীদের সামান্তরলেই হাটবে। নারী নীতির ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগ- বিএনপির কোন প্রায়োগিক পার্থক্য নেই।

বিলম্বের প্রারম্ভ

১ এপ্রিল প্রকাশিত ২০২৫ “As Bangladesh Reinvents Itself, Islamist Hard-Liners See an Opening” শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট, ইসলামী দলগুলোর সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং সরকারী নীতির দুর্বলতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশকে ইসলামী মৌলবাদের উত্থানের একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে পর ইউনুস সরকার বিশ্বকে জানাতে চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে মুসলিম উগ্রবাদীদের কোন ঠাঁই নাই। নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন মুহাম্মদ ইউনুস সরকারকে কিছুটা হলেও সুযোগ এনে দিয়ে থাকতে পারে। অন্ততঃ দেশীয় গণমাধ্যম গুলোতে এই নিয়ে কিছুটা শোরগোল মূল সমস্যা থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সহায়ক হবে।

নারী কমিশনের প্রতিবেদন বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে অর্থনীতি, রাজনীতি, স্বাস্থ্যনীতিতে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার তুলনামূলক অগ্রসর ,অতি আশাবাদী রূপরেখা। প্রফেসর ইউনূসের চোখ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দিকে। এই আশাবাদ থেকে ,মুহাম্মদ ইউনুস বলেন, ” যে সব সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন যোগ্য, সেগুলো যেন আমাদের মাধ্যমে হয়ে যায়। আমরা যেন এ কাজের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারি। পৃথিবীর মেয়েরা এটির দিকে তাকিয়ে আছে। তারা এটি নিয়ে পর্যালোচনা করবে অনুপ্রাণিত হবে। অন্য দেশের নারীরাও এটি নিয়ে আগ্রহী।” ()

মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য অসত্য ও ফাঁকা বুলি। ‘ পৃথিবীর মেয়েরা’ এই রিপোর্টের বাস্তবায়নের দিকে তাকিয়ে নেই। ইউরোপ- আমেরিকা – অস্ট্রেলিয়ার দেশ গুলো যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থা চালু রয়েছে। সেই দেশ গুলোতে এই প্রতিবেদনের সব কিছু নিদেন পক্ষে একশ বছর আগে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাংলাদেশে এই জাতীয় প্রতিবেদন হওয়াটা আশাব্যাঞ্জক। যেকোন পরিবর্তন বাংলাদেশ চৌহদ্দিতেই প্রভাব ফেলতে পারে। মুহাম্মদ ইউনূস এই প্রতিবেদন উল্লেখিত ‘  অন্তর্বর্তী সরকার’ আমলে বাস্তবায়িত সম্ভব পদক্ষেপ গুলো বাস্তবায়ন করবেন ? মুহাম্মদ ইউনূস দায়সাড়া গোছের উত্তর জনমানসে আস্থা যোগাতে পারবে না। ১৯ এপ্রিল ২০২৫ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হলেও , প্রশাসনিক নিয়মে এই রিপোর্ট সরকারের কাছে আগে পৌঁছার রেওয়াজ। ইউনুস সরকার যদি বাস্তবায়নের কোন ইচ্ছে থাকতো তবে একটি সময় সীমা বেঁধে দিতে পারতো। এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের আমলে , জাতীয় নির্বাচনের আগে কি কি পরিবর্তন সম্ভব তা খোলাখুলি ভাবে দেখিয়ে দেওয়া। এই রিপোর্টের কোন অংশই অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভবনা নেই। সংস্কারের জিকির জাগিয়ে রাখার জন্য বাস্তবায়নের বিলম্ব ইউনুস সরকারের পাথেয়।

শুরুতেই সংশয়

নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক । তিনি নিজেও প্রস্তাবিত ৫০% কম বাস্তবায়িত হওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান। তিনি বলেন, ” আমরা মনে করি, ৪৩৩টি সুপারিশের মধ্যে ২০০টিও যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অনেক এগিয়ে যাব।” () শুরু থেকেই শিরিন পারভীন হক অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না করার বিষয়ে সজাগ ছিলেন। () নারী বিষয়ক সংস্কার প্রতিবেদন বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে আশান্বিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে। এই প্রতিবেদনকে অপরাপর ইউনুস সরকারের অন্য সংস্কার প্রস্তাব গুলোর সাথে মিলিয়ে পড়তে হবে। শিরিন পারভীন হক গণমাধমকে বলেছেন ” আমরা ইহজাগতিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র দেখতে চাই। আমরা অসাম্প্রদায়িক সমাজ চাই। আমরা যতদূর সম্ভব শ্রেণি বৈষম্য ও শ্রেণি পার্থক্য দূর করতে চাই।” (৪) এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ”  রাষ্ট্র হবে ইহজাগতিক এবং মানবিক ” । (৫)

শ্রেণি বৈষম্য ও শ্রেণি পার্থক্য দূর করার শিরিন পারভীন হকের গুরুগম্ভীর বয়ান এই আলোচনা থেকে বাদ রাখা যায়। শিরিন হক নারী পক্ষ এনজিওর অন্যতম প্রতিষ্টাতা সদস্যা। বাংলাদেশের সকল এনজিও দেশের মানুষের দুঃখ- দুর্দশা কে বিদেশের কাছে বেচাকেনা করে ফান্ড এনে চলে। এদিক সেদিক কিছু সংস্কার মূলক কাজ করে। আয়কর না দিয়ে ক্ষুদ্রঋণ ও অন্য বাবসা আসছেন। এমন মানুষদের কাছে শ্রেণী বৈষম্যের আলোচনা অতি বেমানান। গুলশানে ধান চাষের চেষ্টার মত ! শিরিন হক এই সংস্কারের অংশ হিসেবে ইহজাগতিক, মানবিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র দেখতে আগ্রহী। আলী রিয়াজের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিটি সংবিধান থেকে ধর্ম নিরেপেক্ষতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। একই সাথে ‘ রাষ্ট্র ধর্ম ‘ ইসলাম রেখে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। কাগজে কলমে যেটুকু ‘ ধর্ম নিরেপেক্ষতা ‘ আছে সেটুকু তুলে দেওয়ার প্রস্তাব ও বাস্তবায়ন নারী কমিশনের সদস্যদের ‘ ইহজাগতিক রাষ্ট্র ‘ আকাঙ্খাকে ধুলায় মিলিয়ে দিয়েছে । রাষ্ট্রের কোনো ধর্মীয় পরিচয় থাকার যৌক্তিকতা নেই । রাষ্ট্র একটি নিরপেক্ষ সত্ত্বা তার আইন ও ব্যবস্থাকেও নিরপেক্ষ হতে হবে। ইহজাগতিক এবং মানবিক রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র ধর্মের বিলুপ্তি। শিরিন হকেরা কি আলী রিয়াজের ধর্মনিরেপেক্ষতা  নীতি বাতিল এবং রাষ্ট্র ধর্ম টিকিয়ে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলতে আগ্রহী ?

১০০ না ৩০০?

এই প্রতিবেদনে সংসদীয় আসন বাড়িয়ে ৬০০ করা এবং সেই আসন থেকে ৩০০ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে । ৫০% সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব একটি জলাতঙ্ক রোগ বিশেষ । .এই রোগের নাম ‘ নিবার্চন আতংক ‘ । পৃথিবীর কোন দেশেই ৫০% সংরক্ষিত আসনের নজির নেই। ৩০০ সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের জন্য ৪ কিংবা ৫ বছর মেয়াদি সংসদের অর্থিক খরচের বিষয়টি এই কমিশন প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছেন। সংরক্ষিত সংসদ সদস্যের জন্য সম্মিলিত ব্যায় দিয়ে নারীর শিক্ষা চিকিৎসায় ব্যায় করে স্বাবলম্বী ও ভবিষ্যৎ নির্বাচন বা প্রসাশন জায়গা করে নেওয়ার জন্য কোন বিকল্প ভাবনা এই প্রস্তাবে স্থান পায়নি।

বর্তমানে দেশের সংসদে নারীর জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত । রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে নারী আসনগুলো বণ্টন করা হয়। প্রধানতঃ রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী -কন্যা বা আশীর্বাদপুষ্টরা এগুলোয় মনোনীত হন। অনেক ক্ষেত্রে মনোনয়ন পেতে মোটা অংকের অর্থের লেনদেননের গুজব রয়েছে । বর্তমান ব্যাবস্থায় জাতীয় সংসদে নারীদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত নয় । দেশে নিয়মিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা না থাকায় সংরক্ষিত আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের দাবি গৌণ হয়ে গিয়েছিল। সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংরক্ষিত নারী আসন ১০০টিতে উন্নীত করে সেখানে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করছে। (৬) নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন ১৭ এচপ্রল ২০২৫ পর্যন্ত ৪৩টি পরামর্শ সভা করেছেন। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন অন্যান্য সংস্কার কমিশনের সাথে ৮টি সভা করেছেন। এই বৈঠকে নির্বাচন ব্যাবস্থা সংস্কার কমিশন ছিল। (৭) নির্বাচন কমিশনের সাথে কি আলোচনা হয়েছে তার ছিটেফোঁটার উল্ল্যেখ নেই এই রিপোর্টে। নারী কমিশন ও নিবার্চন কমিশনের সংরক্ষিত নারী আসনের আকাশ – পাতাল পার্থক্য মিলবে বা সমাধান কি তা স্পষ্ট নয়। নারী সংস্কার কমিশনের ৩০০ সরক্ষিত আসনের নিবার্চনের প্রস্তাব এবং সংবিধান ও নিবার্চন কমিশনের ১০০ সরক্ষিত আসন প্রস্তাব কোনটি ইউনুস সরকার গ্রহণ করবে ? এই গুলো হচ্ছে সংস্কারের নামে কালক্ষেপন।

ঐচ্ছিক ‘  আইন

নারী কমিশন বিদ্যমান উত্তরাধিকার আইন সংস্কার করে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান উত্তরাধিকার করার সুপারিশ করেছে। অভিন্ন পারিবারিক আইনের মাধ্যমে সব ধর্মের নারীদের জন্য বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার ও ভরণপোষণে সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য অধ্যাদেশ জারি করার সুপারিশ করেছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন। অন্তত আইনটি তৈরিতে এখনই উদ্যোগ নিতে সব সম্প্রদায়ের জন্য ঐচ্ছিকভাবে তা প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে। ‘ ঐচ্ছিক ‘ অর্থ হচ্ছে প্রস্তাবিত সমতা ভিত্তিক আইন মানার কোন বাধ্যবাধকতা। নারী সংস্কার কমিশন একইসাথে ধর্মীয় বিধানকে বলবৎ রাখার পক্ষে। আবার একই সাথে সেক্যুলার বিধানও প্রবর্তন করার পক্ষে সুপারিশ করেছে। কেউ চাইলে ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী ভাগ নিবে আবার না চাইলে সেক্যুলার বিধান অনুযায়ী সমান ভাগ নিতে পারবে। অভিন্ন পারিবারিক আইন একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রসর পদক্ষেপ। কিন্তু এই আইন ঐচ্ছিকভাবে প্রয়োগের সুযোগ সমান  সমান উত্তরাধিকারের সম্ভবনাকে নাকচ করে দেয়। শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ  এই  আইনের ঐচ্ছিক প্রয়োগ বলবৎ রাখার সকল চেষ্টা চালিয়ে যাবে। একই সাথে কোন নিদৃষ্ট বিষয়ে শুধু মাত্র একটি আইনের  থাকা সম্ভব। উত্তরাধিকার বন্টনের সাথে একাধিক পক্ষ জড়িত। কোন একপক্ষ যদি পুরানো আইনে ভাগ-বাঁটোয়া করতে চায় আর অন্য পক্ষ যদি প্রস্তাবিত  সমান উত্তরাধিকার আইনে ভাগ-বাঁটোয়া করতে চায় তবে বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যাবে। ইউনূসের সংস্কার কমিশনের প্রকাশিত রিপোর্ট গুলোর মধ্যে নারী কমিশনের রিপোর্ট অগ্রসর রূপরেখা। একটি স্বাপ্নিক সংস্কার প্রস্তাবনা। এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ইসলামপন্থিরা সরব প্রথম দিন থেকেই।

মহিলা বনাম নারী

এই প্রতিবেদনে ছোট খাটো কিছু বিষয়ে অহেতুক বিতর্ক টেনে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রতিবেদনের ৩৫ পৃষ্ঠায় ৩.২.১.১.৩ মহিলার পরিবর্তে সকল ক্ষেত্রে নারী শব্দ ব্যবহার করতে হবে। বাংলা ভাষায় মহিলা কোন ভাবেই অবজ্ঞা বা অপমান জনক শব্দ নয়। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ গ্রন্থে খুব একটা পার্থক্য দেখা যায় না এ দুটির শব্দের।  ‘মহিলা’ শব্দের অর্থ – সম্ভ্রান্ত নারী, যে কোনো নারী বা স্ত্রীলোক। অন্যদিকে ‘নারী’ শব্দের অর্থ স্ত্রীলোক, রমণী, মহিলা। ভাষা পরিবর্তনশীল। মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কোন শব্দ গ্রহণ বা বর্জন করা যেতেই পারে। তবে যে কোন পরিবর্তনকে জনগণের অংশ গ্রহণ মূলক করার জন্য পযাপ্ত কারণ ও ব্যাখ্যা আবশ্যক। নারী কমিশন এই প্রতিবেদনের অনুপ্রেরণার উৎস উল্ল্যেখ করেছেন  “নারী আন্দোলনের তৎপরতা ও দাবিনামা বিশেষত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও নারীপক্ষর দাবিনামা কমিশনের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।” (৮)

১৯৭০ সালের ৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্বপাকিস্তান মহিলা পরিষদ। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় পাকিস্তানে সৃষ্ট মহিলা সংগ্রাম পরিষদ রূপান্তরিত হয় ‘পূর্বপাকিস্তান মহিলা পরিষদ’ নামে । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ সংগঠনের পরিবর্তিত নাম হয় ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’।মহিলা পরিষদের ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি -সিপিবি এর ‘সহযোগী ‘ সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৯১ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মহিলা পরিষদ রাজনৈতিক সংগঠন থেকে এনজিওতে রূপান্তরিত করে। রক্ত- ঘামে গড়ে উঠা মহিলা পরিষদের রাজনৈতিক সংগঠন থেকে এনজিওতে রূপান্তর সারা দেশে মহিলা পরিষদের নেতা- কর্মীদের শ্রম- ঘামের সাথে কেন্দ্রে বসে থাকা নেতৃবৃন্দের বিশ্বাস ঘাতকতার ইতিহাস। মহিলা পরিষদ এর সংগ্রামের ইতিহাস পাঁচ দশকের বেশি। নারীর অধিকার আন্দোলনে সব সময়ই সক্রিয়। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর কি মহিলা পরিষদের নাম পাল্টানোর প্রয়োজন হবে কি ?

জাতীয় মহিলা সংস্থা একটি সরকারি প্রতিষ্টান। ১৯৭২ সালে এই প্রতিষ্টানের সূচনা হয়েছিল ‘নারী পুণর্বাসন বোর্ড’   নামে।  ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদের অধ্যাদেশের  মাধ্যমে এই বোর্ডকে বৃহত্তর কলেবরে পুণর্গঠন করে ‘নারী পুর্ণবাসন কল্যাণ ফাউন্ডেশন’-এ উন্নীত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ‘নারী পুর্ণবাসন কল্যাণ ফাউন্ডেশন’কে  ‘জাতীয় মহিলা সংস্থা’ নামে সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপদান করা হয়। ‘নারী পুণর্বাসন বোর্ড’ কে   ‘জাতীয় মহিলা সংস্থা’ রূপান্তর করার নারীকে অবমাননা বা অবদমনের কিছু ছিল না। যেকোন অহেতুক বিতর্ক প্রয়োজনীয় কাজকে পিছনে টেনে ধরে। প্রসঙ্গতঃ নারী – মহিলা / male- female শব্দের ব্যাবহার নিয়ে একাডেমিক পর্যায়ে অমীমাংসিত বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা রয়েছে।

সংহতি কথা

এই প্রতিবেদনের ভাল মন্দ উভয় নিয়ে আলোচনা দরকার। এই নারীর অধিকার আদায়ের জন্য এই প্রতিবেদন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেব একটি ভাল কাজ।  এই প্রতিবেদনের বেশ কিছু আইন- আদালত – স্বাস্থ্য- পরিবেশ  খাতের বিভিন্ন সংস্কারের প্রসঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে। এই সংস্কার গুলো বাস্তবায়িত হলে নারী-পুরুষ নিবিশেষে দেশের সকল নাগরিক উপকৃত হবে। এই প্রতিবেদনে নারী সংস্কারের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক নয় এমন বিষয় আলোচনা হয়েছে। যেমন প্রতিবেদনের ৩৫ পৃষ্টায় ৩.২.১.১.৩   সংবিধান সংক্রান্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন সংশোধনী অনুচ্ছেদে সংবিধানের ৭০  অনুচ্ছেদ বাতিলের কথা বলা হয়েছে। ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের  হচ্ছে ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল করার পক্ষের মানুষদের প্রিয় আলোচনা। সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রধান আলী রীয়াজের অতি প্রিয় আলোচনা।  নারীর অধিকার আলোচনার সাথে সংবিধানের ৭০  অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবির কোন সরাসরি যোগাযোগ নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা নিয়েও বেশ কয়েক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান দুই সমস্যা নিয়ে কমিশন নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নীরব থাকার মধ্যে দিয়ে উৎপাদন  বিচ্ছিন্ন সেনাবাহিনী ও সমতলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অভিবাসনকে মৌন সমর্থন দেওয়া হয়েছে। দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিল , ফিলিস্তানি সমস্যা , রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে অশ্রু ঝরাতে অভস্থ্য। কিন্তু নিজেদের সৃষ্ট ফিলিস্তান – পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কথা বলতে অনীহা।

নারী সংস্কার প্রতিবেদনে হাসিনা শেখের পতন ও পলায়ন পরবর্তীতে সারা দেশে নারীর পতি যে সহিংসতা ঘটে চলছে সেই ব্যাপারে নারী সংস্কার কমিশন কোন কথা বলেননি। গত ৭/৮ মাসের নারীর প্রতি সহিংসতার খবর দেশে বিদেশে বহুল ভাবে প্রচারিত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের দোহাই দিয়ে বেগম রোকেয়ার প্রতিকৃতিতে  কালি দেওয়া হয়েছে (৯)  রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের মাতম (১০) নবাব ফয়জুন্নেছা  প্রতিকৃতিতে  কালি  এসব বিষয় নিয়ে নারী সংস্কার কমিশন ক্ষমতার জলসায় কমিশন নীরব। বর্তমানের সমস্যাকে মোকাবেলা না করে কি ভাবে ভবিষ্যতে পৌঁছানো সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

নারী সংস্কার কমিশনের পুরো প্রতিবেদনে শিক্ষা – দীক্ষা- চাকুরী – রাজনীতিতে সনে নিয়ে আসার জন্য সঠিক ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপের  কথা উল্ল্যেখ  করা হয়েছে।  কিন্তু দুৰ্ভাগ্যজনক ভাবে ইউনুস সরকারের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫ যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা বাতিল করেছে। (১২) উল্লেখ্য, সংরক্ষিত নারী কোঠায় প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষা দিতে হয়।   ২০১৯-এ সহকারী শিক্ষক পদে ৬০ শতাংশ নারী কোটা সংরক্ষিত নারী কোঠা ছিল। নারী সংস্কার কমিশন বা ব্যাক্তিগত ভাবে কোন সদস্য প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী সংরক্ষিত আসন বাতিলের সরকারি এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেননি। এবং এই সম্পর্কিত  কোন আলোচনা এই প্রতিবেদনে স্থান পায়নি।

প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কোন অংশ কখনো তুলনামূলক ভাল কিছু উপস্থাপন করতে পারে। শিরিন হক পারভীনদের প্রতিবেদন সেই ধাঁচের মত। আজকে প্রচলিত  মুসলিম আইন ১৯৬১ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সংশোধন করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে সকল রাজনৈতিক দল আইয়ুবের এই সংস্কারের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আইয়ুব খান স্বৈরশাসক হলেও মুসলিম আইনের সংশোধন ছিল অগ্রগামী পদক্ষেপ। ইউনুস সরকার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী নানান অবস্থান নিয়েছে। তারপরেও নারী সংস্কার প্রতিবেদনে ভাল কিছু রয়েছে। এই প্রতিবেদন বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলার মধ্যে দিয়ে ইউনুস সরকার সংস্কারের জন্য কতটুকু আন্তরিক তা সামনে নিয়ে আসা একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

সহায়ক তথ্য সূত্র :

১. বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকারে সমান অধিকারের সুপারিশ। ১৯ এপ্রিল ২০২৫। সমকাল।

(২) পূর্বোক্ত

(৩) অন্তর্বর্তী সরকারে নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা যায়নি : নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান। ২৮ফেব্রুয়ারী ২০২৫। প্রথম আলো।

(৪) বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকারে সমান অধিকারের সুপারিশ। ১৯ এপ্রিল ২০২৫। সমকাল।

(৫) পৃষ্ঠা ৪৬। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন। ১৯ এপ্রিল ২০২৫।

(৬) রাষ্ট্রপতি, নারী আসনে নির্বাচন নিয়ে অভিন্ন সুপারিশ তৈরি হচ্ছে। ২৩ জানুয়ারি ২০২৫। প্রথম আলো। এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫।

(৭) নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন। পৃষ্টা ২১।

(৮) পূর্বোক্ত পৃষ্ঠা ২২।

(৯) বেগম রোকেয়াকে কি প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করানো হচ্ছে? ২২ নভেম্বর ২০২৪। বিবিসি নিউজ বাংলা।

(১০) রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের দাবি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। প্রথম আলো।  এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের দাবিতে সংবাদ  সম্মেলন। ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। প্রথম আলো।

(১১) কুমিল্লায় অবশেষে মোছা হলো ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর প্রতিকৃতিতে দেওয়া কালি। ১১ ডিসেম্বর ২০২৪। প্রথম আলো।

(১২) প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের নতুন বিধিমালায় থাকছে না নারী ও পোষ্য কোটা। ১১ এপ্রিল ২০২৫। প্রথম আলো।

 


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!