বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৫৬ অপরাহ্ন

পদত্যাগ নাটক ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইউনুসীয় বিবৃতি – – যমুনা রহমান

যমুনা রহমান
রবিবার, ২৫ মে, ২০২৫

এক

দেশে রাজনৈতিক ভাবনা বা বিনোদনের কোন কালেই কমতি ছিল না। গত বৃহস্পতিবার , ২২ মে ইউনূসের পদত্যাগের সম্ভবনার খবর রটিয়ে দেওয়ার পর থেকে ছোট – বড় নানান রাজনৈতিক বিনোদন মঞ্চস্থ হচ্ছে। পদত্যাগের রটনা মার্চ ফর ইউনুস কর্মসূচি , জামায়েত, – হেফাজত- বিএনপি- এনসিপি সহ বিভিন্ন শক্তিকে ইউনূসের পিছনে আবারো সমবেত করেছে। পদত্যাগ রটনায় এই হচ্ছে মূল যোগফল। বাংলার নাটক আর রাজনীতি বড়ই উপভোগ্য। জামায়েত ও এনসিপি সবচেয়ে বেশি তৎপর হয়েছে ঘটনা সামাল। দিতে। ইউনুসকে টিকিয়ে রাখা জামায়েত – এনসিপির ১৯৭১ সালের রাংলাদেশ রাষ্ট্রেরঅভ্যূদ্বয় বিরোধী রাজনীতির অংশ। তবে কিছু বামপন্থী বুদ্ধিজীবীও ইউনুস রক্ষা স্রোতে গা ভাসিয়েছেন। মুহাম্মদ ইউনূসকে বাঁচাও কোরাসে সামিল হয়েছেন আনু মুহাম্মদ। কাকতলীয় ভাবে দুই জনই অর্থনীতির প্রাক্তন শিক্ষক।

আনু মুহাম্মদের ইউনুস বাঁচাও ক্রন্দন সর্বনাশী ও বামপন্থী প্রেক্ষাপট থেকে বিভ্রান্তকারী। ” অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মতাদর্শিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়ন করা বলে মনে করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।” [ প্রথম আলো , ২৩ মে ২০২৫ ] । হাসিনা বিরোধী জুলাই আন্দোলন কিংবা ইউনুস সরকার কোন ভাবেই বৈষম্য বিরোধী সমাজ চায় না। যদিও জুলাই- অগাস্ট ২৪ আন্দোলনের সময় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন নাম নিয়ে ছিল। সেই আন্দোলনের সময় সকলের কাছে স্পষ্ট ছিল চাকুরীতে কোটা বাতিল হচ্ছে ‘ বৈষম্য বিরোধী ‘ আন্দোলনের লক্ষ্য। একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে মানুষের কাছে ইউনূসের চিন্তা ও শ্রেণী চরিত্র আড়াল করতে ইউনূসের পিছে দাঁড়িয়েছেন আনু মুহাম্মদ। হাসিনার যেমন ছিলো চেতনা, ইউনুস – এনসিপির হচ্ছে “সংস্কার”, দুটোই হচ্ছে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার কৌশল। ইউনূসের পদত্যাগের রটনার ব্লাকমেইলে সাড়া দিলেন আনু মুহাম্মদ।

দুই

পদত্যাগের নাটক জমে উঠার পরে ইউনুস উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতিতে জানিয়েছে ” সরকার সব কারণ জনসমক্ষে উত্থাপন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সরকারের স্বকীয়তা, সংস্কার উদ্যোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, সুষ্ঠু নির্বাচন ও স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কর্মকাণ্ড অর্পিত দায়িত্ব পালন করাকে অসম্ভব করে তুললে সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।” এই বিবৃতি আরেক ধরণের রাজনৈতিক ব্ল্যাক মেইল। ইউনূসের সংস্কার নিয়ে বিএনপি সহ অপরাপর দল গুলোর বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত। এর বাইরে গোপনীয়তা খুব বেশি কিছু নেই। গোপনীয়তা যা রয়েছে তা আরাকান আর্মিকে করিডোর দেওয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত অরক্ষিত রাখা – হাত ছাড়া হওয়া , পার্বত্য চট্টগ্রাম বন্দর লিজ দেওয়া , সর্বপোরি ভারতের সেভেন সিস্টার নিয়ে পরিকল্পনা। ইউনূসের এই বক্তব্য নতুন কিছু নয় , পদত্যাগ রটনার পরের দিন ২৩ মে বণিক বার্তায় আলী রীয়াজ একই জাতীয় কথা বলেছেন ” ঐক্যমত না হলে জনগণকে সব জানিয়ে যাব। ” জনস্বার্থের সবকিছু জনগণকে জানানোই যেখানে কর্তব্য। এখন পর্যন্ত জনগণকে না জানিয়ে তল্পি গুটানোর সময় বলার কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। আলী রীয়াজের এই হুমকি অনৈতিক ও ব্ল্যাক মেইল। ইউনুস – রীয়াজরা বুঝতে পেরেছেন জনগণ তাদের সাথে নেই। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহাই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ।

তিন

শেখ হাসিনার শাসন চরম নির্যাতন মূলক ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসন ছিল। শেখ হাসিনার এই দুই মহান অপকর্ম নিয়ে বিতর্কের তেমন কোন অবকাশ নেই। তবে শেখ হাসিনা এর পরিষদ বর্গকে দোষী প্রমাণিত করতে হরে দরে যে মামলা দেওয়া হচ্ছে , সেই প্রক্রিয়া ও বিচারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে বিশ্বাস যোগ্যতা পাওয়ার সম্ভবনা নেই। দেশে মবরাজের দাঙ্গা-হাঙ্গামা , আদালতে ডিম ছোড়া , সরকারি উকিলদের অশালীন প্রশ্ন এবং গণ মাধ্যমের পক্ষপাত মূলক প্রচারণা নতুন ইতিহাসকে দুদন্ডের শান্তি দিতে পাড়ে ! তবে স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া ইউনুস আমলে সম্ভব নয়। এই সত্য অগাস্ট ২৪ থেকে মে ২৫ বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া পক্ষগনের মধ্যে মতাদর্শিক প্রধান ঐক্য ছিল হাসিনার বিদায়। হাসিনার বিদায়ের সাথে থাকে এই ঐক্যের বড় ফাটল ধরেনি আওয়ামীলীগ ফিরে আসার জুজুর ভয়। এই ভীতি থেকে বিএনপি ইউনুস ও জামায়েত ও ইসলামপন্থীদের সহযোগী হয়েছে। ইউনুস সরকার – জামায়েত – বিএনপি – হেফাজতের ঐক্যের আরেক শক্তি হচ্ছে অন্ধ ভারত বিরোধিতা। মুহম্মদ ইউনুস ব্যাক্তিগত ভাবে ভারতের সেভেন সিস্টারকে নিয়ে বিভিন্ন কথা বলছে। মাস্টারমাইন্ড সেভেন সিস্টার দখলের হুমকি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল। হাসিনার বিদায়ের সাথে সাথে মূল লক্ষ্যের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। অন্ধ ভারত বিরোধিতার নিয়ে বিএনপি – জামায়েত- হেফাজতের প্রকাশ্য ঐক্যমত হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই। তবে জামায়েত- হেফাজতের অন্ধ ভারত বিরোধিতা ও ধর্মীয় রাজনীতির জিকির বিএনপির রাজনীতিকে জাগিয়ে রাখবে। এই সব কারণে হাসিনা পতনের আন্দোলনের মত কোন সামগ্রিক ঐক্য সম্ভব না। তবে জামায়েত- হেফাজত-ও এনসিপির রাজনীতিতে কাছাকাছি থাকবে।

জুলাই অভ্যুত্থানরে স্প্রীট বাঁচাও , জুলাই ঘোষণা এই জাতীয় স্লোগান দিয়ে ব্যাপক হারে গণ জমায়েত সম্ভব হয়ে উঠছে না। গত কয়েক মাসের গণ জমায়েতের লোক সমাবেশের মূল ছিল শুক্রবারের জুম্মার নামাজের জমায়েতকে বিভিন্ন ভাবে রাস্তায় নামাতে সমর্থ হওয়ার। এই সমর্থনের পিছেনে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের গলাগলি ছিল। এই কারণে মাজার ভাঙবো, নারীদের বেশ্যা / মাগি বলে গালি দেওয়া নারী নির্যাতকদের থানা থেকে ছাড়িয়ে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা, সিপিবি অফিসে হামলা , সম্ভব হয়েছিল। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক – স্মৃতি ভাঙা , শেখ মুজিবর রহমানের বাড়ি ভাঙা সব কিছুই হয়েছে উত্তর পাড়া আর যুমনার গলাগলির মধ্যে দিয়ে। এই সবের বিরুদ্ধে যে কোন ধরনের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে আওয়ামী লীগের দোসর , ভারতের দালাল, পরাজিত শক্তির ইন্ধন এবং বিদেশি ষড়যন্ত্র, বামপন্থীদের বনসাই তকমা দেওয়ার ঢোল মাদল বেজেই চলছে।

চার

ইউনুস সরকার সংস্কার, শেখ হাসিনা – আওয়ামীলীগের বিচার ও নির্বাচনের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল ৮ অগাস্ট ২০২৪। ৫ থেকে ৮ অগাস্ট পর্যন্ত দেশে কোন ঘোষিত সরকার ছিল না। সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের ছিল সব কিছু। গত ৯/১০ মাসে রাজনৈতিক যাত্রাপালায় অনেক কিছু হয়েছে। তবে ইতিবাচক তেমন কিছু হয়নি বা হতে পারেনি। অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো সহজ। এই কাজটি বেছে নিয়ে পদত্যাগের রটনা ছড়িয়ে ইউনুস সরকার ঘর গুছানোর চেষ্টা করছে। যাত্রা পালার নতুন সংযোজন শনিবার ২৪ মে এর উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতি। এই বিবৃতিতে নতুন কিছু নেই। সংস্কার, বিচার, ও নির্বাচন নিয়ে কোন কথা নেই এই বিবৃতেতে। এই বিবৃতি হচ্ছে আরেকটি রাজনৈতিক ব্ল্যাক মেইল। বিবৃতিতে ইউনুস সরকার বলেছেন ” দায়িত্ব পালন অসম্ভব করা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত ” । একটি অনির্বাচিত সরকার জনগণকে সাথে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা হচ্ছে এই মাসের সবচেয়ে বড় মস্করা। ইউনূসের সাথে কোন জনগণ নেই, হাসিনা বিরোধী গণআন্দোলনের সাথে হাসিনার কোন যোগাযোগ নেই , হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই ইউনুস ঢাকা ছেড়ে প্যারিসে গিয়েছিলেন। সংস্কার ও রাজনীতি নিয়ে কোন কিছু গোপন নেই। ইউনূসের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে প্রকাশ্যে মতামত দিচ্ছে সকলেই। অজানা কিছু নেই। স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে এখন পর্যন্ত যা বলা সম্ভব হয়নি তা তল্পিতল্পা গুটিয়ে উড়ান কালে বললে কোন প্রকার বিশ্বাস যোগ্যতা পাবে না – এই তেতো কথাটি ইউনুস- আলী রীয়াজ বেমালুম ভুলে গেছেন।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!