কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করলে আসলে লাভ হয় কার—এই প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে ১৫ নভেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলনকে ঘিরে। বিপুল জনসমাগমের এই প্রদর্শন মূলত ধর্মীয় রাজনীতিকে আবারো কেন্দ্রভাগে নিয়ে এসেছে। দাবি তোলা হয়েছে আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার। ইস্যুটি কিন্তু নতুন নয়; পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এটি বারবার ফিরে আসা এক পুরোনো ক্ষত। বাংলাদেশেও জেনারেল এরশাদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রশ্নটি ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
১৯৮০–এর দশকে এরশাদের শাসনামলে ঢাকার ভেতরে-বাইরে আহমদিয়া-কাদিয়ানী মসজিদে হামলা একাধিকবার সংঘটিত হয়—এগুলো ছিল সামরিক শাসনের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোর সচেতন প্রচেষ্টা। পরে হেফাজতের ১৩ দফায়ও কাদিয়ানী ইস্যুটি স্থান পায়। পঞ্চগড়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আহমদিয়া গ্রামে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে—যদিও তাদের সঙ্গে ওই রাজনৈতিক ঘটনার কোনো সম্পর্কই ছিল না। শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদি হেফাজত তোষণ, ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রবণতা এসব সহিংসতাকে আরও প্রশ্রয় দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৩ সালে পঞ্চগড়ে যে ভয়াবহ হামলার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে।
এ অবস্থায় বিএনপির সালাউদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছেন—তারা ক্ষমতায় গেলে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনর্বহাল করা হবে এবং আহমদিয়া সম্প্রদায় বিষয়ে আলেমদের দাবিই বিবেচনায় নেওয়া হবে। একই মঞ্চে পাকিস্তানের মাওলানা ফজলুর রহমানও ধর্মীয় উত্তেজনা উসকে দেওয়া বক্তব্য রেখেছেন। এতে স্পষ্ট, কাদিয়ানী প্রশ্নটি এখন আর ধর্মতত্ত্ব নয়—এটি হয়ে উঠেছে সরল, স্পষ্ট রাজনৈতিক খেলা।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বলছে, এই ইস্যু মূলত লাভবান করে দুটি পক্ষকে—ধর্মীয় মৌলবাদী দলগুলোকে এবং সংকটে থাকা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে। পাকিস্তানের ইতিহাস সেই শিক্ষাই দেয়। পাকিস্তানের সৃষ্টির বিরোধিতা করা জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবুল আলা মওদুদী ভাগ্যের পরিহাসে পাকিস্তানেই রাজনৈতিক আশ্রয় পান। অন্যদিকে কাদিয়ানী/আহমদিয়া সম্প্রদায় পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার ছিল। পাকিস্তানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান কিংবা নোবেলজয়ী আবদুস সালামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এই সম্প্রদায়ের ছিলেন। তবু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তাদের অবদানকে অস্বীকার করে রাজনৈতিক প্রয়োজনেই তাদের ‘অন্য’ বানানোর চেষ্টা শুরু হয়।
১৯৫৩ সালে পাকিস্তানে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করার দাবিতে যে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে মওদুদী ও জামায়াত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মওদুদীর লেখা “কাদিয়ানী মাসআলা” পুস্তিকাই তখন বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। পাঞ্জাবজুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, এবং সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডও দেয়—যা পরে কমে গিয়ে কারাদণ্ডে পরিণত হয়। এভাবেই ধর্মীয় শত্রু তৈরি করে রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়া হয়েছিল।
১৯৭৪ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করে। এরপর দেশটি আরও গভীর সাম্প্রদায়িক সংঘাতে নিমজ্জিত হয়, আজ যেখানে শিয়া, আহমদিয়া, হাজারা, হিন্দু—কেউই নিরাপদ নয়। কারণ রাষ্ট্র যখন ধর্মীয় পরিচয়ের বিচারক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সংখ্যালঘুর অস্তিত্বই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশও আজ সেই একই পথে হাঁটছে কিনা—এই প্রশ্নই সবচেয়ে জরুরি। আজ কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হলে কাল একই যুক্তিতে সুন্নি-শিয়া, মাজারপন্থী, হেফাজতপন্থী—যে কাউকে ‘ধর্মভ্রষ্ট’ ঘোষণার পথ খুলে যাবে। ইতিমধ্যে দেশের নানা স্থানে কয়েক শতাধিক মাজার ভাঙার যে ঘটনা ঘটেছে, তা স্পষ্ট করে—ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতা কীভাবে অন্যদের জায়গা সংকুচিত করছে।
এই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ধর্মীয় উত্তেজনা আর বিভেদ-রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করবে, নাকি বহুত্ববাদ ও সভ্যতার পথে এগোবে। কারণ পরিচয়কে বাদ দিয়ে, দমন করে, অমুসলিম ঘোষণা করে কোনো রাষ্ট্র টিকে থাকার উদাহরণ নেই। আর ইতিহাস যতবার ফিরে দেখা যায়—কাদিয়ানী ইস্যুটি সেই অন্ধকার ইতিহাসই আবার মনে করিয়ে দেয়।







