বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ন

বেগম রোকেয়া ‘মুরতাদ কাফের’ !

যমুনা রহমান
বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫

সম্প্রতি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ‘মুরতাদ’ বা ‘কাফির’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক খন্দকার মহম্মদ মাহমুদুল হাসানের ফেসবুক পোস্টটি ভাইরাল হয়ে বড় সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। এই আক্রমণ শুধু বেগম রোকেয়ার উপর ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এটি দেখায়, আজও কিছু মানুষ ক্ষমতা, পুরনো ধারণা এবং ধর্মকে ব্যবহার করে মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ঠিক যেমন ধরো, যদি স্কুলে কেউ নতুন পরীক্ষার পদ্ধতি আনে, প্রথমে অনেকেই বিরক্ত হয় বা প্রতিবাদ করে।

রোকেয়ার বিরুদ্ধে অপপ্রচার নতুন নয়। ইতিহাসে দেখা যায় আলোকিত মানুষদের আলো পুরনো শক্তির কাছে বিপজ্জনক মনে হয়েছে। রোকেয়া এমন একজন আলোকবর্তিকা ছিলেন, যিনি নারীর শিক্ষা, স্বাধীনতা ও মানবমুক্তির কথা বলতেন এমন সময়ে, যখন প্রশ্ন করা মানে সমাজকে চ্যালেঞ্জ দেওয়া। আজও কিছু মানুষ তাঁকে ‘কাফের’ বা ‘মুরতাদ’ বলে। এটি ধর্মীয় বিতর্ক নয়; এটি এক ধরনের ক্ষমতার খেলা। যেমন ধরো, যদি কারো বাড়িতে নতুন নিয়ম আসে, কেউ তাদের আক্রমণ করতে পারে শুধু পুরনো অভ্যাস ভাঙার কারণে।

রোকেয়ার বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মূল কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। নারীর শিক্ষা সবসময় পুরনো শক্তির কাছে হুমকি। কারণ শিক্ষিত মানুষ প্রশ্ন করতে জানে। আর প্রশ্ন উঠলে পুরনো নিয়ম চালানো কঠিন হয়। রোকেয়া বলেছিলেন, “নারীর মুক্তি ছাড়া সমাজের মুক্তি সম্ভব নয়।” তিনি সকল ধরণের পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। রোকেয়ার লেখা ঠিক সেই বাধার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তাই তার চিন্তার বিরোধী হয়েছিল তৎকালীন ও পরবর্তী সমাজের কিছু মানুষ।

ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়—মানুষকে ভয় দেখানো, প্রশ্ন করতে না দেওয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ব্যবহার স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ আমলে ধর্মানুভূতির মামলা, ধর্মীয় প্রভাবিত সভা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের সময়ও ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়েছে। এইভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, প্রকৃত সমস্যা যেমন নারীর নিরাপত্তা, শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষা বা বৈষম্য আলোচনার বাইরে চলে যায়।

রোকেয়ার লেখা মূলত নারীর স্বাধীনতার ভয় প্রকাশ করে। যে সমাজে নারীর ভূমিকা সীমিত, সেখানে একজন নারী প্রশ্ন তুললেই তাকে বিদ্রোহী মনে করা হয়। রোকেয়ার যুক্তি, মানবিকতা ও আলোকপ্রবাহ পুরনো শক্তিকে অস্থির করে। তাই তাকে ‘অবিশ্বাসী’ বলা সহজ হয়ে যায়। এতে ধর্মের স্বার্থ রক্ষা হয় না, বরং পুরনো সামাজিক নিয়ম রক্ষা পায়। মৃত্যুর পরও দেখা যায়, সমাজের এক অংশ রোকেয়ার চিন্তাধারাকে গ্রহণ করতে পারেনি। তাকে দূরবর্তী স্থানে কবর দিতে হয়েছে। আলোকিত চিন্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কোনো নতুন বিষয় নয়।

আজ যখন রোকেয়ার লেখা পড়া হয়, দেখা যায়—তিনি ছিলেন সমাজের জাগরণের দৃঢ় কণ্ঠ। তাঁর পোশাক বা বাহ্যিক রীতি সময়ের অংশ, কিন্তু চিন্তাধারা অনেক দূর এগিয়েছিল। তিনি ধর্ম, সমাজ ও পুরুষতন্ত্রের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানবিক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর লেখা কারো বিরুদ্ধে ঘৃণা নয়; বরং মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের আহ্বান। দীর্ঘদিন কেউ কেউ রোকেয়াকে শুধু পর্দানসীন নারীশিক্ষার প্রভাবে দেখিয়েছে। তাঁর শক্তিশালী রচনার অনেক অংশ আড়াল করা হয়েছে। কিন্তু পুরো রচনা পড়লে দেখা যায়—তিনি ছিলেন মুক্তচিন্তার নির্ভীক ধারক।

কয়েক বছর ধরে কেউ কেউ রোকেয়ার চিন্তাকে নতুন নামে বাঁধতে চেয়েছে। একটি প্রচেষ্টা হলো তাঁকে “ইসলামিক নারীবাদী” বলা। তারা কিছু কথার বা ধর্মাচরণের উদাহরণ তুলে বলেছে যে, রোকেয়া নাকি ইসলামের ভেতর থেকে নারীর মুক্তি চেয়েছেন। কিন্তু রোকেয়ার সব লেখা একসঙ্গে পড়লে দেখা যায়—এ ধারণা অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর। তিনি নারীর মুক্তি কোনো ধর্মীয় নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাননি। বরং সমাজের কুসংস্কার, পুরুষতন্ত্র ও গোঁড়ামি খোলাখুলি সমালোচনা করেছেন। রোকেয়া বিশ্বাস করতেন—নারীর মুক্তি আসে শিক্ষা, যুক্তি, স্বাধীনতা ও আত্মসম্মান থেকে; কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে নয়। তাই তাঁকে “ইসলামিক নারীবাদী” বলা ভুল।

যদি কেউ বলেন, রোকেয়া ‘কাফের’ বা ‘মুরতাদ’, তাতেও তাঁর মর্যাদা কমে না। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কোনো ধর্মের অনুসারী না হলেও, তাদের শ্রমে আমাদের জীবন সহজ হয়েছে। বিমান, ওষুধ, সফটওয়্যার, যানবাহন—এসব এসেছে এমন মানুষের শ্রমে, যাদের বিশ্বাস ভিন্ন। মানুষকে মূল্যায়ন করা উচিত কাজ, মানবতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে, ধর্মের লেবেল দিয়ে নয়।

মৌলবাদীরা প্রায়শই মানুষের মুক্ত চিন্তা বন্ধ করতে চায়। তারা ভয়, ধর্মীয় আবেগ ও পুরনো রীতিকে অস্ত্র বানিয়ে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। রোকেয়ার জীবন ও লেখা প্রমাণ করে, আলোকিত চিন্তা কখনো দমন করা যায় না। ইতিহাস দেখিয়েছে—অজ্ঞতা যতই চেষ্টা করুক, আলো তার পথ খুঁজে পায়। রোকেয়ার প্রতি সম্মান মানে মানুষের মুক্তি, সমতা ও যুক্তির প্রতি সম্মান। অন্ধকার যতই ঘন হোক, আলোর পথ থামতে পারে না। রোকেয়ার রেখে যাওয়া দিশা স্পষ্ট—মানুষকে মানুষ হতে দেওয়া, সমাজকে আলোকিত করা এবং মুক্তি ও ন্যায়ের পথে হাঁটানো। যারা মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তারা ইতিহাসে কেবল অন্ধকারের অংশ হয়ে থাকে, কিন্তু আলোর পথ সবসময় চলতে থাকে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!