বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৪৪ পূর্বাহ্ন

ইনকিলাব মঞ্চ, গুলি ও গুজব: ওসমান হাদী হামলা ঘিরে দায় চাপানো ও ক্ষমতার অন্ধকার রাজনীতি

অপু সারোয়ার
শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

জুলাই অভ্যুত্থানের পর আলোচিত ও বিতর্কিত চরিত্র ইনকিলাব মঞ্চের সংগঠক শরিফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাটি এখন আর শুধু একটি হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এই ঘটনা রাজনৈতিক দায় চাপানো, নানা সন্দেহ, পাল্টা অভিযোগ এবং আন্ডারওয়ার্ল্ড রাজনীতির সম্ভাব্য যোগসূত্রে জড়িয়ে এক জটিল বাস্তবতার ছবি তুলে ধরছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক–রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। এই প্ল্যাটফর্মকে পরিচিত করে তুলতে ওসমান হাদীর ভূমিকা ছিল বড়। ইনকিলাব মঞ্চ নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে আধিপত্যবাদ বিরোধিতা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বললেও বাস্তবে তারা বেশি আলোচনায় এসেছে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য, উগ্র ভারতবিরোধিতা এবং রাজপথের উচ্চকণ্ঠ কর্মসূচির কারণে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনে ইনকিলাব মঞ্চ যে অবস্থান নেয়, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক তৈরি করে। এই বিতর্ক একদিকে হাদীর সমর্থক বাড়ালেও অন্যদিকে তাঁকে প্রবলভাবে সমালোচিত করে তোলে। ওসমান হাদীর ব্যবহৃত “শা’উয়া মা’উয়া” স্লোগান সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে প্রধান গণমাধ্যমগুলো এ বিষয়ে ছিল অনেকটাই নীরব। হাদী নিজে গালাগালিকে “মহাকাব্য” হিসেবে বর্ণনা করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর নিয়ে তাঁর বক্তব্য অনেকের কাছেই অসুস্থ ও বিবেকবর্জিত বলে মনে হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা আর সভ্যতা–ভব্যতা ছাড়িয়ে গালাগালি—এই দুই বিষয় এক নয়, সেটিও আলোচনায় উঠে আসে।

এদিকে জুলকারনাইন সায়ের কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী। তিনি আল জাজিরা ইনভেস্টিগেটসের প্রামাণ্যচিত্র “All the Prime Minister’s Men”–এ কাজ করে আলোচনায় আসেন। সম্প্রতি তাঁর একটি ফেসবুক পোস্ট নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, অপরাধী সুব্রত বাইনের মতো ৮০ জন পেশাদার খুনিকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে।এই দাবি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে এবং স্বাভাবিকভাবেই দুটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, যদি জুলকারনাইন সায়েরের কাছে সত্যিই এমন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য থাকে, তাহলে তিনি এতদিন তা গোপন রাখলেন কেন? তিনি এই তথ্য কোথা থেকে পেলেন এবং কেন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত বিষয় সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করলেন—এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়ত, যদি ধরে নেওয়া হয় যে আওয়ামী লীগ সত্যিই ভারত থেকে ৮০ জন শ্যুটার এনে হত্যামিশনে নেমেছে, তাহলে তারা এতদিন অপেক্ষা করল কেন? আওয়ামী লীগ তো আগেই জানত যে এই নির্বাচনে তাদের অংশ নিতে দেওয়া হবে না। সে ক্ষেত্রে তফসিল ঘোষণার পর নয়, আরও আগেই এমন অভিযান শুরু করার কথা ছিল। তাই তফসিল ঘোষণার পর হঠাৎ করে এমন হামলার গল্প বাস্তবতার সঙ্গে কতটা মেলে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

ওসমান হাদীর ওপর হামলার পরপরই ডাকসুর ভিপি সাদেক কায়েমের একটি ফেসবুক পোস্ট আলোচনায় আসে। সাদেক কায়েম অতীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঘটনার কোনো তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি আকারে–ইঙ্গিতে হামলার দায় বিএনপির ওপর চাপান। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায় চাপানোর পুরোনো সংস্কৃতি আবার সামনে আসে। হাদীর রাজনৈতিক ভাষা ছিল সংঘাতমুখী। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দাবি তাঁকে একাংশের কাছে জনপ্রিয় করলেও অন্যদের কাছে ভয় ও উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। এখন অনেকেই বলছেন, “ওসমান হাদী যে ধরনের রাজনীতিতেই বিশ্বাস করুক না কেন, তাকে হত্যা করার বৈধতা কারও নেই।” কথাটি নৈতিকভাবে সঠিক। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—গত দেড় বছরে যখন ওসমান হাদী ও তাঁর সঙ্গী–সাথীদের ভয়ে মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষকে হত্যা, মারধর ও উচ্ছেদ করা হয়েছে, তখন কি এই কথাটি বলা হয়েছিল? তখন কি বলা হয়েছিল রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কাউকে হত্যা করা যাবে না?

যারা একটি দেশের ইতিহাসের সাক্ষী স্থাপনা ধ্বংস করে, ভিন্নমত দমনে আগুন, লুটপাট ও ভয় দেখানোকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানায়, তারা আদতে রাজনৈতিক বিশ্বাসে ফ্যাসিবাদেরই অনুসারী—এমন মতও উঠছে। হাদীকে কে গুলি করেছে, কারা করতে পারে, কারা এতে খুশি হয়েছে বা কারা ট্রল করছে—এই হিসাব পরে হবে। কিন্তু আজ যারা হাদীর বাকস্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখাচ্ছেন, অনেকের কাছে এই উদ্বেগ সুশীলতার চেয়ে দ্বিচারিতার উদাহরণ বলেই মনে হচ্ছে। কারণ গত দেড় বছরে এই ‘হাদী টাইপ’ রাজনীতির হাতেই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। আইন ও আদালতের কার্যকারিতা প্রায় উঠে গিয়েছিল। যে কারও বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া যেত। শুধু আওয়ামী লীগ করেছে—এই অভিযোগেই মানুষকে হত্যা করা যেত, ছাত্রত্ব বাতিল করা যেত, সম্পত্তি দখল হয়ে যেত। এই বাস্তবতার পর আবার নিরাপদ, স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খল নির্বাচনী পরিবেশ আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত—সেই প্রশ্নই উঠছে।

ঢাকা–৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাদীর সক্রিয় প্রচারের মধ্যেই হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এটি নির্বাচনকে ভয় ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি কৌশল হতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সামনে আরও সহিংস ঘটনা ঘটলে নিরাপত্তার অজুহাতে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। এদিকে হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আলোচনায় আসা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান—যিনি অতীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছেন। পিস্তলসহ ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েও দ্রুত জামিন পাওয়া, এরপর ইনকিলাব মঞ্চে সক্রিয় থাকা এবং গুলির আগ পর্যন্ত হাদীর ঘনিষ্ঠ থাকা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি অনেকের কাছে পরিকল্পিত বলেই মনে হচ্ছে।

দুটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ ডাকাতির সময় গ্রেপ্তার হওয়া একজন আসামির মাত্র তিন মাসের মধ্যে জামিন পাওয়া বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফয়সাল করিম মাসুদ ৮ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। অথচ মাত্র তিন মাস পর, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে বের হয়ে আসেন। এই জামিনের পেছনে হাইকোর্টে আইনগত সহায়তা করেন বিএনপিপন্থী দুই আইনজীবী কায়সার কামাল ও মাহফুজুর রহমান। প্রথমে তাঁকে ছয় মাসের জামিন দেওয়া হয়, পরে সেই জামিনের মেয়াদ বাড়িয়ে এক বছর করা হয়। সাধারণভাবে কোনো ফৌজদারি মামলায় সিএমএম কোর্ট ও জজ কোর্ট পেরিয়ে হাইকোর্টে যেতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। এরপর মামলার শুনানি তালিকাভুক্ত করতেও আরও সময় লাগে। সেখানে দুটি অস্ত্রসহ ধরা পড়া একজন আসামি কীভাবে এত দ্রুত জামিন পেলেন—এই প্রশ্নই এখন ঘুরে ফিরে আসছে।

আরও প্রশ্ন উঠছে, এই প্রক্রিয়ায় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কোনো ভূমিকা বা প্রভাব ছিল কি না। তাঁর নীরব সম্মতি বা হস্তক্ষেপ ছাড়া কি এমন দ্রুত জামিন সম্ভব—এমন সন্দেহও প্রকাশ করা হচ্ছে। আইনের দৃষ্টিতে বিশেষ ক্ষেত্রে হাইকোর্টে মামলা নেওয়া সম্ভব হলেও, এত গুরুতর অভিযোগে এই ধরনের সুবিধা কতটা স্বাভাবিক—সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, ফয়সাল করিম মাসুদের দ্রুত জামিন পাওয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত আইনি ঘটনা নয়। এটি পুরো বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। এসব প্রশ্নের নথিভিত্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর না এলে জনমনে সন্দেহ আরও গভীর হবে বলেই মনে করছেন অনেকে।

এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যে আরেকটি বড় বিষয় সামনে আসছে। অনেকের মতে, ৫ আগস্টের পর দেশ এক ধরনের নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় চলে গেছে। সরকার পড়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়, অভ্যুত্থানও নতুন নয়। নেপালে সরকার বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি। বাংলাদেশে সমস্যা হয়েছে রাজনীতি তথাকথিত ‘তারুণ্যের’ নামে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত, অসভ্য ও সহিংস গ্যাংয়ের হাতে তুলে দেওয়ার কারণে। এর ফলেই পাকিস্তানের মতো গাড়িবোমা, টার্গেট কিলিং এবং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বাস্তবতা সামনে এসেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়—থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো কোথায়? সেগুলো কি নিজে নিজে গুলি ছুড়ছে, নাকি কাউকে নির্দিষ্ট করে ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে? বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নামে গড়ে ওঠা সংগঠন, এনসিপি, জামায়াত–শিবির, ইনকিলাব মঞ্চসহ যেসব মবভিত্তিক সংগঠন রাজনীতির মাঠ দখল করেছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় না আনলে এই সহিংস রাজনীতি বন্ধ হবে না।

সব মিলিয়ে, ওসমান হাদীর ওপর হামলা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হলেও এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও আইনের গভীর সংকটের প্রতিফলন। অপরাধীর পরিচয় যা–ই হোক, রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ঘটনাকে ব্যবহার না করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সবার জন্য একই মানদণ্ডে বিচারই একমাত্র পথ। একই সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকেই ওসমান হাদীর সুস্থতা কামনা করছেন। তবে অতীতের সহিংস রাজনীতির দায় স্বীকার না করলে এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিনই হবে।

তথ্য সূত্র:
১. ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ। প্রথম আলো। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫।
২. ‘পাশের দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ৮০ জন আততায়ীকে অনুপ্রবেশ করিয়েছে’ – ‘ জুলকারনাইন সায়ের। কালের কণ্ঠ। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫।
৩. যেভাবে আলোচনায় আসেন ওসমান হাদি। আরফাতুল ইসলাম নাইম -বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫।
৪. বিভিন্ন দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নিয়েছে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ । দৈনিক ইনকিলাব। ১৫ মার্চ ২০২৫।
৫.ওসমান হাদির হামলাকারীকে ধরিয়ে দিলেই ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার | চালু হচ্ছে ডেভিল হান্ট ফেইজ ২। প্রথম আলো। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!