বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন

দিপু দাসের মৃত্যু: বিচারহীনতার দেশে একজন শ্রমিকে পুড়িয়ে হত্যা

যমুনা রহমান
শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫

দিপু দাস নামের একজন গার্মেন্টস শ্রমিক ।  ময়মনসিংহের মাটি থেকে উঠে আসা একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন নিজের পরিবারের চারজন সদস্যের প্রধান উপার্জনকারী।  গার্মেন্টস কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করে তিনি সংসারের চালচলন চালাতেন— বাড়ির ভাড়া, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় সবই তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দিপু দাসের মৃত্যু একটি ব্যক্তির জীবনাবসান নয়; এটি একটি পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভেঙে পড়ার সূচনা  । একই সঙ্গে দেশে ক্রমবর্ধমান সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার এক নির্মম প্রতিফলন।

ঘটনার দিন উত্তেজিত জনতা দিপু দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে একটি গাছে তার লাশ ঝুলিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এত বড় সহিংসতা চলাকালীন পুলিশ বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল না। লাশে আগুন দেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা সেখানে পৌঁছায়। যতদূর জানা গেছে, দিপুর কয়েকজন সহকর্মী অভিযোগ করেন যে তিনি কারখানায় ইসলামের নবীর অবমাননা হয় এমন মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সেই সহকর্মীরা কারা, ঠিক কী বলা হয়েছিল, কে কে শুনেছিল—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট উত্তর নেই। কারখানায় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার কথা; ফুটেজ পরীক্ষা করা হলে অনেক কিছু পরিষ্কার হওয়ার কথা ছিল। অথচ সেই দিকগুলো জনসমক্ষে পরিষ্কারভাবে আনা হয়নি।

দিপু দাসকে ঘিরে ছড়ানো সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য ছিল তথাকথিত “ধর্ম অবমাননার অভিযোগ”। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে তিনি ধর্ম অবমাননার মতো কোনো কাজ করেছেন বা কোনো বক্তব্য দিয়েছেন। কোনো ভিডিও, অডিও, লিখিত পোস্ট, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য কিংবা নিরপেক্ষ প্রমাণ—কিছুই পাওয়া যায়নি। দিপু নিজেও পুলিশের কাছে বলেছেন, তিনি কোনো কটূক্তি করেননি এবং তার সে ধরনের কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রোফাইলও নেই। তবুও এই ভিত্তিহীন অভিযোগকে কেন্দ্র করে তাকে প্রকাশ্যে গণপিটুনি দেওয়া হয় এবং পরে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা আইনের শাসনের কার্যত ভাঙন এবং সমাজে নৈতিক নিয়ন্ত্রণের গভীর অবক্ষয়কে নগ্নভাবে সামনে এনে দেয়।

ঘটনার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, দিপু দাস তখন পুলিশের হেফাজতেই ছিলেন। তার জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, পুলিশ তাকে জনতার সামনে ক্ষমা চাইতে বলছে। দিপু বারবার মাথা নেড়ে বলছিলেন, তিনি কিছুই করেননি—তাই ক্ষমা চাইবেন কেন। এখানেই বড় প্রশ্ন উঠে আসে: পুলিশের হেফাজতে থাকা একজন মানুষ কীভাবে, কোন আইনে এবং কার অনুমতিতে উন্মত্ত জনতার হাতে তুলে দেওয়া হলো? এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত দেড় বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক নির্যাতনের একটি স্পষ্ট ধারা । ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অন্তত ১,০৬৮টি সংখ্যালঘু পরিবারের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয় এবং ২২টি ধর্মীয় স্থাপনা ও মন্দির ভাঙচুর করা হয় বলে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালের দুর্গাপূজার সময় ২৭টি জেলায় অন্তত ১১৭টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা, শত শত বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ধর্মীয় উৎসব ও সংখ্যালঘু পরিচয় বারবার সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১,৪১৫টি হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার ও বিচার অত্যন্ত সীমিত। প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ‘সংবেদনশীলতা’র অজুহাতে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রবণতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলেছে। ফলে সংখ্যালঘু নির্যাতন এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

এই সময়েই হিন্দু শিক্ষকদের চাকরি থেকে বিতাড়নের ঘটনাও বেড়েছে। এসব ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিদ্বেষের পাশাপাশি সম্পত্তি দখলের রাজনীতি স্পষ্টভাবে কাজ করেছে। বহু শিক্ষককে মিথ্যা অভিযোগে সামাজিকভাবে একঘরে করা হয়েছে, চাকরি হারানোর পর তাদের জমি বা বসতভিটা দখলের চেষ্টা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, এই সহিংসতা কেবল বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষমতা ও সম্পদের লড়াইয়ের অংশ। সহিংসতার পরিসর শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাজার, খানকা ও সুফি ঐতিহ্যভিত্তিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা, বাউল শিল্পী ও সুফি অনুশীলনকারীদের ওপর আক্রমণ বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে সরাসরি আঘাত করছে। একইভাবে রাজশাহী, রংপুর ও নীলফামারীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আহমদিয়া মুসলিমদের মসজিদ ও বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। মুসলিম হয়েও ‘ভিন্ন মতবাদী’ পরিচয়ের কারণে তারাও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে ৩,৬০৭টি হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থার হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে অন্তত ১৭৪ জন মানুষ প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা হয়েছে এবং গত ১৪ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৪০ জন। এসব ঘটনায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দেওয়া হয়নি।

 দিপু দাসের হত্যাকাণ্ড  কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি উগ্র রাজনীতি, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফল। ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে একজন গরিব, সংখ্যালঘু শ্রমিককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অতীত অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছে। আরও ভয়াবহ হলো, এই সহিংসতাকে ‘মব’ না বলে ‘প্রেসার গ্রুপ’ বলার চেষ্টা। এতে হত্যাকে এক ধরনের ন্যায্য ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে স্বাভাবিক করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু যে মুহূর্তে একজন মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়, সেই মুহূর্তেই সমাজের হৃদস্পন্দন থেমে যেতে থাকে। দিপু দাস মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা  অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মাঝে  পড়ে যান।

শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের পতনের পর থেকে ধরে বিভিন্ন জায়গায় মব সন্ত্রাস ঘটেই চলেছে। সরকারের কেউ কেউ এটা ‘জনরোষ’, ‘প্রেশার গ্রুপ’ ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ ইত্যাদি বলে অপরাধীদের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন।আজকে যে পুলিশ, এমনকি সেনাসদস্যরা গুরুতর মব সন্ত্রাস দেখেও পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে যে ভয়ের অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মুক্ত নন।ধর্ম অবমাননা’ এই টার্মটি নিজেই ভয়ংকরভাবে ভাসা ও অস্পষ্ট। অবমাননার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, কোনো মানদণ্ড নেই। কিন্তু আমাদের সমাজের মননে এতটুকু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে যে একদল উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠ বাদে আর কারো ধর্ম থাকার অধিকার নেই। আর ‘অবমাননা’ কী তা ঠিক করে দেবে এই ধর্মবাদীরা। দিপু দাসের মৃত্যুকে পাস্ কাটানোর জন্য ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধম্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিন্দনীয় ও বিচারযোগ্য অপরাধ। তবে কোন অপরাধকে অন্য অপরাদের ঘটনা দিয়ে সাফাই বা ঢেকে ফেলার ছোট – বড় সকল প্রচেষ্টা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। এই বাস্তবতায় নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতে হবে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, দিপু দাসের পরিবারের দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে। যদি আমরা এখনই না বলি যে আমরা বিচারহীন হত্যার সমাজ চাই না, তাহলে দঙ্গলের শাসন কায়েম হবে। তখন দিপু দাস একা থাকবেন না—কেউ নিরাপদ থাকব না।

 


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!