বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন

সীমান্ত, মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা: ফেলানি থেকে পুশ ইন–পুশ ব্যাকের রাজনৈতিক অর্থনীতি

অপু সারোয়ার
বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬

ফেলানি খাতুনের নাম এখন আর শুধু একটি ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, এটি বাংলাদেশের সীমান্ত বাস্তবতার একটি স্থায়ী প্রতীক। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তে কাঁটাতারের ওপর ঝুলে থাকা তার নিথর দেহ অনেক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল—যেগুলোর বেশির ভাগেরই উত্তর আজও মেলেনি। ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার সময় কাঁটাতার টপকাতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে ১৪ বছরের এক কিশোরীর মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না। তার আগে যেমন সীমান্তে মানুষ মারা গেছে, তার পরও গেছে। তবু ফেলানির ছবিটি মানুষের বিবেককে যেভাবে নাড়া দিয়েছিল, তা অন্য কোনো ঘটনায় হয়নি। সেই ছবি রাজনীতি, কবিতা, আবেগ ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই আবেগের আড়ালে যে কাঠামোগত বাস্তবতা আছে, সেটি বরাবরই আড়ালেই থেকে গেছে।

ফেলানির বাবা নুরুল ইসলাম নুরু জীবিকার তাগিদে ভারতের বঙ্গাইগাঁও এলাকায় কাজ করতেন। মেয়ের বিয়ে ঠিক হওয়ায় তিনি ফেলানিকে নিয়ে দেশে ফিরছিলেন। সীমান্তে গুলির শব্দ, আতঙ্ক ও দৌড়ঝাঁপের মধ্যে বাবা বেঁচে গেলেও মেয়েটি বাঁচেনি। গুলিবিদ্ধ ফেলানির দেহ সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলে ছিল। দুই রাষ্ট্র, দুই প্রশাসন ও দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনী যেন নির্বিকারভাবে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেদিন সীমান্ত কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং একটি নিষ্ঠুর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছিল।

ফেলানি হত্যার পর বাংলাদেশে গভীর শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতেও অনেক মানবাধিকারকর্মী প্রতিবাদে মুখর হন। কেউ কেউ ফেলানির নামকে স্মৃতির রাজনীতিতে স্থায়ী করার প্রস্তাব দেন—ফেলানি দিবস, ফেলানি সড়ক, ফেলানির ভাস্কর্য। এগুলো প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ধীরে ধীরে ফেলানির মৃত্যু একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। সীমান্ত হত্যার প্রশ্নটি মানবিক ও সামাজিক সংকট হিসেবে আলোচনার বদলে অনেক সময় ভারতবিরোধিতা বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ভাষায় আটকে যায়। এতে মূল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়—ফেলানির মতো মানুষরা কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পেরোতে বাধ্য হয়।

সীমান্ত অঞ্চলের বাস্তবতা দেশের কেন্দ্রের মতো নয়। কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট বা মৌলভীবাজারের অনেক সীমান্ত এলাকায় শিল্প নেই, বড় বাজার নেই, নিয়মিত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। কৃষিকাজই প্রধান ভরসা, কিন্তু কৃষি আধুনিক হওয়ায় সেখানে শ্রমের চাহিদা ক্রমেই কমছে। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বেকার বা অর্ধবেকার অবস্থায় দিন কাটায়। পেটের দায়ে তারা ছোটখাটো কাজের সন্ধানে, কখনো রিকশা চালাতে, কখনো অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করতে, আবার কখনো সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যেতে বাধ্য হয়। এই যাতায়াতের বড় অংশই অবৈধ। মানুষ জানে এটি বিপজ্জনক, তবু যায়—কারণ তাদের সামনে কার্যকর কোনো বিকল্প পথ নেই।

সীমান্ত মানেই যে শুধু মাদক বা গরু পাচার, এই ধারণা বাস্তবতাকে সরল করে দেখায়। বাস্তবে সীমান্ত এলাকায় বৈধ ও অবৈধ নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে, যা দুই দেশের স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চোরাচালান একটি যৌথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে ভারতীয় বিক্রেতা ও বাংলাদেশি ক্রেতা উভয় পক্ষই যুক্ত। বাজার অর্থনীতির নিয়মেই এটি টিকে আছে। এই ব্যবস্থার প্রধান জ্বালানি হলো উভয় দেশের সীমান্ত অঞ্চলের দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। রাষ্ট্রের কাগুজে আইন অনেক সময় এই বাস্তব জীবনের সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে সীমান্ত এক ধরনের ধূসর অঞ্চলে পরিণত হয়, যেখানে আইন, অর্থনীতি ও বেঁচে থাকার লড়াই একসঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়।

দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে, যেমন খুলনা–যশোর বা রাজশাহী অঞ্চলে, চোরাকারবারের একটি তুলনামূলকভাবে সংগঠিত অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু কুড়িগ্রাম কিংবা উত্তর ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে সেই কাঠামো অনেক দুর্বল। বড় শহর থেকে দূরত্ব, অবকাঠামোর অভাব ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে এসব অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। এই অবহেলাই ফেলানির মতো পরিবারগুলোকে দেশান্তরে যেতে বাধ্য করে।

এই সীমান্ত বাস্তবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘পুশ ইন’। পুশ ব্যাক ও পুশ ইন আসলে একই প্রক্রিয়ার দুই দিক। কোনো দেশে ধরা পড়া মানুষকে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্তে এনে অন্য দেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়া হয়। ভারতে একে বলা হয় পুশ ব্যাক, আর বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার পর সেটিই পুশ ইন নামে পরিচিত হয়। এই পদ্ধতির কোনো আইনি স্বীকৃতি ভারতীয় আইনে নেই। তবু দীর্ঘদিন ধরেই এটি নিয়মিতভাবে চলছে। বাস্তবে এটি এমন একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যেটি দুই রাষ্ট্রই প্রকাশ্যে অস্বীকার করে, কিন্তু নীরবে মেনে নেয়।

ভারতে যদি অবৈধভাবে কাজের সন্ধানে যাওয়া কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে আইনি পথে ধরা হতো, তাহলে প্রথমে তাকে গ্রেপ্তার দেখাতে হতো, এরপর মামলা চলত, বিচার হতো, সাজা হলে জেলে রাখতে হতো। সেই সাজা শেষে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে হতো। এই পুরো প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং প্রশাসনিকভাবে জটিল। ভারত রাষ্ট্র এই আইনি ঝামেলায় যেতে আগ্রহী নয় বলেই পুশ ব্যাকের পথ বেছে নেয়। ফলে পুশ ব্যাক একটি আইনবহির্ভূত ও অমানবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে মানুষের কোনো মৌলিক অধিকারই স্বীকৃত হয় না।

পুশ ইন–পুশ ব্যাক ঘিরে বাংলাদেশে ও ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও সক্রিয়। সংবাদপত্রে প্রায়ই লেখা হয়—‘বাংলাদেশে পুশ ইন হওয়া মানুষদের বেশির ভাগ মুসলিম ও বাংলাভাষী’। এই ভাষা তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বেশি বহন করে। বাংলাদেশের সব নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয় বাংলাদেশি। দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ মুসলিম এবং প্রায় সবাই বাংলাভাষী। এই বাস্তবতায় আলাদা করে ‘মুসলিম’ বা ‘বাংলাভাষী’ বলার কোনো তথ্যগত প্রয়োজন নেই। বরং ‘মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক আবেগ উসকে দেওয়া হয় এবং অন্ধ ভারতবিরোধিতাকে শক্তিশালী করা হয়। এতে সমস্যার মূল কারণ—দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা—আড়ালে পড়ে যায়।

ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান বাংলাদেশে নতুন নয়। যুদ্ধোত্তর সময়ে চীনপন্থী কমিউনিস্টদের হাত ধরে এই স্লোগান জনপ্রিয়তা পায় এবং শুরু থেকেই এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অভ্যুদ্বয়ের বিরোধিতার ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চীনপন্থী বাম রাজনীতির একটি বড় অংশ বিভিন্ন মাত্রায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরোধিতা করেছিল। সেই রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকেই ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী স্লোগান আবেগী শক্তি পেয়েছে, যদিও বাস্তব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গে তার বড় ধরনের সংঘর্ষ রয়েছে।

বাংলাদেশ একটি কম সম্পদের দেশ। এমন একটি দেশের পক্ষে তার নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলার কোনো বাস্তব বিকল্প নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগ ব্যয় এবং বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম—সব মিলিয়েই বাংলাদেশকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ভিত্তি তৈরি পোশাক শিল্প, যা সম্পূর্ণভাবে রপ্তানিনির্ভর এবং তথাকথিত মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক রপ্তানির সুযোগ পেতে হলে বাংলাদেশকেও অন্য দেশের পণ্যের জন্য নিজের বাজার উন্মুক্ত রাখতে হয়। মুক্ত বাজারের এই কাঠামোর ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি পণ্য আসে নিকটতম প্রতিবেশী দেশ থেকে। এখানে কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মই কাজ করে।

ভারতের কাঁচামাল, ভারতের বাজার এবং ভারতের ভোগ্যপণ্যের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল নয়; এটি উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় ও ভৌগোলিক নিকটতার যৌক্তিক ফলাফল। ভারতের সস্তা শ্রম ও বৃহৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে অনেক পণ্যের দাম বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে। এতে একদিকে স্থানীয় শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হয়, অন্যদিকে ভোক্তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় তুলনামূলকভাবে সহনীয় থাকে। এই জটিল বাস্তবতার ভেতর দাঁড়িয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ‘মেরুদণ্ড সোজা রেখে’ অবস্থান নেওয়া স্লোগানে সহজ, বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।

অর্থনৈতিকভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল একটি দেশের পক্ষে সীমান্ত, বাণিজ্য ও অভিবাসন প্রশ্নে আবেগী ও একমাত্রিক অবস্থান নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের মতো অমানবিক প্রক্রিয়ার বিরোধিতা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেই বিরোধিতা যদি সাম্প্রদায়িক ভাষা ও অন্ধ ভারতবিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা সমস্যার সমাধান করে না, বরং সংকটকে আরও গভীর করে। প্রকৃত সমাধান লুকিয়ে আছে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা, সীমান্ত অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর মধ্যেই। যত দিন পর্যন্ত এই কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান না হবে, তত দিন সীমান্ত দুর্বল মানুষের জন্য কেবল একটি রেখা নয়, বরং মৃত্যুর শেষ ঠিকানা হয়েই থেকে যাবে।

তথ্য সূত্র :
১. ফেলানিকে হত্যা খারাপ কাজ হয়েছিল, বলছে বিএসএফ। ১২ অগাস্ট ২০১৪। বিবিসি বাংলা।
২. ৪৯ দিনে ১৭১৩ জনকে পুশ ইন। ২৬ জুন, ২০২৫। কালের কণ্ঠ।
৩. প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এড়িয়ে ‘পুশ-ব্যাক’ নীতি দিল্লির -বাংলাদেশের আপত্তি সত্ত্বেও চলছেই ভারতীয় ‘পুশ-ব্যাক’ অভিযান। ২৮ মে ২০২৫।
৪. পুশ ইন বা পুশ ব্যাক কোনো আইনসম্মত পদ্ধতি নয়: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। ১৭ মে ২০২৫।প্রথম আলো।
৫. সীমান্তে ১০ বছরে বিএসএফের হাতে ৩০৫ বাংলাদেশি নিহত। ১১ মার্চ ২০২৫। প্রথম আলো।
৬. সিলেট সীমান্তে ‘ভারতীয় খাসিয়াদের’ গুলিতে বাংলাদেশি যুবক নিহত । ২৩ নভেম্বর ২০২৫ । প্রথম আলো।
৭. ভারতীয় খাসিয়াদের হামলায় বাংলাদেশি যুবক নিহত। ৮ মার্চ ২০২৫। সমকাল।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!