গাজা উপত্যকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ (আইএসএফ)-এ অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট আলিসন হুকার ও সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এই আগ্রহের কথা জানান বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি।
এই আগ্রহ প্রকাশ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গাজায় ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক অভিযানে অঞ্চলটি কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত, অবকাঠামো ধ্বংস, খাদ্য ও চিকিৎসার ভয়াবহ সংকট—এই বাস্তবতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অবস্থান করছে। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত আইএসএফ-এর লক্ষ্য হিসেবে ‘নিরস্ত্রীকরণ’ ও ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহার গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাস্তবে এর অর্থ দাঁড়ায়—ইসরায়েলি আগ্রাসনের ফলাফলকে স্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলার একটি কাঠামো নির্মাণ।
এই অবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহ নীতিগতভাবে গুরুতর বিতর্কের জন্ম দেয়। গাজায় চলমান অভিযান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত বহু আন্তর্জাতিক সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সেখানে একটি তথাকথিত ‘স্থিতিশীলতা বাহিনী’ পাঠানো হচ্ছে আগ্রাসনের রাজনৈতিক বৈধতা জোগানো এবং নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া।
সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, বাহিনীটি যদি জাতিসংঘের আওতায় গঠিত হয়, তবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় এতে অংশ নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইএসএফ-এর ম্যান্ডেট, কমান্ড কাঠামো কিংবা জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক অনুমোদিত হলেও
এটি একটি যুক্তরাষ্ট্র–নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ও সামরিক প্রকল্প হিসেবেই প্রতীয়মান। এমন প্রকল্পে যুক্ত হলে বাংলাদেশ নিরপেক্ষ শান্তিরক্ষী রাষ্ট্রের বদলে একটি বিতর্কিত ভূরাজনৈতিক উদ্যোগের অংশীদারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি নেবে।
ইতিহাস বলছে, জাতিসংঘ বা তার পূর্বসূরি লীগ অব নেশনস কখনোই প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ বা ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। লীগ অব নেশনস গঠিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তিগুলোর মধ্যে বিশ্ব ভাগাভাগির তদারকির জন্য। পরে গঠিত জাতিসংঘও সেই কাঠামোগত সমস্যাগুলো বহন করে চলেছে। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থার কারণে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বাইরে গিয়ে জাতিসংঘ কার্যত অক্ষম।
আফ্রিকার কঙ্গোতে প্যাট্রিস লুমুম্বার হত্যাকাণ্ড, নামিবিয়া ও অ্যাঙ্গোলায় স্বাধীনতা সংগ্রামের দুর্বলীকরণ, মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের নীরব পর্যবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ‘শান্তিরক্ষা’ ও ‘পর্যবেক্ষণ’-এর নামে এই সংস্থাটি সব সময়ই সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গাজা নিয়ে প্রস্তাবিত আইএসএফ-এ অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক নয়, নৈতিক সংকটও তৈরি করে। বিশ্লেষকদের মতে, ভিসা বন্ড, বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্কহার ও অভিবাসন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের প্রেক্ষাপটেই হয়তো সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার কৌশল হিসেবে এই আগ্রহ দেখানো হচ্ছে। ইউনুস সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আমেরিকার সমর্থন দরকার। এই সমর্থনের প্রত্যাশাতেই গাজায় শান্তি রক্ষী বাহিনী পাঠানোর পায়তারা। ইতিমধ্যে পাকিস্তান বাংলাদেশের মত গাজায় শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠাতে রাজি হয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান অভ্যান্তরিন ভাবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সংহতি নিয়ে সরব হলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরাইল- আমেরিকার লাঠিয়াল হিসাবে কাজ করার কসরৎ করছে। গাজায় প্রকৃত অর্থে স্থিতিশীলতা তখনই সম্ভব, যখন আগ্রাসন বন্ধ হবে, অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের রাজনৈতিক অধিকার স্বীকৃত হবে। সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো ‘স্থিতিশীলতা বাহিনী’-তে অংশ নেওয়া শান্তি প্রতিষ্ঠার নয়, বরং অন্যায়ের ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়ারই শামিল।