বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন

শাহ বানো : মাটির ঘরে দাঁড়িয়ে সংবিধানের দরজায় কড়া নাড়া

অপু সারোয়ার
মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬

শাহ বানো বেগমের জীবনকাহিনি ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ধরে। তিনি কোনো রাজনৈতিক নেত্রী ছিলেন না। কোনো আন্দোলনের মুখও ছিলেন না। ছিলেন একেবারে সাধারণ একজন মুসলিম নারী। যিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কেবল বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সাধারণ দাবিটিই ধীরে ধীরে উন্মোচন করে দেয় রাষ্ট্র, রাজনীতি, ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং তথাকথিত উদার সমাজের প্রকৃত চরিত্র। শাহ বানোর গল্প শুধু একটি আইনি মামলার ইতিহাস নয়; এটি দেখায় কীভাবে একজন নারী একই সঙ্গে ধর্মীয় পিতৃতন্ত্র এবং কথিত প্রগতিশীল সমাজের নীরবতার শিকার হন।

শাহ বানো বেগমের বিয়ে হয় ১৯৩৩ সালে, মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে, এক নামী উকিল মহম্মদ আহমেদ খানের সঙ্গে। সেই সময়ের একটি সাধারণ মুসলিম পরিবারের নারী যেমন হয়ে থাকেন, তিনিও তেমনই ছিলেন—খুব বেশি লেখাপড়া জানা নয়, ধর্মভীরু, সংসার সামলানো ও সন্তান লালন-পালনের মধ্যেই যার জীবন সীমাবদ্ধ। তিনি পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। পারিবারিক সম্পর্কের দিক থেকেও এই বিয়ে ছিল ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার মধ্যে—শাহ বানো ছিলেন আহমেদ খানের মায়ের দিকের ফার্স্ট কাজিন, অর্থাৎ খালা বা মাসির মেয়ে। এর মানে, শ্বশুরবাড়ির মানুষদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, এমন সংসারে অন্তত নিরাপত্তা ও সহানুভূতির অভাব থাকার কথা নয়।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বিয়ের চৌদ্দ বছর পর, ১৯৪৭ সালে—যে বছর দেশ স্বাধীন হয়—আহমেদ খান দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। তখন শাহ বানোর বয়স মাত্র উনত্রিশ। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, দ্বিতীয় স্ত্রীও ছিলেন তাঁর খালাতো বোন । পরিবার এই বিয়েতে সম্মতি দিয়েছিল। উনত্রিশ বছর বয়সী, দুই সন্তানের মা এবং তৃতীয় সন্তানের গর্ভবতী শাহ বানোর পক্ষে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো পরিস্থিতি বা সাহস—কোনোটাই ছিল না। এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে পিতৃতন্ত্রের নীরব কিন্তু নির্মম শক্তি, যেখানে নারীর মতামত বা সম্মতির কোনো মূল্য নেই।

বহু বছর সংসার করার পর জীবনের শেষ দিকে এসে শাহ বানো সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় পড়েন। ষাটের কাছাকাছি বয়স, বৃদ্ধ বা মৃত বাবা-মা, কোনো আয় নেই, কোনো সম্পত্তি নেই, শিক্ষার সুযোগ নেই, মেহের বাবদ মাত্র দুই হাজার টাকা—এই অবস্থায় তাঁর সামনে প্রশ্ন ছিল একটাই: তিনি কোথায় যাবেন? কীভাবে সম্মানের সঙ্গে বাঁচবেন? সন্তানের দয়ার ওপর নির্ভর করা ছাড়া কি তাঁর আর কোনো পথ ছিল? এই প্রশ্নগুলো একান্ত ব্যক্তিগত হলেও আসলে এগুলো রাষ্ট্র ও আইনের কাছে করা নাগরিকের মৌলিক প্রশ্ন। ধর্ম যাই হোক না কেন, একজন মানুষ কীভাবে বাঁচবে—এই প্রশ্ন করার অধিকার সবার আছে।

এই প্রশ্ন নিয়েই শাহ বানো প্রথমে কোর্টের দ্বারস্থ হন। পেশায় উকিল মহম্মদ আহমেদ খানের কাছে এটি ছিল শুধু একটি পারিবারিক বিষয় নয়, তাঁর পুরুষ অহংকারে বড় আঘাত। তিনি জানতেন, ইসলামিক পারিবারিক আইন তাঁর পক্ষেই রয়েছে। তাই তিনি নিজেই আদালতে নিজের পক্ষে সওয়াল করেন। অন্যদিকে, শাহ বানোর পক্ষের উকিল সচেতনভাবেই মামলাটিকে সরাসরি পারিবারিক আইনের মধ্যে আটকে দেননি। তিনি জানতেন, সেখানে শাহ বানোর কোনো সুবিধা নেই। তিনি যুক্তি দেন, যেহেতু তাৎক্ষণিক তিন তালাক ইসলামের মৌলিক নীতির সঙ্গেও পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাই এই তালাক বৈধ নয়। আর তালাক বৈধ না হলে ভরণপোষণ না দেওয়া ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে।

এই যুক্তিতেই লোয়ার কোর্ট শাহ বানোর পক্ষে রায় দেয় এবং মাসে ৭৯ টাকা ভরণপোষণ ধার্য করে। আহমেদ খান হাই কোর্টে আপিল করেন, কিন্তু সেখানেও শাহ বানো জেতেন, এবং ভরণপোষণের অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় মাসে ১৭৯ টাকা। এরপর আহমেদ খান সুপ্রিম কোর্টে যান। সুপ্রিম কোর্টে তাঁর যুক্তি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক—তিনি বলেন, মুসলিমরা নাকি সব সুবিধা ছেড়ে শরিয়া বেছে নিয়েছে, এবং শরিয়ায় কোনো আপস করা মানেই ইসলাম বিপদের মুখে পড়া। কিন্তু এই যুক্তির ভেতরের দ্বিচারিতা কেউ খুব জোর দিয়ে প্রশ্ন করেনি। ভারতীয় মুসলিমরা ফৌজদারি আইন, ব্যাংক ব্যবস্থা, সুদের লেনদেন—সবই রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে মেনে চলেন। তাহলে শরিয়ার কঠোরতা কেবল তালাক ও বহুবিবাহের ক্ষেত্রেই কেন এত জরুরি হয়ে ওঠে?

১৯৭৮ থেকে ১৯৮৫—টানা সাত বছর আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত শাহ বানোর পক্ষেই রায় দেয়। আদালত স্পষ্ট করে বলে, তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীও ভরণপোষণের অধিকারী এবং সংবিধান ধর্মীয় আইনের ঊর্ধ্বে। এমনকি আদালত কোরআনের ব্যাখ্যা দিয়েও দেখায়, নারীর দায়িত্ব নেওয়া ইসলামের বিরোধী নয়। আদালত তাদের রায়ের শেষে অভিন্ন দেওয়ানি আইন বা ইউনিফর্ম সিভিল কোডের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করে। এই রায় নারী অধিকারের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে ওঠে ভয়ংকর রাজনৈতিক সংঘাতের সূচনা। ধর্মীয় পিতৃতন্ত্র সংগঠিতভাবে এর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডসহ বিভিন্ন কট্টর নেতৃত্ব দাবি করে, রাষ্ট্র মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপ করছে। একজন নারীর ভরণপোষণের প্রশ্নকে তারা ধর্মীয় পরিচয় ও সম্প্রদায়ের সম্মানের প্রশ্নে পরিণত করে। এখানে ধর্ম ন্যায়বিচারের পথ দেখায় না; বরং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা রক্ষার অস্ত্র হয়ে ওঠে।

এই সময় সবচেয়ে হতাশাজনক ভূমিকা নেয় তথাকথিত লিবারাল ও প্রগতিশীল সমাজ। অনেকেই নারীর অধিকারের কথা মুখে বললেও, শাহ বানোর প্রশ্নে নীরব থাকেন। যুক্তি দেওয়া হয়—সংখ্যালঘু সমাজের ভেতরের সমালোচনা করলে ডানপন্থীরা লাভবান হবে। ফলে একজন নারীর ন্যায়বিচারকে সচেতনভাবেই পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়। এই নীরবতা মোটেও নিরপেক্ষ ছিল না; এটি কার্যত পিতৃতন্ত্রকেই শক্তিশালী করেছে।
এই নীরবতার রাজনৈতিক পরিণতি আসে ১৯৮৬ সালে। রাজীব গান্ধীর সরকার সংসদে মুসলিম নারী (বিবাহবিচ্ছেদে অধিকার সুরক্ষা) আইন পাশ করে সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যত বাতিল করে দেয়। তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম নারীর ভরণপোষণ সীমিত করে দেওয়া হয় শুধু ইদ্দতকাল পর্যন্ত। রাষ্ট্র নিজেই জানিয়ে দেয়, একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের নারী সংবিধানের সাধারণ সুরক্ষা পাবে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শাহ বানোর জীবনে। তিনি দারিদ্র্য ও অসুস্থতার মধ্যে দিন কাটান এবং ১৯৯২ সালে মৃত্যুবরণ করেন—প্রায় বিস্মৃত অবস্থায়।

২০০১ সালে সুপ্রিম কোর্ট আবার ব্যাখ্যা দেয় যে ১৯৮৬ সালের আইন অনুযায়ীও ‘ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত’ ভরণপোষণ আজীবনের জন্য দিতে হবে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত আদালত আবার শাহ বানোর দাবিকেই স্বীকৃতি দেয়, যদিও তা আসে তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরে। ২০১৭ সালে তাৎক্ষণিক তিন তালাক অসাংবিধানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে শাহ বানোর লড়াই নতুন করে অর্থ পায়। শায়রা বানোসহ বহু নারীর সংগ্রাম প্রমাণ করে, ধর্মের নামে নারীর মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। শাহ বানোর জীবন একটি কঠিন শিক্ষা দেয়। ধর্মীয় পিতৃতন্ত্র যেমন ভয়ংকর, তেমনি ভয়ংকর হলো লিবারাল নীরবতা। একপক্ষ প্রকাশ্যে দমন করে, অন্যপক্ষ চুপ থেকে পরিত্যাগ করে। একজন অশিক্ষিত বৃদ্ধা নারী যদি সাত বছর ধরে অপমান, ঘৃণা ও একঘরে করে দেওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন, তবে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো সমাজেরই চুপ থাকার অধিকার নেই। সেই কারণেই শাহ বানো আজও শুধু ইতিহাস নন—তিনি আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!