২৩ জানুয়ারি ২০২৬। বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে শনিবার মধ্যরাতে দাফন হয়েছে যশোর কারাগারে বন্দি থাকা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ও তাদের নয় মাস বয়সী শিশু সন্তান সেজাদ হাসানের। কিন্তু এই দাফনের আগেই এমন একটি দৃশ্য বাংলাদেশ দেখেছে, যা শুধু রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা নয়—মানবিকতার পরাজয়ের এক নির্মম দলিল হয়ে থাকবে। শিশুটির জীবনের শেষ যাত্রা শুরু হয়েছে বাবার সঙ্গে ‘শেষ দেখা’ দিয়ে। কিন্তু সেই দেখা কোনো কোলের মধ্যে হয়নি, কোনো বুকের উষ্ণতায় হয়নি—হয়েছে যশোর কারাগারের গেইটে, লাশ হয়ে। বাগেরহাট : ‘ মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে !’
ঘটনাটি সামনে আসার পর সারাদেশে ক্ষোভ, অসন্তোষ আর প্রশ্নের ঝড় উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য পোস্ট, ফটোকার্ড ও লেখায় মানুষের জমে থাকা যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে। অনেকেই এটিকে ‘অমানবিক রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, অতীত সরকারগুলোর আমলেও এমন বা এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অতীতের অন্যায় বর্তমানের অন্যায়ের দায় কমায় না। বরং প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার একটি ধারাবাহিকতা আজও বহাল রয়েছে।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুয়েল হাসান সাদ্দামের ভাই মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম জানান, তাঁর ভাই শিশুটিকে জীবিত অবস্থায় কোলে নিতে পারেননি বলে কারাগারের গেইটেও আর কোলে নেননি। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন—“আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস।” এই একটি বাক্যই বোঝাতে যথেষ্ট, কীভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত একজন মানুষকে আজীবনের অপরাধবোধে ঠেলে দিতে পারে। সেই মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন মোট নয়জন স্বজন। তাঁদের চোখের সামনে একজন পিতা নিজের সন্তানের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও কিছুই করতে পারেননি।
এই করুণ দৃশ্যের পেছনের প্রশাসনিক বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে প্যারোলের আবেদন নিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, সেই আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ না করেই তাঁদের কারা প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে বাগেরহাট কারা প্রশাসন থেকেই পরিবারকে জানানো হয়, লাশ যশোর কারাগারের গেইটে নিলে বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দামের সঙ্গে শেষ দেখা করানো যাবে। পরিবার সেই আশ্বাসে বিশ্বাস করে লাশ নিয়ে যশোর যায়।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন দাবি করেন, পরিবারকে বোঝানো হয়েছিল যে যশোরের জেল সুপার বা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হবে। অন্যদিকে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, তাঁরা এ ধরনের কোনো আবেদনই পাননি। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রাষ্ট্রীয় দায় এড়ানোর নগ্ন চিত্রই সামনে আনে। আবেদনের প্রক্রিয়ার নামে সময় নষ্ট করে পরিবারকে শেষ পর্যন্ত কারাগারের গেইটে লাশ নিয়ে যেতে বলা—এটি কেবল প্রশাসনিক বিভ্রান্তি নয়, বরং একটি অমানবিক রাষ্ট্রীয় আচরণ।
সেজাদ হাসানের জন্ম হয়েছিল যখন তার বাবা কারাগারে। বাবার কোলে মাথা রাখা, বাবার আঙুল ধরে হাঁটা শেখা—এই মৌলিক মানবিক অভিজ্ঞতাগুলোর কোনোটিই সে পায়নি। দীর্ঘদিন স্বামী কারাবন্দী থাকায় কানিজ সুবর্ণা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। সেই মানসিক বিপর্যয় থেকেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তার আগে নিজের শিশুকেও হত্যা করেন। এই মৃত্যু কি শুধুই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, নাকি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার প্রত্যক্ষ ফল—এই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হয় বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে। গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক মামলায় অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হয়েছে। সরকার বদলালেও এই সংস্কৃতি বদলায়নি। রাজনৈতিক মামলায় একজন মানুষ কারাগারে গেলে তার সঙ্গে বন্দি হয় পুরো পরিবার। স্ত্রী অপেক্ষায় থাকে, সন্তান বড় হয় বাবাকে ছাড়া। অথচ যাদের কারণে এসব মামলা হয়, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ নিরাপদে বিদেশে বা ক্ষমতার আশপাশে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটায়।
জুয়েল হাসানের মামলার সব তথ্য নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বরের যে মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে, সেই সময় তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে ছিলেন এবং পাসপোর্টে তার প্রমাণ রয়েছে। যদি এই তথ্য সত্য হয়, তবে এটি গায়েবি মামলারই আরেকটি উদাহরণ। অতীতে বিরোধী দল দমনে যে কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে, আজ তা নতুন বাস্তবতায় আবারও ফিরে আসছে—এমন সন্দেহ অমূলক নয়।
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে প্যারোল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে। ২০১৬ সালের ১ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্যারোল মুক্তি–সংক্রান্ত নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, বন্দীর স্ত্রী বা সন্তানের মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। জুয়েলের মামলাটি বাগেরহাটের হওয়ায় আইন অনুযায়ী বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকই ছিলেন প্যারোল দেওয়ার এখতিয়ারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। যশোরে আবেদন করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই, কারণ যশোরের কাছে মামলার নথিপত্র নেই।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের তথ্য অনুযায়ী, প্যারোল দেওয়ার আগে জেলা প্রশাসক পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের রিপোর্ট চেয়েছিলেন। এসবি নেগেটিভ রিপোর্ট দেওয়ায় প্যারোল দেওয়া হয়নি। অথচ প্যারোল দেওয়ার ক্ষেত্রে এসবি রিপোর্ট নেওয়ার কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। এটি স্পষ্ট করে দেয়, প্রশাসন মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অনুমতির অপেক্ষায় ছিল।
এই ঘটনার পর ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়েছে। যশোর ডিসি অফিস থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে বলা হয়, তাঁদের কাছে প্যারোলের কোনো আবেদন আসেনি। এতে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। এরই মধ্যে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে ফোন করে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে তাঁদের দাপ্তরিক হোয়াটসঅ্যাপে গালাগাল ও হুমকি দেওয়া অভিযোগ প্রশাসন থেকে উঠেছে। তবে রোব এ বিষয়ে কোনো মামলা বা জিডি হয়নি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা এটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘বিব্রতকর’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং দুঃখজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন।
এখানেই প্রশ্নটা আরও গভীর হয়। একটি হৃদয়বিদারক ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি ঘৃণা ছড়ানো? নাকি এই প্রশ্ন তোলাই গণতান্ত্রিক সমাজের ন্যূনতম দায়িত্ব? প্যারোল কোনো করুণা নয়, এটি একটি স্বীকৃত মানবিক অধিকার। সেই অধিকার প্রয়োগ না করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র তার নিষ্ঠুর মুখটাই সামনে এনেছে।
একদিন হয়তো জুয়েল হাসান মুক্তি পাবেন। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—তার সন্তান—আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এই ক্ষত কোনো জামিনে, কোনো রায়ে পূরণ হবে না। আজ যে সেজাদ চলে গেছে, সে শুধু একটি পরিবারের সন্তান ছিল না। সে ছিল এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। প্রশ্ন থেকে যায়—আর কত সেজাদ গেলে আমরা সত্যিই জাগব ? সাদামের সাথে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদ কে শেখ হাসিনার শাসনের সাফাই হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা মূল ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার শামিল।