বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভরসা তৈরি পোশাক শিল্প । দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ আসে এই একটি খাত থেকে। কোটি মানুষের জীবিকা, বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরতলির নারীদের কর্মসংস্থান সরাসরি নির্ভর করে এই শিল্পের ওপর। এই শিল্প শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতারও বড় ভিত্তি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে দেশের বস্ত্রখাত এক জটিল সংকটে পড়েছে। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে সুতা শিল্প ও গার্মেন্টস শিল্পের দ্বন্দ্ব, ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠা ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বয়ান। প্রসঙ্গত, ইইউ চুক্তি কার্যকর হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ২৭টি দেশে ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্য বিনা শুল্কে রফতানি করা যাবে। আবার ইউরোপের অন্য দেশগুলির পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও কোনও শুল্ক আরোপ করবে না নয়াদিল্লি। এই চুক্তির ফলে রফতানিযোগ্য ২৫ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে কোনও শুল্ক আরোপ হচ্ছে না। এর ফলে উপকৃত হবেন ভারত এবং ইউরোপের ওই দেশগুলিতে থাকা মোট ১৯০ কোটি ক্রেতা।
বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর নেতারা বলছেন, সরকার থেকে প্রণোদনা পাওয়ায় ভারতের স্পিনিং মিলগুলো বাংলাদেশে সস্তায় সুতা রপ্তানি করছে। এতে বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর বিক্রি কমছে। বন্ধ হচ্ছে মিল। অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা বলছেন, ভারতীয় সুতায় বিধিনিষেধ দিলে পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে। ভারত থেকে আমদানি হওয়া সুতা ব্যবহার করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প। ৩০ কার্ডের এক কেজি সুতা বাংলাদেশি মিলগুলো বিক্রি করে প্রায় ৩ মার্কিন ডলারে, যা ভারতীয় উৎপাদকেরা বিক্রি করে ২ ডলার ৬০ সেন্টে। মূলত কম দামের কারণেই বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ভারতের সুতা আমদানি করেন।
বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প তিনটি ধাপে গঠিত—সুতা উৎপাদন, কাপড় তৈরি এবং সবশেষে তৈরি পোশাক। এর মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কম খরচে মানসম্মত পোশাক সরবরাহ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। এই সাফল্যের বড় ভিত্তি ছিল কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়। বিশেষ করে সুতা আমদানির ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের জন্য ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস। কিন্তু এই আমদানি নির্ভরতার ফলেই দেশীয় সুতা ও বস্ত্রকলগুলো সংকটে পড়েছে বলে মিল মালিকদের দাবি। তাঁদের মতে, ভারতীয় সস্তা সুতা বাজার দখল করে নেওয়ায় দেশীয় মিলের উৎপাদিত সুতা বিক্রি হচ্ছে না। গুদামে জমে আছে বিপুল পরিমাণ সুতা। গত দেড় বছরে বহু স্পিনিং ও বস্ত্রকল বন্ধ হয়েছে, কর্মহীন হয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। এই বাস্তবতায় মিলমালিকদের পক্ষ থেকে ভারত থেকে সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা বাতিল ও শুল্ক আরোপের দাবি জোরালো হয়েছে।
তবে এই দাবির বিপরীত দিকটি তৈরি পোশাক শিল্পের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বৈশ্বিক মন্দা, অর্ডার কমে যাওয়া, ক্রেতাদের মূল্য ছাঁটাই এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ—সব মিলিয়ে গার্মেন্টস শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কাঁচামালের দাম সামান্য বাড়লেও তা বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে রাজি নয়; ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লে অর্ডার সহজেই ভিয়েতনাম, ভারত বা অন্য প্রতিযোগী দেশে সরে যেতে পারে। ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ হলে স্বল্পমেয়াদে দেশীয় সুতা ও বস্ত্র শিল্প কিছুটা লাভবান হতে পারে—এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। দেশীয় মিলের বিক্রি বাড়বে, কিছু বন্ধ কারখানা চালু হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে গার্মেন্টস শিল্প মারাত্মক চাপে পড়বে। দেশীয় সুতার দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর।
এখানেই উঠে আসে একটি মৌলিক প্রশ্ন—দেশে এত স্পিনিং মিল থাকার পরও কেন গার্মেন্টস শিল্প পুরোপুরি দেশীয় সুতার ওপর নির্ভর করতে পারছে না। এর প্রধান কারণ উৎপাদন ব্যয় ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ এবং নগদ সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশীয় মিলগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। ফলে আমদানি বন্ধ করা সহজ সমাধান নয়, বরং এটি সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সুতা আমদানি বন্ধের দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্যও জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, এই দাবির পেছনে কেবল শিল্পস্বার্থ নয়, বরং অন্ধ ভারতবিরোধী মনোভাব এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাবও কাজ করছে। বিশেষ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু রাজনৈতিক মহলে ভারতবিরোধী বক্তব্য আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
এই বক্তব্যের মধ্যে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের চেয়ে আবেগ ও রাজনৈতিক অবস্থান বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুতা আমদানি বন্ধের দাবি অর্থনৈতিক যুক্তির বদলে ভারতকে ‘চাপ দেওয়ার হাতিয়ার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা বিবর্জিত এবং দেশের রপ্তানি খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু রাজনৈতিক বক্তৃতা ও অনলাইন প্রচারে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা ‘সেভেন সিস্টার’ রাজ্যগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকির মতো বক্তব্য উঠে আসছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বক্তব্য কেবল অযৌক্তিকই নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। এই সম্পর্কের অবনতি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিল্প, বিনিয়োগ এবং রপ্তানিতে।
এই অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি। এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় তৈরি পোশাক ইউরোপে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার হওয়ায় এর প্রভাব হবে সরাসরি ও গভীর। ভারতের শক্তি হলো তাদের সমন্বিত বস্ত্রশিল্প—সুতা, কাপড় ও পোশাক সবই তারা দেশেই উৎপাদন করে। শুল্ক সুবিধা পেলে তারা কম খরচে ইউরোপে পোশাক সরবরাহ করতে পারবে। একই সময়ে বাংলাদেশ যদি কাঁচামালের দিক থেকে আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক আবেগের কারণে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়বে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল, বিদ্যুৎ সংকট এবং বিনিয়োগ হ্রাস। সব মিলিয়ে গার্মেন্টস শিল্প এখন বহুমুখী চাপে রয়েছে।
বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করতে যাচ্ছে। উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে হলে উৎপাদনে অন্তত ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজন দেখাতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী দেশীয় সুতা ও বস্ত্র শিল্প অপরিহার্য। তবে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি না করেই আমদানি বন্ধ করা হলে রপ্তানি আরও ঝুঁকিতে পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের মূল কারণ খণ্ডিত নীতিনির্ধারণ এবং আবেগনির্ভর রাজনৈতিক অবস্থান। সুতা, বস্ত্র ও গার্মেন্টস—এই তিনটি খাত পরস্পরনির্ভর হলেও নীতিতে তাদের আলাদা করে দেখা হচ্ছে। এক খাতকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য খাতকে দুর্বল করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ বা বিধি নিষেধ আরোপ করলে দেশের সুতাকল গুলো উপকৃত হবে তা স্পষ্ট নয়। সুতা উৎপাদনের বড় উপাদান তুলা। বাংলাদেশের পর্যাপ্ত তুলা চাষ হয় না , তুলা চাযের পর্যাপ্ত জমিও নাই। তুলা চাষের জন্য জমি বরাদ্দের অর্থ হচ্ছে ফসলি জমি কমে যাওয়া। এক সমস্যা সমাধানে নতুন সমস্যার দরজা খুলে যাবে। ভারত থেকে সুতা আমদানিতে শুল্ক মুক্ত – বন্ড ব্যাবস্থার সুবিধাভোগী হচ্ছে গার্মেন্টস শিল্প। ‘সুতা ও তৈরী পোশাক—দুটিই দেশের বড় খাত। স্থানীয় মিল সুতা উৎপাদনে যেটুকু সক্ষমতা অর্জন করেছে তা নষ্ট হয়ে গেলে তারা আর দাঁড়াতে পারবে না। সুতা আমদানিতে বন্ড-সুবিধা বাতিল করলে তার প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এপ্রিল ২০২৫ সালে বস্ত্রকল মালিকদের অনুরোধে স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ পদক্ষেপের পর স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে তিন দফায় বিধিনিষেধ দিয়েছে ভারত। তাতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশ।বাংলাদেশের বস্ত্রখাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। এখানে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হবে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যমে। এই মুহূর্তে সংঘাত, সাম্প্রদায়িকতা বা অন্ধ ভারতবিরোধিতা নয়—প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, সমন্বিত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। অর্থনীতির স্বার্থকে রাজনৈতিক আবেগের ঊর্ধ্বে রাখতেই হবে, নইলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
তথ্য সূত্র:
১.ভারত থেকে সুতা আমদানিতে বন্ড–সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১৮ জানুয়ারি ২০২৬। প্রথম আলো।
২. ভারত থেকে সুতা আমদানিতে শুল্কারোপে তাড়াহুড়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২১ জানুয়ারি ২০২৬। প্রথম আলো।
৩. সুতা আমদানিতে শুল্কারোপ চান না তৈরি পোশাকশিল্প মালিকেরা। ২০ জানুয়ারি ২০২৬। প্রথম আলো।
৪. ভারতীয় সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ নিয়ে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা মুখোমুখি অবস্থানে। ০৯ জানুয়ারি ২০২৬। প্রথম আলো।
৫.ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্যচুক্তিকে কেন ‘সব চুক্তির জননী’ বলা হচ্ছে? এর ফলে দেশে সস্তা হবে কী কী পণ্য? ২৭ জানুয়ারি। ২০২৬। আনন্দবাজার।







