‘বৈসাবি’ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিসত্তার বর্ষবরণ উৎসবগুলোর একটি সমন্বিত নাম। শুরুতে ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু—এই তিন প্রধান উৎসবের আদ্যক্ষর থেকে শব্দটি গঠিত হলেও পরে আরও কয়েকটি জনগোষ্ঠীর উৎসব এতে ধারণাগতভাবে যুক্ত হয়ে এটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। নব্বইয়ের দশকে পাহাড়ি ছাত্র ও যুবসমাজের উদ্যোগে ‘বৈসাবি’ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তবে এর সূচনা আরও আগে—১৯৮৭ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজের একটি দেয়ালিকায় প্রথম ‘বৈসাবি’ শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়।
এই নামটি কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনার ফল নয়; বরং সামরিক শাসনের দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং পারস্পরিক সংহতি গড়ে তোলার প্রয়াস থেকেই এটি উদ্ভূত। আশির দশকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত থাকায় পাহাড়ি তরুণ-ছাত্রসমাজ সংস্কৃতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু, বিষু, বিহু, সাংলান, সাংক্রাই, সাংগ্রাইং, চাংক্রান—প্রতিটি উৎসবই আলাদা জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, জীবনধারা ও আত্মপরিচয়ের বাহক। এই বহুত্বই পাহাড়ি সমাজের শক্তি, এবং ‘বৈসাবি’ সেই ভিন্নতাকে একত্রে ধারণ করার একটি প্রতীকী নাম।
চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনজুড়ে উৎসবটি পালিত হয়। ভোরে ফুল সংগ্রহ, ঘরদোর সাজানো, নদী বা ঝর্ণার ধারে প্রার্থনা, প্রভাতফেরী, আত্মীয়-প্রতিবেশীর সঙ্গে কুশল বিনিময়—এসব মিলিয়ে এটি একটি সর্বজনীন সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। গ্রামাঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, শহরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, নাটক ও সংগীত পরিবেশন এই সময়ের প্রধান আকর্ষণ। ‘বিজু ফুল’ এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক—চৈত্রের শুরুতে এর ফোটা বৈসাবির আগমনী বার্তা বহন করে। ফুলটি দিয়ে মালা গেঁথে ঘর সাজানো হয়, যা প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
সময়ের সঙ্গে ‘বৈসাবি’ শব্দটি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কেউ কেউ এর ঐতিহাসিকতা প্রশ্নবিদ্ধ করলেও বাস্তবতা হলো—এটি এখন ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়চিহ্ন। বরং এই বিতর্ক দেখায়, সংস্কৃতির ক্ষেত্রটিও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। তবু সাধারণ মানুষের চর্চায় ‘বৈসাবি’ আজ সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলোর অধিকার প্রসঙ্গে এই উৎসবের তাৎপর্য আরও গভীর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে স্বীকৃতি না দেওয়ার ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ, ভূমি-সংকট, এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে প্রভাবিত করে। জিয়াউর রহমানের আমলে প্রস্তাবিত ‘উপদ্রুত এলাকা’ বিলের মতো উদ্যোগগুলো এই নিয়ন্ত্রণকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যেখানে নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল স্পষ্ট।
এই প্রেক্ষাপটে বৈসাবি কেবল উৎসব নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক অধিকারচর্চা। নিজের ভাষা, ঐতিহ্য, উৎসব ও সামাজিক রীতিকে টিকিয়ে রাখা একটি মৌলিক মানবাধিকার। বৈসাবির মাধ্যমে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সেই অধিকারকে দৃশ্যমান করে, নিজেদের অস্তিত্ব ও পরিচয়কে পুনর্নিশ্চিত করে। রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং ন্যায্য রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব—এই দাবিগুলোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও এমন উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বৈসাবিকে ১৯৬০-এর দশকে ছায়ানটের বর্ষবরণ আয়োজনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পাকিস্তান আমলে ছায়ানট যে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করেছিল, তা ছিল সাংস্কৃতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সংগীত, সংস্কৃতি ও সমবেত চর্চার মধ্য দিয়ে সেখানে একটি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। একইভাবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈসাবির বিকাশকে দেখা যায় সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ধারাবাহিকতায়—যেখানে উৎসব কেবল আনন্দের নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার ভাষা।