বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১২ অপরাহ্ন

চৈত্র সংক্রান্তি না পহেলা বৈশাখ—বিতর্কের মাঝে আকবর ও দ্বীন-ই-ইলাহী ঘিরে নতুন আলোচনা

সমসমাজ ডেস্ক
মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ একই দিনে উদযাপন ঘিরে বাংলাদেশে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলা পঞ্জিকার ভিন্ন গণনার কারণে একদিকে কোথাও চৈত্র সংক্রান্তি পালিত হচ্ছে, অন্যদিকে একই সময় পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হচ্ছে—যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এটিকে সাংস্কৃতিক বিভাজনের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে পঞ্জিকা সংস্কারের স্বাভাবিক ফল বলেও মনে করছেন। এই পঞ্জিকা পরিবর্তনের পেছনে ভাষাবিদ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ -এর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির ভূমিকার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে জেনারেল এরশাদ ১৪ এপ্রিলকে চিরস্থায়ী বাংলা নতুন বছর নির্ধারণ করেছেন। সেই থেকে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায় পৃথক দিনে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়।

ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতে ইসলামী iসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি বাংলা নববর্ষ, রবীন্দ্রসংগীত এবং বৈশাখী উৎসবকে “অইসলামিক” বা “হিন্দু সংস্কৃতির অংশ” হিসেবে চিহ্নিত করে বিরোধিতা করে এসেছে। তাদের মতে, এ ধরনের উৎসবের সঙ্গে যুক্ত অনেক আচার-অনুষ্ঠান ইসলামের বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে রমনা বটমূলে সংগীতের মাধ্যমে নববর্ষ বরণের মতো আয়োজন নিয়ে তাদের আপত্তি দীর্ঘদিনের।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ছাত্র শিবিরের পক্ষ থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন এবং সেই প্রেক্ষিতে মুঘল সম্রাট Aআকবর -এর স্মৃতিকে সামনে আনার উদ্যোগ একটি ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসলামী ছাত্র শিবির ” বৈশাখ ই আকবর ” উদযাপন করছে। জামায়াতে ইসলামী এই প্রথম বারের মত রাজধানীতে আয়োজিত বৈশাখী শোভাযাত্রায় দেশীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান তুলে ধরে। যার মধ্যে ছিল ফল, মাছ, পালকি, গ্রামীণ জীবনের প্রতীকী উপস্থাপন এবং শিশুদের অংশগ্রহণ। এই আয়োজনকে কেউ সাংস্কৃতিক অভিযোজন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন।

আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে সম্রাট আকবরের ধর্মীয় দর্শন। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও আকবর তার শাসনামলে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমন্বয়ের এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৫৮২ সালে তিনি “দ্বীন-ই-ইলাহী” নামে একটি নতুন ধর্মীয় মতবাদ প্রবর্তন করেন। এটি মূলত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ছিল না; বরং একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দর্শন, যার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে ঐক্য স্থাপন।

দ্বীন-ই-ইলাহীর কাঠামোয় ইসলাম, হিন্দুধর্ম, জৈনধর্ম, খ্রিস্টধর্ম এবং জরথুষ্ট্রধর্মের বিভিন্ন উপাদানকে একত্রিত করার চেষ্টা করা হয়। এর মূল ভিত্তি ছিল “সুলহ-ই-কুল” বা সর্বজনীন শান্তি—যেখানে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সহনশীলতা ও সম্মানের ভিত্তিতে সহাবস্থান করবে। এতে একেশ্বরবাদ, নৈতিক জীবনযাপন, দয়া, অহিংসা, আত্মশুদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আকবর তার প্রশাসনিক নীতিতেও এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটান; বিশেষ করে অমুসলিমদের ওপর আরোপিত জিজিয়া কর বাতিল করা তার ধর্মীয় সহনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

আকবরের মতবাদ সমসাময়িক ইসলামি আলেমদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। অনেকেই এটিকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দেন এবং আকবরকে ধর্মত্যাগী বলেও উল্লেখ করেন। বাস্তবে দ্বীন-ই-ইলাহীর অনুসারী সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত, প্রধানত আকবরের দরবারকেন্দ্রিক কিছু অভিজাত ব্যক্তি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আকবরের মৃত্যুর পর এই মতবাদ দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে কোনো সংগঠিত ধর্মীয় রূপ নিতে পারেনি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামী ছাত্র শিবির ও জামায়াতে ইসলামী বৈশাখ উদযাপনের সঙ্গে আকবরের স্মৃতিকে যুক্ত করায় একটি নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে ঐতিহাসিকভাবে বৈশাখবিরোধী অবস্থান, অন্যদিকে বর্তমানের অংশগ্রহণ—এই দ্বৈত অবস্থানকে কেউ পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে আদর্শগত অসঙ্গতি হিসেবে সমালোচনা করছেন। চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ একই সময়ে পালনের প্রশ্ন, পঞ্জিকার পার্থক্য এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অবস্থানের এই জটিল সমীকরণ বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরির থেকে যোজন যোজন দূরে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!