সাভারের রানা প্লাজা ধসের এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বিচার ও শ্রমিক নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই গভীর বঞ্চনা ও ধীরগতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ শিল্প–দুর্ঘটনায় এক হাজারের বেশি পোশাকশ্রমিক নিহত হন এবং আরও বহু শ্রমিক গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পরও বিচারপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি—এটি দেশের বিচারব্যবস্থা ও শ্রমিক অধিকার প্রশ্নে এক গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হত্যা মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৯৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দীর্ঘ ১২ বছরে এই অগ্রগতি অত্যন্ত সীমিত। বিচারকাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারছে না। এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমাগত বাড়ছে। তাঁরা মনে করেন, যাঁদের অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে এত প্রাণহানি ঘটেছে, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ন্যায়বিচার থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত একাধিক মামলা থাকলেও সেগুলোর অগ্রগতি সমানভাবে শ্লথ। তদন্ত শেষ করতে বিলম্ব, প্রশাসনিক অনুমোদনের জটিলতা, উচ্চ আদালতে মামলার স্থগিতাদেশ—এসব কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি কয়েক বছর ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। বর্তমানে কিছু অগ্রগতি হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিচারের পাশাপাশি শ্রমিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক কারখানাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমদিকে কিছু অগ্রগতি হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গতি কমে এসেছে। বর্তমানে হাজার হাজার কারখানার মধ্যে মাত্র একটি অংশে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। অনেক কারখানায় এখনো বৈদ্যুতিক, অগ্নি ও কাঠামোগত ঝুঁকি রয়ে গেছে।
এই ধীরগতির পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক চাপ কমে যাওয়ায় অনেক মালিকের মধ্যে নিরাপত্তা সংস্কারে আগ্রহ কমেছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারছে না। তদারকি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতিও বড় একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা সংস্কারের কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, যদি রানা প্লাজা ঘটনার পর দায়ীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো, তাহলে অন্যান্য কারখানা মালিকরা সতর্ক হতেন এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু বিচার বিলম্বিত হওয়ায় সেই প্রতিরোধমূলক প্রভাব তৈরি হয়নি। এর ফলে শ্রমিকরা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে মালিকপক্ষের দাবি, অধিকাংশ কারখানায় বড় ধরনের ঝুঁকি নেই এবং অনেক ক্ষেত্রে সংস্কারকাজ প্রায় সম্পন্ন। তবে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সব কারখানায় সমানভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে ঝুঁকি বেশি রয়ে গেছে।
রানা প্লাজা ধস শুধু একটি দুর্ঘটনা ছিল না; এটি বাংলাদেশের শিল্পখাতের কাঠামোগত দুর্বলতা, শ্রমিক অবহেলা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছিল। এক যুগ পরও সেই শিক্ষা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং নিরাপত্তা সংস্কারের ধীরগতি প্রমাণ করে, শ্রমিকদের জীবন এখনো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ন্যায়বিচার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কতটা আন্তরিক। রানা প্লাজার মতো ট্র্যাজেডি যাতে আর না ঘটে, তার জন্য প্রয়োজন দ্রুত বিচার, কঠোর জবাবদিহি এবং বাস্তবভিত্তিক নিরাপত্তা সংস্কার। অন্যথায়, এই ঘটনা কেবল একটি স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, কিন্তু শ্রমিকদের বঞ্চনা ও ঝুঁকি থেকে যাবে আগের মতোই।