রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৬ পূর্বাহ্ন

বিভেদের ছায়ায় রাষ্ট্র: বৈসাবি ও বৈশাখের অমলিন আখ্যান

যমুনা রহমান
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ৯ এপ্রিল ২০২৬ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আর একটি সম্মিলিত নাম হিসেবে উদ্‌যাপিত হবে না; বরং প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব নাম ও রীতিতে নববর্ষ পালন করবে—যেমন বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান ও চাংলান। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে বৈষম্যের সুযোগ কমবে এবং প্রতিটি সম্প্রদায়ের স্বকীয়তা বজায় থাকবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যারা বৈসাবিকে একটি সামষ্টিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখেন তাদের মধ্যে।

বৈসাবি নামটির উৎপত্তি ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে, যেখানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে একটি সম্মিলিত পরিচয় নির্মাণ করা হয়েছিল। যদিও সব সম্প্রদায়ের উৎসবের নাম এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তবুও সময়ের সাথে এটি একটি সার্বজনীন সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়। এই সার্বজনীনতাই বৈসাবির শক্তি—যেখানে ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসরে মিলিত হয়। সমালোচকদের মতে, এই ঐক্যকে ভেঙে পৃথকীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হলে তা শাসকগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে, কারণ বিভক্ত সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।

বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন নিয়েও রাষ্ট্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক-ধর্মীয় গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা-কে ঘিরে গত এক দশকে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এই প্রবণতারই অংশ। ১৯৮৯ সালে ঢাকায় শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা মূলত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে এবং ১৯৯০-এর গণআন্দোলনের সময় ‘প্রতিবাদের এই প্রতীকি ভাষা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়। একইভাবে, বৈসাবির সূচনাও ১৯৮৭-সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, যা শুধু একটি উৎসব নয়, বরং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ও পরিচয় নির্মাণের অংশ ছিল। এই দুই উৎসব—পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা এবং বৈসাবি—উভয়ই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জন্ম নিয়ে পরবর্তীতে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।

তবে সময়ের সাথে সাথে এই বৈশাখ উদযাপনকে ‘হিন্দুয়ানি’ বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে বিতর্ক তৈরি করার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘হিন্দুয়ানি’ আখ্যা দেওয়া, বা এর নাম পরিবর্তনের দাবি তোলা—এসব প্রচারণা উৎসবের অন্তর্নিহিত অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। একইভাবে পান্তা-ইলিশ খাওয়া নিয়েও অপপ্রচার চালানো হয়েছে, যা মূলত সাংস্কৃতিক চর্চাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সীমাবদ্ধ করার প্রয়াস।

পহেলা বৈশাখ এবং বৈসাবি—উভয় উৎসবের শিকড় কৃষিনির্ভর সমাজে প্রোথিত। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে, যেমন শশাঙ্ক বা আকবরের শাসনামলে বাংলা সনের প্রবর্তন হলেও, তা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সীমা ছাড়িয়ে একটি সামষ্টিক সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। গ্রামীণ মেলা, হালখাতা, আলপনা, লোকগান—এসব উপাদান মিলিয়ে এটি এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। নগরায়নের ফলে গ্রামীণ মেলার ঐতিহ্য ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও শহুরে আয়োজন, যেমন ছায়ানটের রমনার বটমূলে বর্ষবরণ বা শোভাযাত্রা, এই ঐতিহ্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এই উৎসবগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রতীকী ভাষা। শোভাযাত্রার মুখোশ, আলপনার নকশা বা বৈসাবির রঙিন আয়োজন—সবকিছুই ইতিহাস, স্মৃতি এবং প্রতিরোধের প্রতীক। বাঘ, ঘোড়া বা পাখির মুখোশ শুধু নান্দনিক উপাদান নয়; এগুলো শক্তি, পরিবর্তন এবং আশার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এই প্রতীকগুলো অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ স্থাপন করে এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণে সহায়তা করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উৎসবগুলো মানুষের মধ্যে সামষ্টিকতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। এখানে ব্যক্তি পরিচয় সাময়িকভাবে মিলিয়ে যায় বৃহত্তর সামাজিক সত্তায়। শিশু, তরুণ এবং প্রবীণ—সব প্রজন্ম একসঙ্গে অংশ নেয়, ফলে এটি প্রজন্মগত সংলাপের একটি ক্ষেত্র তৈরি করে। নতুন প্রজন্ম পুরোনো প্রতীকের ভাষা শেখে, আর প্রবীণেরা তাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে পুনরাবিষ্কার করেন।

এই কারণেই পহেলা বৈশাখ, শোভাযাত্রা এবং বৈসাবি বারবার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বা কোপানলে পড়ে। কারণ এই উৎসবগুলো মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং একটি সমন্বিত সামাজিক শক্তি গড়ে তোলে। রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকাঠামো যেখানে বিভাজনের রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে চায়, সেখানে এই ধরনের ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। ফলে কখনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কখনো ধর্মীয় ব্যাখ্যা, আবার কখনো নৈতিকতার অজুহাতে এসব উৎসবকে নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করার চেষ্টা চালানো হয়। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, বৈসাবি বা পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়; এগুলো একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, যেখানে ইতিহাস, প্রতিরোধ, ঐক্য এবং অসাম্প্রদায়িকতার শক্তি একসঙ্গে কাজ করে। এই শক্তিকেই নিয়ন্ত্রণ বা বিভক্ত করার চেষ্টা বারবার দেখা যায়, যা এই উৎসবগুলোর গুরুত্বকেই আরও স্পষ্ট করে তোলে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!