সাভারের রানা প্লাজা ধসের বিভীষিকার মধ্যে হাজারো মানুষের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের আহাজারি এবং শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের মধ্যেই হঠাৎ সামনে আসে এক ‘অলৌকিক’ গল্প—পোশাক শ্রমিক রেশমা বেগম-এর বেঁচে ফেরার কাহিনি। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ার ১৭ দিন পর তাকে জীবিত উদ্ধারের খবর মুহূর্তেই দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও এক আশার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয় এই ঘটনা।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘অলৌকিক’ উদ্ধারকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কও সামনে আসে। কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে দাবি করা হয়, রেশমা নাকি ধসের দিনই আহত অবস্থায় ভবন থেকে বের হয়ে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাকে আবার ‘উদ্ধার’ দেখানো হয়। তার সহকর্মী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন বলেন, তারা একসঙ্গে ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাও নিয়েছিলেন। আবার স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ দাবি করেন, কথিত উদ্ধারের স্থান ও পরিস্থিতির বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটিকে ঘিরে আরও কিছু অসঙ্গতির কথাও আলোচনায় আসে। যেমন—১৭ দিন ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার পরও তার শারীরিক অবস্থা তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল বলে অনেকে মন্তব্য করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার পর হঠাৎ আলোর মধ্যে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া তার পোশাক, হাতের দাগ কিংবা উদ্ধারস্থলের বিবরণ নিয়েও নানা ধরনের সংশয় প্রকাশ করা হয় বিভিন্ন মহলে।
একই সময়ে স্থানীয়দের একটি অংশ দাবি করেন, উদ্ধারের কয়েকদিন আগে ওই এলাকায় অস্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষকে দূরে রাখা হয়েছিল। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় যে, ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও সরকারি পক্ষ ও পরিবারের বক্তব্যে ঘটনাটিকে অলৌকিক হিসেবেই তুলে ধরা হয় এবং রেশমা নিজেও এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এই দ্বিমুখী বয়ানের মধ্যে বিশ্লেষকরা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনেন—রানা প্লাজার মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর জনআলোচনার কেন্দ্র কীভাবে বদলে যায়। যেখানে ভবন নির্মাণের অনিয়ম, শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে পাঠানো, নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ এবং মালিকপক্ষের জবাবদিহিতার বিষয়গুলো সামনে থাকার কথা, সেখানে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগঘন গল্প দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
ফলে অনেকের মতে, এই ধরনের ‘অলৌকিক’ বয়ান সাময়িকভাবে মানুষের দৃষ্টি মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকে সরিয়ে দিতে পারে। শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো তখন আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বর্তমানে রেশমা জনআলোচনার বাইরে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু তার ঘটনাটি এখনও বিতর্কিত একটি অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে—যেখানে একদিকে আছে বেঁচে ফেরার মানবিক গল্প, অন্যদিকে আছে প্রশ্ন, সন্দেহ এবং বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার জটিলতা।