মে দিবসের ভোর নামলেই শহরের আকাশে এক অদ্ভুত দ্বৈত সুর ভেসে ওঠে—একদিকে লাল পতাকার উড়াউড়ি, স্লোগানের প্রতিধ্বনি; অন্যদিকে অদৃশ্য ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়া শ্রমিক জীবনের দীর্ঘশ্বাস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির এই দিনে আমরা যখন শ্রমের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি আর মানবিক অধিকার নিয়ে উচ্চকিত হই, তখন দেশের গার্মেন্ট খাতের লাখো নারী শ্রমিকের নীরব সংগ্রাম যেন আরও বেশি করে চোখে পড়ে। সেই সঙ্গে ভেসে ওঠে নির্মাণশ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক, চা-বাগানের শ্রমিক—অগণিত মানুষের জীবনের অনুচ্চারিত গল্প।
ভোরের আলো ফোটার আগেই যাদের দিন শুরু হয়, সেই গার্মেন্ট শ্রমিক নারীরা শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যান জীবিকার তাগিদে। কারখানার ভেতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ, টার্গেটের চাপ, সামান্য ভুলে তিরস্কার—সবকিছু মিলিয়ে তাদের কর্মদিবস যেন এক অন্তহীন পরীক্ষা। অথচ মাস শেষে যে মজুরি হাতে আসে, তা দিয়ে শহরের জীবনযাত্রার খরচ সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। বাসা ভাড়া, খাবার, সন্তানের শিক্ষা—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই যেন এক অঙ্ক কষে বাঁচতে হয়।
নারী শ্রমিকদের জন্য এই বাস্তবতা আরও কঠিন। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা, মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা—এসব সমস্যা তাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। অনেকেই সন্তানকে গ্রামের বাড়িতে রেখে শহরে কাজ করেন; আবার যারা সন্তানকে সঙ্গে রাখেন, তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার বা নিরাপদ পরিবেশ। ফলে কাজ আর মাতৃত্বের দ্বৈত চাপ তাদের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তিকে আরও গভীর করে তোলে।
অন্যদিকে, শহরের নির্মাণশ্রমিকদের জীবন যেন প্রতিদিনই ঝুঁকির সঙ্গে এক চুক্তি। মাথার ওপর হেলমেট থাকলেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই, নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা। উঁচু ভবনের কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা, পড়ে যাওয়া, বা যন্ত্রপাতির আঘাতে আহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। তবু জীবনের তাগিদে পরদিন আবার সেই একই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থলে ফিরে যেতে হয়। তাদের মজুরি অনিয়মিত, কাজ মৌসুমভিত্তিক, আর কোনো দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা প্রায় অনুপস্থিত।
পরিবহন শ্রমিকদের দিন-রাতের পার্থক্য যেন মুছে গেছে অনেক আগেই। বাসচালক, হেলপার, ট্রাকচালক—ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হয় তাদের। ট্রাফিক জ্যাম, যাত্রীর চাপ, মালিকের লক্ষ্যপূরণের তাগিদ—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ তাদের নিত্যসঙ্গী। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে ক্লান্তি জমে ওঠে, যা অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবু এই শ্রমিকদের জন্য নেই সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো।
গৃহকর্মীদের জীবন আরও বেশি অদৃশ্য। তারা শহরের ঘরে ঘরে কাজ করলেও তাদের শ্রমের স্বীকৃতি খুব কমই মেলে। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, ছুটি নেই, অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য মজুরিও নেই। কখনো কখনো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তাদের পক্ষে প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক স্বীকৃতি—দুটোরই ঘাটতি রয়েছে।
গ্রামের কৃষিশ্রমিকরা আবার অন্য এক বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য—সব মিলিয়ে তাদের আয় অনিশ্চিত। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেও জীবনের স্থিতি আসে না। একইভাবে চা-বাগানের শ্রমিকরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই চক্রে আবদ্ধ—কম মজুরি, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, আর উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিত এক জীবন।
মে দিবসে আমরা যখন শ্রমিক অধিকারের কথা বলি, তখন এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে সামনে আনা জরুরি। কারণ শ্রমিক শ্রেণি কোনো একক গোষ্ঠী নয়; তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন, কিন্তু বঞ্চনার সুর একই। দেশের অর্থনীতির প্রতিটি স্তম্ভে তাদের অবদান স্পষ্ট, কিন্তু সেই অবদানের প্রতিফলন তাদের জীবনে কতটা পৌঁছায়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আজকের দিনে মিছিল-সমাবেশে যে দাবিগুলো ওঠে—ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টার সীমা, সামাজিক সুরক্ষা—এসব শুধু স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না। বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর নীতি, কঠোর নজরদারি এবং সবচেয়ে বড় কথা, শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে সম্মান দেওয়ার মানসিকতা। শ্রমিকদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব না দিলে উন্নয়নের যে গল্প আমরা শুনি, তা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
মে দিবস শুধু ইতিহাসের স্মরণ নয়, এটি এক প্রতিজ্ঞার দিন—শ্রমিকের ঘামে গড়া প্রতিটি অর্জনকে মর্যাদা দেওয়ার, প্রতিটি অবহেলাকে প্রশ্ন করার। গার্মেন্টের সেই নারী শ্রমিক, নির্মাণস্থলের ঝুঁকিপূর্ণ মাচায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিক, রাতভর গাড়ি চালানো পরিবহনকর্মী, নিঃশব্দে ঘরের কাজ করে যাওয়া গৃহকর্মী, কিংবা প্রখর রোদে মাঠে কাজ করা কৃষিশ্রমিক—তাদের সবার চোখে যে ক্লান্তি, যে স্বপ্ন, তা আমাদের সামষ্টিক দায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই দায় স্বীকার না করলে, লাল পতাকার উড়াউড়ি আর স্লোগানের উচ্চারণ—সবই একসময় নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে।