সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ন

মুজিব বাহিনী : প্রশ্নের আড়ালে ইতিহাস

অপু সারোয়ার
রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু ‘পোষা’ বিতর্ক আছে—যেন পুরোনো ক্ষতের মতো, যা শুকোয় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন আবরণে, নতুন রঙে আবার ফিরে আসে। গত পঞ্চাশ বছর ধরে এই বিতর্কগুলো বারবার একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়—বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে। মুক্তিযুদ্ধকে নানা দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, তার অর্থ ও মর্যাদাকে খণ্ডিত করা—এটাই যেন এই আলোচনাগুলোর ভেতরের মূল উদ্দেশ্য। এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও নমনীয়তা পেয়েছে—যার শুরু খুঁজে পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলেই। সময়ের সঙ্গে সেই পৃষ্ঠপোষকতা আরও ঘন, আরও গভীর হয়েছে—এমনকি একসময় তা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকেই গ্রাস করতে চেয়েছে। ধর্মীয় রাজনীতির বিস্তার এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করেছে; অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্নকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চিত দূরত্বে।
এই ‘পোষা’ বিতর্কগুলো হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এগুলোর শিকড় রয়েছে যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা, অস্থিরতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার মধ্যে। পরাজিত শক্তি—জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগ ঘরানা—এই বিতর্কগুলোকে নিজেদের বয়ানের মাধ্যমে টিকিয়ে রেখেছে। তাদের পাশাপাশি, এক ভিন্ন ধারার বাহক হয়ে উঠেছিল চীনপন্থী বামপন্থীরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্তত ছয়টি চীনপন্থী রাজনৈতিক দল সক্রিয় ছিল, যাদের আঞ্চলিক প্রভাবও চোখে পড়ার মতো ছিল। কিন্তু সেই প্রভাব জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি। এর পেছনে ছিল নানা কারণ—ভাঙন, মতভেদ, বিচ্ছিন্নতা। এই সব মিলিয়ে চীনপন্থী বামদের ঠেলে দেয় এক নীরব প্রান্তিকতায়।
সেই নীরবতা শুধু শব্দের অনুপস্থিতি ছিল না; ছিল বাস্তবতা ঠিকমতো বুঝতে না পারার কষ্ট, ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের ভার, আর দীর্ঘশ্বাসে ভরা এক স্তব্ধতা। একসময় তারা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে নিজেদের আড়ালে নিয়ে যায়—এক ধরনের নীরব নির্বাসনে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এই ভাঙন আরও গভীর হয়। সংগঠনগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায়, দূরত্ব বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভেতরেই তৈরি হয় এক শূন্যতা—এক নিঃশব্দ আত্মপরিচয়ের সংকট। টিকে থাকার জন্য তারা নতুন কৌশল খুঁজে নেয়, আর সেই কৌশলের একটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে এই ‘পোষা’ বিতর্কগুলো।
এদিকে, যুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী বা মুসলিম লীগের পক্ষে সরাসরি বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করা সহজ ছিল না। সেই জায়গায় চীনপন্থী বামরাই অনেক সময় এই বিতর্কগুলোর মুখপাত্র হয়ে ওঠে। যদিও ভোটের রাজনীতিতে তারা কখনো বড় আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেনি, তবুও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে তাদের উপস্থিতি ছিল স্পষ্ট। সাংবাদিকতা, শিল্প ও সাহিত্যে তারা অনেক সময় জাতীয়তাবাদীদের চেয়েও এগিয়ে ছিল। এই সুবিধাজনক অবস্থান থেকেই তারা আবার রাজনৈতিক মাঠে ফেরার চেষ্টা করে—আর সেই চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে তৈরি এই দীর্ঘস্থায়ী, ‘পোষা’ বিতর্কগুলো।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বারবার ফিরে আসা এই ‘পোষা’ বিতর্কগুলোর মধ্যে মুজিব বাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এই বাহিনীর প্রাথমিক নাম ছিল বিএলএফ—বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স। মূলত ছাত্র-যুবকদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই সংগঠন ১৯৭১ সালের আগস্টের দিকে এসে নিজেদের নাম দেয় “মুজিব বাহিনী”। তবে কাগজপত্র, নথি ও সার্টিফিকেটে তারা বিএলএফ নামেই থেকে যায়। প্রায় সাত হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে পাঠানো হয়েছিল যুদ্ধের জন্য। নাম পরিবর্তনের আগেই তাদের বড় অংশ দেশের ভেতরে সক্রিয় ছিল—যুদ্ধে এবং রাজনৈতিক সংগঠনে কাজের মাধ্যমে।
১৯৭১ সালের আগস্টে নাম পরিবর্তনের খবর যুদ্ধের তীব্র পরিস্থিতিতে রণাঙ্গণে কতটা পৌঁছেছিল—তা ভাবার বিষয়। প্রবাসী সরকারের সঙ্গে বিএলএফ নেতৃত্বের নীতিগত মতভেদ ছিল। সেই মতভেদের প্রেক্ষিতে সামনে থাকার প্রবণতা থেকেই হয়তো নাম পরিবর্তন হয়েছিল। কিন্তু কেন যুদ্ধের শেষ দিকে এসে এই পরিবর্তন করা হলো—এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা আলোচনা বিএলএফের পক্ষ থেকে কখনো দেওয়া হয়নি। আগস্টে নাম পরিবর্তনের খবর দেশের ভেতরে থাকা সদস্যদের কাছে কীভাবে পৌঁছেছিল—এই প্রশ্নেও নেতৃত্ব সবসময় নীরব থেকেছে। তবে নাম বদলালেও কোনো আদর্শিক পরিবর্তন হয়নি।
বিএলএফ হঠাৎ তৈরি কোনো বাহিনী ছিল না; এটি ছিল চলমান সংগ্রামেরই একটি ধারাবাহিক রূপ। যুদ্ধের আগেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ‘জহুর বাহিনী’, ‘জয় বাংলা বাহিনী’—এমন নানা প্রতীকী প্ল্যাটফর্ম ছিল। ১৯৬৯ সালের পর ঢাকার দেয়ালে “বিএলএফ-এ যোগ দিন” স্লোগানও দেখা যায়, যদিও তাতে বড় সাড়া পাওয়া যায়নি। বিএলএফ নামটির সঙ্গে ভিয়েতনামের ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (NLF)-এর প্রভাব স্পষ্ট। ১৯৬০–৭০-এর দশকে ভিয়েতনামের গেরিলা যুদ্ধ উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের বড় অনুপ্রেরণা ছিল।
অনেকে মনে করেন, তখনকার ছাত্রলীগ মানেই সবাই বিএলএফে ছিল—কিন্তু বাস্তবতা এত সরল ছিল না। তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী নিজেই বিএলএফের বাইরে থেকে প্রবাসী সরকারের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। সারা দেশেই একই চিত্র ছিল—কেউ বিএলএফে, কেউ অন্য ইউনিটে; কিন্তু লক্ষ্য ছিল একটাই—স্বাধীনতা।
বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীকে ঘিরে অভিযোগ এখনো আছে। কেউ প্রশ্ন তোলে—“মুজিব বাহিনী নাম কেন?” কেউ বলে—“তারা নাকি যুদ্ধই করেনি।” আবার কেউ দাবি করে—এই বাহিনী নাকি তৈরি হয়েছিল কমিউনিস্টদের দমন করার জন্য। এই প্রশ্নগুলো সময়ের সঙ্গে বারবার ফিরে আসে। কিন্তু নামকরণের ক্ষেত্রে একটি বড় সত্য অস্বীকার করা যায় না—১৯৭১ সালের পুরো যুদ্ধই পরিচালিত হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নামে, যদিও তিনি তখন কারাগারে ছিলেন। তার নামই ছিল সংগ্রামের প্রতীক; তার নামেই মানুষ যুদ্ধে নেমেছিল।
প্রবাসী সরকারের অধীনে দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। পরে নিয়মিত বাহিনী গঠনের জন্য ‘জেড ফোর্স’, ‘কে ফোর্স’ এবং ‘এস ফোর্স’—এই তিনটি ব্রিগেড তৈরি করা হয়, যেগুলোর নামকরণ হয়েছিল তাদের কমান্ডারদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে, এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে। সেই ধারাবাহিকতায় “মুজিব বাহিনী” নামটিও ছিল একটি প্রতীকী নাম—নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং একটি স্বপ্নের প্রতি অঙ্গীকারের প্রকাশ। তাই এটিকে আলাদা করে দেখার আগে সেই সময়ের আবেগ, বাস্তবতা এবং সংগ্রামের প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি।
ইতিহাস কখনো সাদা-কালো নয়; সেখানে আলো-ছায়া একসঙ্গে থাকে। মুজিব বাহিনীও মুক্তিযুদ্ধের সেই জটিল বাস্তবতারই অংশ। মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে ছাত্র-যুবকদের ভূমিকা ছিল বড়। এটুকু নিশ্চিত—তারা সেই সময়ের সন্তান, সেই যুদ্ধের অংশ—যেখানে শেষ কথা ছিল একটাই: স্বাধীনতা।
মুজিব বাহিনীর নাম এলেই অনেকে বলেন—এটি নাকি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা Research and Analysis Wing (র)-এর তৈরি। কথাটি সহজ শোনালেও বাস্তবতা এত সরল নয়। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ভারত গভীরভাবে জড়িত ছিল—সামরিক, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সব ক্ষেত্রেই। একটি যুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রের একটিমাত্র সংস্থা কাজ করে না; পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই বিভিন্নভাবে যুক্ত থাকে। তাই “এটি শুধু একটি সংস্থার কাজ”—এভাবে বলা বাস্তবতাকে সরল করে ফেলা। এই ধরনের দাবি বিতর্ক তৈরি করে, কিন্তু পুরো ইতিহাস তুলে ধরে না। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি যৌথ সংগ্রাম—যেখানে সহযোগিতা ও সমন্বয় ছিল, কিন্তু তাকে এক লাইনের ব্যাখ্যায় ধরা যায় না।
“মুজিব বাহিনী কোথাও যুদ্ধ করেনি”—এই কথার ভেতরে বাস্তবতার কোনো ভিত্তি নেই। বরং এমন দাবি প্রায়ই আসে অজানা বা অসম্পূর্ণ বোঝাপড়া থেকে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত চিত্রটি ধরা পড়ে না। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ কোনো একক নাম বা ব্যানারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জেড ফোর্স, কে ফোর্স, এস ফোর্স—এই বাহিনীগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছে। কিন্তু আজ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন—কোন এলাকায় কে যুদ্ধ করেছে। কারণ যুদ্ধের সময় মানুষ ইউনিট বা নাম দিয়ে আলাদা করে দেখেনি। গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষের কাছে সবাই ছিল এক পরিচয়ে—মুক্তিবাহিনী। তারা দেখেছে লড়াই, দেখেছে আত্মত্যাগ, দেখেছে স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা মানুষ। একইভাবে বিএলএফ—যা পরে মুজিব বাহিনী নামে পরিচিত হয়—তাদের সদস্যরাও দেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করেছে, একই লক্ষ্য নিয়ে। তারা আলাদা কোনো সত্তা ছিল না; ছিল বৃহত্তর মুক্তিযুদ্ধের অংশ। মুক্তিযোদ্ধার অংশ। তাই কোনো বাহিনীকে আলাদা করে “যুদ্ধ করেনি” বলা মানে ইতিহাসকে সংকুচিত করা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সম্মিলিত সংগ্রাম—নাম আলাদা হতে পারে, কিন্তু লড়াই একটাই ছিল, স্বপ্ন একটাই: স্বাধীন বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়েছে। ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটে ১৯৭১ সালের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধ—এই দুটি ছিল ভিন্ন ধারা। যুদ্ধের শুরুতেই সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা বিদ্রোহ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র ত্যাগ করেন। এই সামরিকভাবে প্রশিক্ষিত শক্তি প্রবাসী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিযুদ্ধকে দ্রুত একটি সংগঠিত সামরিক রূপ দেয়। ফলে রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব ধীরে ধীরে সামরিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার প্রণয়ন এবং জাতীয় সংগীত নির্ধারণ—এসব ক্ষেত্রে ছাত্র-যুবকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত অগ্রণী। কিন্তু নতুন এই শক্তির উত্থানে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর হাতে যুদ্ধের মূল দায়িত্ব চলে যাওয়ায়, প্রবাসী সরকারের সহায়তায় ছাত্র-যুবকদের হাত থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কার্যত সরে যায়।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে এই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুজিব বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দিতে অনীহা, এবং বামপন্থীদের ঈর্ষা থেকে ছড়ানো নানা প্রচারণা—সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ধারাবাহিকতার ফলই আজকের বাস্তবতা।
পরবর্তী অংশ : মুজিব বাহিনী ও যুদ্ধকালীন সংঘাত , ১৬ মে সমসমাজ অনলাইন প্রকাশিত হবে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!