মে দিবস ও লেবার দিবস—দুটি দিবসই শ্রমজীবী মানুষের অবদানকে স্বীকৃতি দিলেও তাদের ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক তাৎপর্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রতি বছর ১ মে বিশ্বব্যাপী পালিত মে দিবস মূলত শ্রমিকদের ঐতিহাসিক আন্দোলন, অধিকার আদায় এবং সংগ্রামের স্মরণে উদযাপিত হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার পালিত শ্রম দিবস শ্রমিকদের সামগ্রিক অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য নির্ধারিত একটি জাতীয় ছুটি, যা তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক ও বেশি আনুষ্ঠানিক চরিত্র বহন করে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লেবার ডে পালিত হয়। অস্ট্রেলিয়াতে সংখ্যাগরিষ্ট রাজ্যে – অক্টোবর মাসে লেবার ডে পালিত হলেও দুটি রাজ্যে মে দিবস পালিত হয়।
মে দিবসের সূচনা উনিশ শতকের যুক্তরাষ্ট্রে, যখন শ্রমিকরা দীর্ঘ ১৪ থেকে ২০ ঘণ্টার কর্মদিবস কমিয়ে আট ঘণ্টায় নামিয়ে আনার দাবিতে সংগঠিত আন্দোলন শুরু করে। ১৮৮৬ সালের ১ মে দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভের মাধ্যমে এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং শিকাগোর হে-মার্কেট ঘটনার মাধ্যমে তা ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনসমূহ ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক সংহতির প্রতীক হয়ে ওঠে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে মে দিবসের পরিবর্তে সেপ্টেম্বরের লেবার ডে দিবসকে সরকারি ছুটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর পেছনে স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল; মে দিবসকে তৎকালীন সময়ে শ্রমিক বিক্ষোভ, সমাজতান্ত্রিক ও অরাজবাদী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হিসেবে দেখা হতো। এই রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এড়িয়ে সরকার অপেক্ষাকৃত ‘ নিরপেক্ষ’ একটি দিনকে বেছে নেয়। ফলে ১৮৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড সেপ্টেম্বরের শ্রম দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মে দিবসের চরিত্র ও উদযাপনের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মে দিবসের ছুটি বা আনুষ্ঠানিকতা কখনও ভিন্ন দিনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বা ভিন্ন আঙ্গিকে পালন করা হচ্ছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে একত্রিত হয়ে শ্রমিকদের বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ উদযাপনের ধারাটি অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে। শ্রমিকদের সংগঠিত শক্তিকে অনেক সময় আরও নিয়ন্ত্রিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সীমিত পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ রাখার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ দেশে মে দিবসের বাস্তবতা আরও জটিল। প্রতি বছর মে দিবস এলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব শ্রমিকদের প্রতি সংহতির বাণী দেয়, শ্রমিকদের অবদানের প্রশংসা করে। কিন্তু একই সময়ে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, শ্রমিক ছাঁটাই, বকেয়া মজুরি না পাওয়া কিংবা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও অব্যাহত থাকে। গত তিন দশকে দেশের সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশই শিল্পপতি হিসেবে পরিচিত, যাদের মধ্যে অনেকেই গার্মেন্টস খাতের মালিক। ফলে শ্রমনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একটি স্বার্থগত দ্বন্দ্বের প্রশ্ন সামনে আসে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এই খাতের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিয়মিত বেতন প্রদান এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক শ্রমিকই তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য পায় না এবং নিয়মিত মজুরি প্রদানে অনিয়ম ঘটে। এই বাস্তবতা মে দিবসের ঘোষিত আদর্শ—শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতার সঙ্গে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, মে দিবস সময়ের সাথে সাথে তার প্রাথমিক বিপ্লবী ও ঐক্যবদ্ধ চরিত্র থেকে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন দেশে এর উদযাপন পদ্ধতি ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ভিন্নভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে একদিকে এটি শ্রমিকদের ইতিহাস ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে টিকে থাকলেও, অন্যদিকে বাস্তবতায় শ্রমিকদের ঐক্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি এখনো অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে।