শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ন

মহিউদ্দিন আহমদের তথ্য, যুক্তি ও বিশ্লেষণ: কিছু প্রশ্ন

অপু সারোয়ার
শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিমানে ভারতে যান। এরপর থেকে তিনি জনসমক্ষে নেই। তাঁর অবস্থান, অডিও বার্তার সত্যতা এবং দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
প্রথম আলো দেশের অন্যতম প্রধান দৈনিক। রাজনৈতিকভাবে প্রথম আলোর নিজস্ব চিন্তা ও অবস্থান রয়েছে। তবে সেই রাজনৈতিক ভাবনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া জামায়াতের *দৈনিক সংগ্রাম*, বিএনপির *দৈনিক দিনকাল* বা আওয়ামী লীগের *বাংলার বাণী*-এর মতো প্রকাশ্য ও নগ্ন নয়। বরং প্রথম আলো প্রথিতযশা লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে লেখা প্রকাশ করে নিজের বক্তব্য প্রচারে অভ্যস্ত এবং এ ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
১০ জুলাই প্রথম আলোতে শেখ হাসিনাকে নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদের *দেশে ঢুকতে এত অস্থির হলে পালালেন কেন?” শিরোনামের লেখা প্রকাশিত হয়। লেখাটির শিরোনাম ও বিষয়বস্তু—উভয়ই আলোচনার দাবি রাখে। লেখায় তিনি বেশ কিছু পুরোনো তথ্য ব্যবহার করে বিশ্লেষণকে দক্ষতার সঙ্গে ইউনূস–জামায়াত–বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের দিকে নিয়ে গেছেন।
মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, “১৯৭৫ সালের আগস্ট হত্যাকাণ্ড ও একদলীয় বাকশাল সরকারের পতনের পর তিনি ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সেখানে ছিলেন প্রায় ছয় বছর।” এই বক্তব্যের প্রথম অংশ ভুল ও অসত্য। শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশে ছিলেন না। দেশে না থাকার কারণেই তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। শেখ হাসিনা তখন ইউরোপে ছিলেন এবং সেখান থেকে ভারতে যান। পরে ১৯৮১ সালে ভারত থেকে দেশে ফিরে আসেন।
মহিউদ্দিন আহমদ আরও লিখেছেন, “দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন হাসিনা ও তাঁর স্বামী ওয়াজেদ মিয়ার আবেদনক্রমে তাঁদের পাসপোর্ট নবায়ন করেছিল। ভারতীয় মুদ্রায় ৩১ টাকা ১০ পয়সা ফি দিয়ে হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৮ এপ্রিলে পাওয়া তাঁর পাসপোর্ট (নম্বর বি-০৯৬২৩১) নবায়ন করেছেন ১৯৭৯ সালের ২৬ নভেম্বর। কিন্তু তাঁর পাসপোর্টে কোনো ভারতীয় ভিসা ছিল না।” এই বক্তব্যেও একাধিক প্রশ্ন ও অসঙ্গতি রয়েছে। প্রথমত, ১৯৭৫ সালের শেখ হাসিনার পাসপোর্ট নম্বর তিনি কীভাবে পেলেন—সে প্রশ্ন অমূলক নয়। মহিউদ্দিন আহমদ বা প্রথম আলোর সাংবাদিকেরা সাধারণত তথ্যসূত্র প্রকাশ করেন না। কিন্তু তথ্যসূত্র প্রকাশ না করার কারণে পাসপোর্ট নম্বরটির সত্যতা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত কোনো সাক্ষাৎকার বা লেখায় নিজের পাসপোর্ট নম্বর প্রকাশ করেছেন—এমন কোনো তথ্য জনসমক্ষে নেই। সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাসপোর্টসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
মহিউদ্দিন আহমদ আরও লিখেছেন, “তাঁর [শেখ হাসিনা] পাসপোর্টে কোনো ভারতীয় ভিসা ছিল না।” এখানেও কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি। শেখ হাসিনা জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন। জার্মানি থেকে ভারতে যেতে হলে স্বাভাবিক নিয়মে ভারতীয় ভিসার প্রয়োজন হয়। গন্তব্য দেশের বৈধ ভিসা ছাড়া জার্মান বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অতিক্রম করা সম্ভব নয়। ইউরোপ বা আমেরিকার দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের তৃতীয় কোনো দেশে যেতে হলে সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট দেশের ভিসা প্রয়োজন হয়। শেখ হাসিনা যখন জার্মানি থেকে ভারতে যান, তখন তিনি একজন সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। ফলে রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। সে অবস্থায় বৈধ পাসপোর্টে ভারতীয় ভিসা নেওয়াই ছিল স্বাভাবিক ও সহজ প্রক্রিয়া। এর বিপরীতে ভিসা ছাড়া জার্মান ইমিগ্রেশন অতিক্রমের ব্যবস্থা করা বহু গুণ বেশি জটিল ও অস্বাভাবিক হতো।
মহিউদ্দিন আহমদ “ভারতীয় মুদ্রায় ৩১ টাকা ১০ পয়সা ফি”  দিয়ে শেখ হাসিনার পাসপোর্ট নবায়নের কথাও উল্লেখ করেছেন। ভারতীয় মুদ্রার সঙ্গে পয়সার নির্দিষ্ট হিসাব উল্লেখ করে বক্তব্যটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই তথ্যের কোনো উৎস উল্লেখ করা হয়নি। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের পাসপোর্টের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। বর্তমানে নতুন পাসপোর্ট ও নবায়নের ক্ষেত্রে একই হারে ফি নির্ধারিত রয়েছে। এখানে মূল প্রশ্ন মুদ্রা রূপান্তরের নয়; বরং ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়নের সরকারি ফি সত্যিই ভারতীয় মুদ্রায় ৩১ টাকা ১০ পয়সা ছিল কি না। যদি হয়ে থাকে, তবে সেই তথ্যের সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য সূত্র থাকা উচিত। কিন্তু মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর লেখায় এমন কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করেননি। ফলে এই দাবির যথার্থতা স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত থেকে যায়।
মহিউদ্দিন আহমদ প্রশ্ন তুলেছেন, **”হাসিনা কেন জার্মানি কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেননি, কেন ভারতে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করলেন—এ নিয়ে রহস্য থেকেই গেছে।”** যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তবে এই প্রশ্নের একটি সহজ ও প্রাথমিক দিকও রয়েছে। জার্মানি, ইউরোপের অন্য কোনো দেশ কিংবা ভারত—সবই বাংলাদেশের জন্য বিদেশ। সে বিবেচনায় ইউরোপের দূরবর্তী কোনো দেশের পরিবর্তে ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী ভারতে আশ্রয় নেওয়া স্বাভাবিক সিদ্ধান্তও হতে পারে।
শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া তাঁর “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ”  বইয়ে লিখেছেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি ও শেখ হাসিনা সপরিবারে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারত সরকার তাঁকে ভারতীয় আণবিক শক্তি কমিশনে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপের ব্যবস্থা করে দেয়। ওই ফেলোশিপের শর্ত অনুযায়ী বাসস্থান, অফিসে যাতায়াতের সুবিধা এবং দৈনিক ভাতা হিসেবে তিনি ৬২ রুপি ৫০ পয়সা পেতেন।
এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার বইটি কয়েক দশক আগে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বর্ণনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারীরাও সাধারণত বইটিকে অতিরঞ্জিত বা কল্পনানির্ভর বলে চিহ্নিত করেননি। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, শেখ হাসিনা ও এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে। তবে আশ্রয় গ্রহণের কারণ সম্পর্কে ওয়াজেদ মিয়ার প্রত্যক্ষ বিবরণ আলোচনার ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা কঠিন।
মহিউদ্দিন আহমদ আরও যুক্তি দিয়েছেন যে, জাসদের অনেক কর্মী রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছিলেন; তাই শেখ হাসিনাও রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারতেন। কিন্তু এই যুক্তি ঘটনাটিকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করে। শেখ হাসিনার পরিস্থিতিকে ১৯৭৫ সালের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর সরকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা সংকটে পড়েছিল এবং সেই প্রেক্ষাপটে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাকশাল কেবল একদলীয় শাসনব্যবস্থা ছিল না; বরং তৎকালীন সোভিয়েতপন্থী রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মডেল থেকে অনুপ্রাণিত ছিল। এই ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্যতা, সফলতা বা মার্ক্সবাদী চরিত্র নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এ ধরনের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত বিভিন্ন দেশে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং ক্ষমতার সংঘাত বেড়ে যায়। দক্ষিণ ইয়েমেন, মোজাম্বিক ও আফগানিস্তানের উদাহরণ এ প্রসঙ্গে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কেউ কেউ ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশের ঘটনাকেও বৃহত্তর স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেন। তবে এটি ইতিহাসের একমাত্র বা সর্বসম্মত ব্যাখ্যা নয়।
তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি ন্যাটো জোটের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। অন্যদিকে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আলোকে শেখ হাসিনা ও এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার জার্মানির পরিবর্তে ভারতকে আশ্রয়ের জন্য বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ফলে বিষয়টিকে কেবল “রহস্য” হিসেবে উপস্থাপন করলে সেই সময়ের জটিল বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
শেখ হাসিনার রাজনীতির বিরোধিতা করা, তাঁর শাসনামলের সমালোচনা করা কিংবা তাঁর সরকারের জবাবদিহি দাবি করা এক বিষয়; আর অপূর্ণ তথ্য বা যাচাইহীন দাবির ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট বয়ান নির্মাণ করা ভিন্ন বিষয়। দীর্ঘদিন ধরেই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব রাজনৈতিক আলোচনায় জনপ্রিয়। কারণ, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অনেক সময় প্রমাণ করা কঠিন, আবার সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করাও সহজ হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে শাসকেরা সংকটে পড়লে অনেক সময় “বিদেশি হাত” তত্ত্বের আশ্রয় নিয়েছেন। একইভাবে বিরোধীরাও বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যায় ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এ ধরনের ব্যাখ্যা প্রায়ই রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে এবং তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনা বিশ্লেষণের পরিবর্তে আবেগনির্ভর ব্যাখ্যাকে শক্তিশালী করে। অনেক ক্ষেত্রে এটি চোখের সামনে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলোকেও আড়াল করে দেয়। মহিউদ্দিন আহমদের লেখাটি প্রথম আলোর মতো একটি বড় জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কোনো লেখা বড় পত্রিকায় প্রকাশিত হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বস্তুনিষ্ঠ বা প্রশ্নাতীত হয়ে যায় না। একটি বিশ্লেষণের গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার তথ্যসূত্র, যুক্তির ধারাবাহিকতা এবং তথ্যের নিরপেক্ষ উপস্থাপনার ওপর।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!