রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতা ও নির্বাচিত সংহতি: মুসলিম বিশ্বে যুদ্ধবিরোধী রাজনীতি পুনঃচিন্তা

অপু সারোয়ার
বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং ইসরাইল রাষ্ট্রকে ঘিরে মুসলিম বিশ্বের একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, দখলদারিত্বের বিরোধিতা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে অনেক মানুষ ও রাজনৈতিক শক্তি ইসরাইলের নীতির সমালোচনা করে থাকে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের বড় অংশে এই সমালোচনার প্রধান উৎস রাজনৈতিক বা মানবাধিকারভিত্তিক নয়, বরং ধর্মীয়। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল প্রশ্নগুলো প্রায়ই ধর্মীয় আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

গত দুই–তিন বছরে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ মানুষ ইসরাইলের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়েছে। এসব বিক্ষোভ মূলত অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের ছিল। বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও রাজনৈতিক মতের মানুষ একসাথে এতে অংশ নিয়েছে। অনেক দেশে ইয়াহুদী সংগঠনও এই আন্দোলনের অংশ হয়েছে। Jewish Voice for Peace-সহ বেশ কিছু ইয়াহুদী সংগঠন প্রকাশ্যে ইসরাইল সরকারের নীতির সমালোচনা করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে ইসরাইল রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা মানেই ইয়াহুদী ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।

অন্যদিকে অধিকাংশ মুসলিম দেশে বড় আকারের অসাম্প্রদায়িক যুদ্ধবিরোধী সমাবেশ খুব কমই দেখা গেছে। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশে যে প্রতিবাদ হয়েছে তার বড় অংশই ধর্মীয় প্রতিবাদ হিসেবে সংগঠিত হয়েছে। বামপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো আলাদাভাবে ছোট আকারের সমাবেশ করেছে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এমন কোনো নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নেই যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ বা বামপন্থী শক্তি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে একসাথে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন করতে পারে। ইসলামী সংগঠনগুলোর সভা-সমাবেশে প্রায়ই সমাজতন্ত্র ও নাস্তিকতাবিরোধী স্লোগান শোনা যায়, যা যৌথ রাজনৈতিক আন্দোলনের সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সারা বছর ধর্মীয় সভা-সমাবেশ আয়োজন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠান অনেক সময় “নিরপেক্ষ” বা ধর্মীয় আচারভিত্তিক সমাবেশ হিসেবে প্রচার করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেখানে হিন্দু, খ্রিস্টান বা ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য শোনা যায়। বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় এই কারণে যে বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে কোনো উল্লেখযোগ্য ইয়াহুদী জনগোষ্ঠী ছিল না এবং আজও নেই।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংখ্যাগত পতনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল, যা এখন প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। পাকিস্তান, ইরানসহ বহু মুসলিম দেশে দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমেছে। এর পেছনে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চাপ কাজ করেছে। এই বাস্তবতায় পশ্চিমা বিশ্বের কিছু বামপন্থী যে “ইউনাইটেড ফ্রন্ট” বা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের স্লোগান তোলেন, তার বাস্তব প্রয়োগের পরিবেশ অনেক মুসলিম দেশে কখনোই তৈরি হয়নি। অনেক সময় লেনিন বা কমিন্টার্নের উদাহরণ টানা হয়, কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলা এই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। একটি সার্বভৌম দেশের ওপর এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অন্যায় এবং এর নিন্দা করা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও হলো—ইরান বা আফগানিস্তানের মতো দেশে বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী মৌলবাদী শক্তির দমন-পীড়নের মুখে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেই কারণে “ইম্পেরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে, কিন্তু ধর্মতান্ত্রিক শাসনকেও সমর্থন করা যাবে না”—এই নীতিগত স্লোগান বাস্তবে সেই দেশগুলোর ভেতরে সংগঠিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে পরিচালিত হয়েছে, যেখানে শ্রমিক, নারী, ছাত্র এবং সাধারণ নাগরিকদের সংগঠিত প্রতিবাদ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। ফলে বহু মানুষ প্রকাশ্য রাজনৈতিক আন্দোলনের বদলে দৈনন্দিন ছোট ছোট প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছে—যাকে অনেক গবেষক “নন-মুভমেন্ট” বা নীরব প্রতিরোধ বলে বর্ণনা করেন। ইরানে নারীদের বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রতিদিনের প্রতিরোধই পরে “Women, Life, Freedom” আন্দোলনের মতো বৃহৎ বিদ্রোহের জন্ম দেয়।  এই ধরনের আন্দোলনগুলো ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা বিকল্প রাষ্ট্রব্যবস্থার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে শাসকগোষ্ঠী দুর্বল হলেও ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করার মতো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি হয়নি।

এই কারণেই অনেক ইরানি নাগরিক আজ দ্বিধাগ্রস্ত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে তারা দীর্ঘদিনের ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, অন্যদিকে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ দেশের স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল কোনোভাবেই ইরানের মানুষের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিক নয়—তাদের নিজস্ব কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। এই জটিল বাস্তবতার মধ্যেই আরেকটি গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। ইসরাইল রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা প্রায়ই ইয়াহুদী ধর্ম ও ইয়াহুদী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণায় রূপ নেয়। অনেক সময় ধর্মীয় ব্যাখ্যা ব্যবহার করে এই বিদ্বেষকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে রাজনৈতিক সমালোচনা সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় পরিণত হয়।

বাস্তবে ইসরাইল একটি রাষ্ট্র, আর ইয়াহুদী একটি ধর্ম ও একটি ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করা এবং একটি ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো—এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য মুছে ফেলা হলে তা আন্টি-সেমিটিজম বা ইয়াহুদী বিদ্বেষে পরিণত হয়, যা ইতিহাসে বহু ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে।

একই সঙ্গে একটি দ্বৈত মানদণ্ডও চোখে পড়ে। মুসলিম বিশ্বের বহু সংগঠন ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে জোরালোভাবে কথা বলে। কিন্তু বেলুচিস্তান বা কুর্দি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন উঠলে সেই সমর্থন খুব কমই শোনা যায়। এতে বোঝা যায় অনেক ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি নীতিগত নয়, বরং রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়।

এই সব বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বোঝার জন্য শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নগুলোকে একসাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন, ইসরাইলের যুদ্ধনীতি, মুসলিম মৌলবাদ এবং ইয়াহুদী বিদ্বেষ—এই সবকিছুর বিরুদ্ধেই একই সঙ্গে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া জরুরি। শান্তি, ন্যায়বিচার এবং জনগণের স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি নীতিগত অবস্থান তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা একদিকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করবে, অন্যদিকে ধর্মীয় মৌলবাদ ও আন্টি-সেমিটিজমের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকেও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করবে। শুধুমাত্র এই ধরনের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিই মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে টেকসই শান্তি ও সহাবস্থানের পথ তৈরি করতে পারে।


একই ঘরনার সংবাদ
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!