শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৪ পূর্বাহ্ন

গাজী রাকায়েত : বিশ্বাসের অঙ্কে সংস্কৃতির সীমানা

অপু সারোয়ার
শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় বয়ানকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গাজী রাকায়েত-এর বক্তব্য ও তার উপস্থাপনার ধরন নিয়ে আলোচনা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি একজন পরিচিত অভিনেতা, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক; শিক্ষায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। নাট্য অভিনয়ের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে চলচ্চিত্রেও সক্রিয় হন।

একজন প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যখন ধর্মকে বৈজ্ঞানিক বা গাণিতিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত মতামত থাকে না; বরং তা সমাজে জ্ঞান, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে গান-বাজনা বন্ধের আহ্বান, বাউল গানের আসরে হামলা কিংবা নাটকের শুটিংয়ে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এই প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ভেতর থেকেই যদি ধর্মীয় রক্ষণশীলতার পক্ষে যুক্তি হাজির করা হয়, তাহলে তা সাংস্কৃতিক চর্চার পক্ষে অবস্থানকে দুর্বল করে। কারণ, একজন জনপ্রিয় শিল্পীর বক্তব্য অনুসরণ করে একটি অংশ যদি শিল্প-সংস্কৃতিকে ধর্মীয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য মনে করতে শুরু করে, তবে এর প্রভাব সরাসরি সাংস্কৃতিক পরিসরে পড়ে।

সাম্প্রতিক এক পডকাস্টে গাজী রাকায়েত তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত শোক, অস্তিত্বগত প্রশ্ন এবং মানসিক টানাপোড়েনের কারণে একসময় তিনি ধর্ম থেকে সরে গিয়ে নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন। আলবার্ট আইনস্টাইনস্টিফেন হকিং-এর রচনার প্রভাবও তিনি উল্লেখ করেন। তবে পরবর্তীতে কোরআনের তথাকথিত “বৈজ্ঞানিক ভুল” অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি এর গঠন ও ভাষার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পুনরায় ধর্মবিশ্বাসে ফিরে আসেন বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, কোরআনের অক্ষর ও সংখ্যার মধ্যে একটি গাণিতিক বিন্যাস রয়েছে, যা মানুষের পক্ষে নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

ধর্মকে গাণিতিক কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যার এই প্রবণতা নতুন নয়। রাশাদ খলিফা ১৯৭৪ সালে কোরআন বিশ্লেষণে কম্পিউটার ব্যবহার করে “১৯ কোড” তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, কোরআনের গঠন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাতাত্ত্বিক বিন্যাস অনুসরণ করে। তবে এই তত্ত্বের ভিত্তিতে তিনি হাদিস ও সুন্নাহ প্রত্যাখ্যান করেন এবং কোরআনের কিছু আয়াতের প্রামাণিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। সূরা তাওবার দুটি আয়াত (৯:১২৮–১২৯) তিনি সংযোজিত বলে দাবি করে নিজ অনুবাদ থেকে বাদ দেন। এই তত্ত্ব মূলধারার ইসলামি পণ্ডিতদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি এবং ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, যা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং যুক্তিগত স্বচ্ছতার দাবি। যদি একজন ব্যক্তি পূর্বে যুক্তিসঙ্গত সংশয়ের ভিত্তিতে নাস্তিকতার দিকে যান, তাহলে পুনরায় ধর্মে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে কী ধরনের নতুন প্রমাণ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অনুভূতি এখানে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচিত হয় না, বিশেষ করে যখন সেটি জনপরিসরে উপস্থাপিত হয়।

ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব প্রমাণের প্রশ্নে যুক্তিবিদ্যার একটি মৌলিক নীতি হলো—যে পক্ষ কোনো কিছুর অস্তিত্ব দাবি করে, প্রমাণের দায় তার ওপরই বর্তায়। বিজ্ঞান পরীক্ষণযোগ্য ও পর্যবেক্ষণযোগ্য বাস্তবতা নিয়ে কাজ করে; তাই অবস্তুনিষ্ঠ সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করা তার প্রত্যক্ষ ক্ষেত্র নয়। এই বাস্তবতায় নাস্তিকদের ওপর “অস্তিত্বহীনতা প্রমাণের” দায় চাপানো যুক্তিগতভাবে সঙ্গত নয়।

ধর্মীয় পরিচয় অনেকাংশে সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট দ্বারা নির্ধারিত হয়। যদি জন্মপরিবেশ ভিন্ন হতো, তাহলে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হতো কি না—এই প্রশ্নটি বিশ্বাসের সার্বজনীনতা ও প্রেক্ষাপটনির্ভরতার বিষয়টি সামনে আনে। একই সঙ্গে, শুধুমাত্র স্টিফেন হকিং-এর লেখা পড়ে নাস্তিক হয়ে যাওয়ার যুক্তি অনেকের কাছে পর্যাপ্ত মনে নাও হতে পারে। একটি সুসংহত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাধারণত বিপরীতমুখী মত, দর্শন ও বিজ্ঞানের বিস্তৃত পাঠ প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও, যখন তা গণমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে প্রচারিত হয়, তখন এর উদ্দেশ্য ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে উন্মুক্ত ও যুক্তিনির্ভর সংলাপের পরিবর্তে যদি একমুখী বয়ান প্রাধান্য পায়, তাহলে তা জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার বদলে মতাদর্শিক পুনরুৎপাদনে পরিণত হতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশের শিল্পী ও সাহিত্যিকদের একটি অংশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে এসে ধর্মীয় চর্চার দিকে ঝোঁক বাড়ে। সমালোচকদের মতে, জনপ্রিয়তার স্বাভাবিক ভাটা এবং জনদৃষ্টি হারানোর আশঙ্কা অনেক সময় এই পরিবর্তনের একটি কারণ হিসেবে কাজ করে। যৌবনের সময়ের আলো, গ্রহণযোগ্যতা ও কেন্দ্রীয়তা কমে এলে তা মেনে নেওয়া সবার পক্ষে সহজ হয় না। এই প্রেক্ষাপটে গাজী রাকায়েতের সাম্প্রতিক অবস্থানকেও কেউ কেউ সেই মানসিক ও সামাজিক রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখছেন।

তবে শেষ পর্যন্ত ধর্মে ফিরে আসা বা ধর্ম থেকে সরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন এবং জটিল। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং তার বক্তব্য, যুক্তি ও প্রেক্ষাপটকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করাই প্রাসঙ্গিক।


একই ঘরনার সংবাদ

error: Content is protected !!
error: Content is protected !!