২০২৫ সালের ১৪ মার্চ রমজান মাসে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যে ইফতারের আয়োজন হয়েছিল, তা নিছক একটি মানবিক অনুষ্ঠানের সীমা অতিক্রম করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তায় রূপ নিয়েছিল। প্রায় এক লাখ শরণার্থীর সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার—এটিকে “বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইফতার” হিসেবে প্রচার করা হয়। সেই আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল—২০২৬ সালের ঈদের আগেই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে। এই ঘোষণাটি কেবল একটি প্রতিশ্রুতি ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের স্থবির সংকটের মধ্যে আশার একটি কৃত্রিম নির্মাণ।
কিন্তু এক বছর পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আরেকটি ঈদ এসেছে, কিন্তু রোহিঙ্গাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং সংকট আরও গভীর হয়েছে। এখনো ৩৩টি শিবিরে ১২ লাখের বেশি মানুষ অমানবিক অবস্থায় বসবাস করছে, এবং নতুন করে আরও লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয় নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর অর্থ স্পষ্ট—যে প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবভিত্তিক কোনো পরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ভাষ্য, যার উদ্দেশ্য ছিল তাৎক্ষণিক আবেগ তৈরি করা, বাস্তব সমাধান নয়।
শিবিরের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের ক্লাসিক উদাহরণ। খাদ্য ঘাটতি, জ্বালানির সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং স্যানিটেশন সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ। এই পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই অপরাধ, মানব পাচার এবং সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি জনগোষ্ঠীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে রাখলে তাদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে, নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয় এবং সংগঠিত রাজনৈতিক দাবিও দুর্বল হয়ে যায়। ২০১৯ সালের পর রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে বড় কোনো সংগঠিত উদ্যোগ না থাকা এই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
প্রত্যাবাসন না হওয়ার পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং গভীর ভূরাজনৈতিক জটিলতার ফল। রাখাইনে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াই, পরিস্থিতিকে আরও অনিরাপদ করে তুলেছে। কোনো জনগোষ্ঠীকে জোর করে ফেরানো সম্ভব নয়, যদি তাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হয়। এই তিনটি শর্তের একটিও পূরণ হয়নি। ফলে প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি কার্যত অচল হয়ে আছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সংকট, যেখানে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আন্তর্জাতিক কৌশলগত স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় নীতির জটিল সমীকরণ কাজ করছে। মিয়ানমারের সামরিক শাসন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার এবং বৈশ্বিক শক্তির অবস্থান—সব মিলিয়ে এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মানবিক সহায়তার আড়ালে রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও এই সংকটকে ঘিরে একটি আলাদা রাজনৈতিক অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। ত্রাণ বণ্টন, এনজিও কার্যক্রম, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে একটি জটিল কাঠামো গড়ে উঠেছে, যা সংকটকে টিকিয়ে রাখার দিকে প্রণোদনা তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদি সংকট অনেক সময় কিছু গোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত হয়, যা সমাধানের পরিবর্তে স্থিতাবস্থাকে দীর্ঘায়িত করে।
রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও ইতিহাস নিয়েও সচেতনভাবে একটি বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করা হয়েছে। তাদেরকে আরাকানের প্রধান বা “সংখাগরিষ্ঠ” জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাস্তবতা হলো, আরাকান অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে রাখাইন বৌদ্ধরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে উত্তর আরাকানের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এই বাস্তবতাকে বিকৃত করে ধর্মীয় আবেগ তৈরি করা হয়, যা সমস্যার সমাধানকে আরও কঠিন করে তোলে।
রোহিঙ্গাদের প্রতিরোধ রাজনীতিও একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। তাদের আন্দোলন অনেকাংশে ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় মিয়ানমারের অন্যান্য সামরিকবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে কার্যকর জোট গড়ে ওঠেনি। ফলে তারা একটি বিচ্ছিন্ন শক্তি হিসেবে থেকে গেছে। অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের বিরোধ ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হলো, সামরিক সরকারের পতন হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তবতা দেখা যায়। বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ—বিশেষ করে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার—এই সংকটকে একটি “চাপের বিন্দু” হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে মানবিক সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই বেশি প্রাধান্য পায়। মানবিক করিডোরসহ বিভিন্ন প্রস্তাবও প্রায়শই এই বৃহৎ কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, পাকিস্তান আমল থেকেই সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর এবং বসতি স্থাপনের বিষয়টি সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলের জাতিগত ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে এবং একটি নতুন ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে—এমন নিশ্চয়তা নেই; বরং বিভিন্ন সময় এটি নতুনভাবে সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি একটি কঠিন সত্যকে সামনে আনে—রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধুমাত্র মানবিক সহায়তা বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমস্যার ফল, যার সমাধানও রাজনৈতিক। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সমন্বয় এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। ফলে প্রতিবারই নতুন করে আশার কথা বলা হয়, নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। ঈদ আসে, ঈদ যায়—কিন্তু রোহিঙ্গাদের জীবনে সেই একই স্থবিরতা রয়ে যায়। তারা এখনো অপেক্ষা করছে, কিন্তু সেই অপেক্ষার কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই। প্রশ্নটি তাই আরও তীব্র হয়ে ওঠে—এই অপেক্ষা আর কতদিন?